নারী আন্দোলন কি আদৌ হচ্ছে কিছু?

ইশরাত জাহান ঊর্মি:

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ পাশ হওয়ার পর নাগরিক কমিটির ডাকা সংবাদ সম্মেলনে বসে প্রশ্নটা আমার মাথায় এলো। বাংলাদেশের নারী আন্দোলন এখন কোথায় অবস্থান করছে? কতোটা এগিয়েছে এই আন্দোলন?

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার অতি পরিচিত কিছু মুখ আমার সামনে-আয়েশা খানম, রোকেয়া কবীর, এ্যাডভোকেট সালমা আলী, এঁরা ছাড়াও আরও ৭০টি নারী ও মানবাধিকার বিষয়ক জোটের প্রতিনিধিরা। এইসব একটিভিস্টদের সকল বাদ-প্রতিবাদ, আপত্তি-আন্দোলনরে আঙুল দেখিয়ে সংসদ আইন পাশ করে ফেলেছে। রাজপথের সঙ্গী, যারা এখন সংসদের নারী মন্ত্রী-এমপি-তারা সব গর্তে ঢুকে গেছেন, স্পিকারের কাছে সময় চেয়েছেন-পাননি।

সংবাদ সম্মেলনে জানালেন এইসব তথ্য। আমার মনে হলো, এইসব সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ভীষণরকম অপমানিত বোধ করছেন। অনেক ধরনের সমালোচনা সত্ত্বেও বাংলাদেশের তৃণমূলের নারীর এগিয়ে যাওয়ায় এদের কিছুটা ভূমিকা তো আছে। ফান্ড ক্রাইসিস আর উন্নয়নের ঠ্যালায় তারা এমনিতেই জরজর হয়ে আছেন ইদানিং, তার উপর এই অপমান!

আমি ভাবছিলাম, বাংলাদেশের নারীরা আসলে যতোটা এগুলো বা এগুনোর চেষ্টা করলো-তা আসলে কাদের অবদান? সুফিয়া কামাল বা জাহানারা ইমামের পর গত দেড় দশকে আর কোনো নাম তো আমাদের সামনে ভাস্বর হয় না। যারা যা কিছু করেছেন এনজিও মোড়কে করেছেন। আমাদের জন্য কোনো নারী ক্যারেক্টার সর্বজন শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠতে পারলেন না।

এদেশের মেয়েদের ধর্ষণ, ধর্ষণের পর খুন করে পথে-ঘাটে ফেলে রেখেছে, সূর্য না দেখা মাথানিচু করে কাজ করা জিডিপির গর্ব করানো গার্মেন্টস এর নারী কর্মীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, কারখানার অসুস্থ পরিবেশে কাজ করে নিজের পরিবার আর দেশের জন্য নিজেদের ক্ষয়ে ফেলেছে এই মেয়েরা, আমরা তার খতিয়ান রাখিনি, এদেশের বিবাহিত মেয়েরা ঘরের ভেতর মার খেয়েছে দিনের পর দিন, এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়ে মুখ পুড়েছে কত নারীর, যৌন নিপীড়নের অত্যাচারে আত্মহত্যা করেছে কতশত উজ্জ্বল নারী, কালের ধুলোয় সেসব চাপা পড়ে গেছে।

আমরা একত্রিত হয়ে রাস্তায় নামিনি। ইয়াসমিন ধর্ষণ এবং হত্যা মামলায় ফাঁসির রায়ের মতো ঘটনা হাতে গোনা। প্রতিবছর নানান পরিসংখ্যান আর হিসেব-নিকেষ নারী নির্যাতনের মাত্রা প্রকাশ করেছে, নির্যাতনের ধরন বদলে যাওয়া দেখেছি আমরা, কিন্তু রাস্তায় নামিনি। চিৎকার করিনি। তনু ধর্ষণ এবং হত্যা মামলার মতো ঘটনায় রাস্তায় নামলেও নানান রাজনীতি দিয়ে সে আন্দোলন ঠেকিয়ে দেয়া গেছে।

