এরাও কী মানুষ? 

তামান্না ইসলাম: আজকাল প্রায়ই একটা খবর পড়ে খুশি হই, আশান্বিত হই, আর ঠিক তার পরপরই প্রচণ্ড মন খারাপ হয়। খুশি হই, আশা জাগে মেয়েদের সাহস বেড়েছে, আত্মসচেতনতা বেড়েছে সেটা দেখে আর মন খারাপ হয় তাতে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে এবং মানুষের লুকিয়ে রাখা আসল চেহারাটা দেখতে পেয়ে। 
বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়ছে, এটা অত্যন্ত খুশির খবর। সেই সাথে বাড়ছে চাকরিজীবী মেয়ে, স্বাবলম্বী মেয়ে। বাড়ছে মেয়েদের বাইরে যাওয়া। গণ পরিবহনে মেয়েদের সংখ্যা। প্রায়ই শোনা যায় রাস্তা ঘাটে, বাসে, ট্যাক্সিতে, টেম্পোতে তাদেরকে বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানির শিকার হতে। সেই যৌন হয়রানি অশ্লীলভাবে তাকিয়ে থাকা থেকে শুরু করে চরম জঘন্য, আপত্তিকর পর্যায়েও পৌঁছে যায় অনেক ক্ষেত্রেই।
তামান্না ইসলাম

এই ধরনের অপরাধের সাথে যারা জড়িত, তাদের বয়স যুবক থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত, শিক্ষিত, অশিক্ষিত অনেকেই। এই সব শুনে প্রায়ই অবাক হই, আসলেই কী আগেও এতোটা খারাপ ঘটনা ঘটতো, নাকি ইদানীং বেড়েছে? আসলে ভেবে দেখলে বোঝা যায় যে ঘটনাগুলো হয়তো আগেও হতো, কিন্তু যেহেতু খুব অল্প মেয়ে বাইরে চলাফেরা করতো, তাই ঘটনার সংখ্যা ছিল কম।

উপরন্তু, মেয়েদের মানসিকতা ছিল অন্যরকম। তাদেরকে এগুলো ঢেকে রাখতেই শেখানো হয়েছিল। এগুলো প্রকাশ করা যেন নিজেদেরই অপরাধ, নিজের মান  সম্মানের ব্যাঘাত। তাই মান সম্মান বাঁচাতে এবং লোক লজ্জার ভয়ে মেয়েরা মুখ খুলতো না। মেয়েদের মানসিকতায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারা অন্তত এইটুকু বুঝেছে যে মুখ বুঁজে এগুলো সহ্য করলে সারা জীবনই সহ্য করতে হবে। তারা সাহসী হয়েছে এই লোক লজ্জার বেড়াজাল ভেঙ্গে বাইরে আসতে এবং এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে।
জনবহুল রাস্তায় বা বাস ভর্তি লোকের মাঝে ‘আপনি আমার গায়ে হাত দিয়েছেন, কেন বা তাকিয়ে আছেন কেন অশ্লীল ভাবে?’ এটা বলতে যথেষ্ট মনের জোরের দরকার হয়। মেয়েরা যে সেটা অর্জন করেছে অনেকেই, সেটা দেখে সত্যি আনন্দ হয় এবং আশা জাগে। 
কিন্তু মনটা ভেঙ্গে যায় তখনই, যখন শুনি এরকম প্রতিবাদ করার পরে  বাস ভর্তি মানুষের কেউ সেই মেয়েটিকে সাপোর্ট করে না, সাহায্য করা তো দূরের কথা। আগে মেয়েরা রাস্তায় কোন বিপদে পড়লে কতো সময় কতো অজানা মানুষ তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সামান্য বিপদ বা ছোট খাট সাহায্য প্রায় সব ক্ষেত্রেই। এর কারণ কী? তবে কী আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজে মেয়েদেরকে দুর্বল, অক্ষম, মুখ বুঁজে পড়ে থেকে অত্যাচার সহ্য করা চরিত্রেই দেখতে অভ্যস্ত এবং আগ্রহী?
আজ তাদেরকে নিজের পায়ে নিজেকে দাঁড়াতে দেখে, তাদের বিরুদ্ধে করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে দেখে আর কারো ভালো লাগছে না? অবাক লাগে শুনে যে মেয়েদের এমন প্রতিবাদ শুনে, বাস ভর্তি মানুষ বা রাস্তায় জমা হওয়া মানুষ ওই সব কুলাঙ্গার মানুষেরই পক্ষ নেয়, উপদেশ দেয় ‘আপা মাফ করে দেন।’
অনেক সময় নাকি পুলিশও একই ভূমিকা নেয়। তার চেয়েও খারাপ ঘটনা শুনেছি যে এই অবস্থায় মেয়েটিকে অনেকে গালাগালি করে, ক্ষুব্ধ হয় এমনকি গায়ে হাত তুলতে পর্যন্ত শোনা গেছে। এরা কী আসলেই মানুষ? কিসের জোরে এরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করে? গায়ের জোরে?
যদি তাও হয়, সেই গায়ের জোরটুকু তো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে লাগাতে পারে। শেইম অন্ ইউ গাইস।  তোমরা মানুষ নামের কলঙ্ক। আর প্রচণ্ড রাগ হয়, সেই সব মেয়েদের উপরে, যারা নিজেরা তো ভয়ে এসবের প্রতিবাদ করবেই না, বরং অন্য কোন মেয়ে প্রতিবাদ করলে তাদেরকে সবার সামনেই ‘খারাপ মেয়ে’ উপাধি দিয়ে নিজেদের ভালো মেয়ে তকমাটা সেঁটে বসে থাকে।
সেদিন একটা ঘটনা শুনেছি যেখানে এক মেয়ের সাথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে আরেক মেয়ে। যার সাথে অন্যায় হয়েছে সে এবং তার মা উল্টো প্রতিবাদকারী মেয়েটির উপরে রেগে গেছে। আমার বিশ্বাস হয় না যে এরাও মানুষ। আসলেই কী এরাও মানুষ? 
শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.