ইশরাত জাহান ঊর্মি

নারী ধর্ষণ নারী নির্যাতন ক্ষমতা এবং রাজনীতির অংশ। কিন্তু আমরা নারীরা এই রাজনীতি এই ক্ষমতার দম্ভ মোকাবিলা করতে পারিনি ঠিকঠাক। যেকোনো আন্দোলনে নারী নির্যাতন গৌণ হয়ে গেছে রাজনীতি মুখ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া কল্পনা চাকমা থেকে শুরু করে তনু, আফসানা, রিশার জন্য আমাদের বুকের ভেতর ধিকিধিকি আগুন জ্বলেনি।

গত দেড়দশকে উল্লেখ করার মতো আমরা কিছু করিনি, কিন্তু আন্দোলন করে তার ফল দেখিয়েছেন দেশের মোল্লা সমাজ। তসলিমা নাসরিনকে নাস্তিক বলে তাকে দেশছাড়া করেছে। নারী আন্দোলনের “আপারা” তখন র‌্যাডিকেলি সমাজ পাল্টানো যায় না, রায় দিয়ে গোপনে গোপনে তসলিমারে ‘বেশ্যা’ গালি দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও মনে করি র‌্যাডিকেলবাদ অনেকসময় ভুল বার্তা পৌঁছায় সমাজের কাছে। কিন্তু এটাও তো ঠিক বিশ্বে কখনই জোর ধাক্কা না দিয়ে অন্তত: উইমেন মুভমেন্ট সফল হয়নি।

এক তসলিমা বাংলার আনাচে-কানাচে কতজনরে জাগিয়েছিল, ভাবিয়েছিল তার কোনো হিসাব তো আমাদের কাছে নেই।বদলাতে হলে জোর ধাক্কাই দিতে হয়, সমাজ সইয়ে আন্দোলন কোত নারীর জীবন কেড়ে নেয়, তা আমরা ভেবে দেখি না। ইউরোপ জুড়ে নানান র‌্যাডিকেল উইমের মুভমেন্ট এনেছিল পরিবর্তন।

আর বাংলাদেশে? তসলিমারে দেশছাড়া করেছেন আপনারা, কিন্তু তারপর? দেশ বড়লোক হয়েছে, মেয়েরা বাইরে বেরিয়েছে, নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে, কিন্তু সমানতালে বেড়েছে নারী ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, নারী খুন। মাত্র কয়েক বছরে পথে-ঘাটে হাটে নারীরা নিজেদের অবগুণ্ঠিত করেছে, ভালো মুসলিম হতে হয়েছে তাকে, না হলে অবমাননার শিকার হতে হয়েছে। অবশ্য সবসময় হিজাব পরেও তার রক্ষা হয়নি।

তো, এখন যখন মেয়েরা অনলাইন এবং গণমাধ্যমের সুবিধা নিয়ে মুখ খুলছে, তখন একদলের আবার জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছে। তারা সব ‘মানবতাবাদ মানবতাবা’দ করে ফাল পাড়তেছে। যাই হোক সেটা অন্য প্রসঙ্গ।

যে প্রশ্ন মাথায় নিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম। নারী আন্দোলন এই মুহূর্তে কোথায় আছে, বা আদৌ কি কোথাও আছে? ২০১৩ সালে অনলাইন পোর্টাল উইমেন চ্যাপ্টার শুরু করার পর অনেক নারীরা এখানে লিখতে থাকেন। এর আগে আরও কিছু অসীম সাহসী নারী লিখতেন ব্লগে। এই কয় বছরে অন্তত লেখালেখি দিয়ে নারীরা কিছুটা এগিয়েছে। কিন্তু সেটা কতো ক্ষুদ্র অংশ? বিশাল যে তৃণমূল? গাইবান্ধার চর? ভোলার দ্বীপাঞ্চল? আরও দুর্গম সব এলাকা? তাদের কথা বলছি কি আমরা? শুনতে পাচ্ছি তাদের কন্ঠস্বর?

আমাদের তো এখন উচিত তাদের জন্য কিছু করা। না কি এখনও শহুরে সুবিধাপ্রাপ্ত নারীরাই নারীবাদ না মানবতাবাদ এইসব ঘনঘোর বিতর্ক আর বিভ্রম থেকে বের হতে পারিনি? আলোকিত হতে পারিনি? এখনও বলে যাচ্ছি নিজের কথা। অন্যদের কথা কবে এবং কারা বলবে?

এবছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দরজায় দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে মনে। আমাদের আন্দোলনের এতো বছরেও একটা ফ্রেমিং হলো না!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.