নিকষ আঁধার পথে আলো হাতে এলো যাঁরা-২

মলি জেনান:

“কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।”

কিংবা

“মাংসে মাংস বৃদ্ধি, ঘৃতে বৃদ্ধি বল।

দুধে বীর্য বৃদ্ধি, শাকে বৃদ্ধি মল।”

কিংবা

“পশ্চিমে ধনু নিত্য খরা, পূর্বে ধনু বর্ষে ঝরা।”

এমন সব অসাধারণ শ্লোকের মাধ্যমে প্রাত্যহিক ও ব্যবহারিক বিজ্ঞানকে যিনি সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ও ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছেন, তিনি এক বিদূষী মহীয়সী নারী, যাকে আমরা ‘খনা’ নামেই জানি। আর তাঁর শ্লোক বা বাণী ‘খনার বচন’ নামে সমাদৃত।

খনার জীবন-ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও ধারণা করা হয়, তিনি সপ্তম খ্রিষ্টাব্দের আগে কোনো এক সময়ের ছিলেন। কারো কারো মতে, তিনি কালিদাস, বিক্রমাদিত্যের সমসাময়িক কালের ছিলেন। খনার জন্ম, কর্ম ও জীবনী নিয়ে রয়েছে নানা কল্প-কাহিনী।

প্রচলিত কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, খনার পূর্ব পুরুষ বঙ্গদেশ থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে লঙ্কায় গিয়ে প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হোন এবং তাদের সাথে সিংহলী রাজের এক যুদ্ধে তার পরিবারের সবাই মারা যায়; সেই থেকে শিশু খনা সিংহলরাজ পরিবারে লালিত-পালিত হতে থাকেন।

অপর এক কিংবদন্তি অনুসারে, উজ্জয়িনীর মহারাজ বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার প্রখ্যাত জ্যোতিষ পণ্ডিত বরাহ মিহির জ্যোতিষ গণনার মাধ্যমে জানতে পারেন, তার শিশু পুত্র মিহির এক বছরের মধ্যেই মারা যাবে। নিশ্চিত মৃত্যু এড়াতে একটি তাম্রপাত্রে শিশু পুত্রকে ভাসিয়ে দেন সমুদ্রে, আর এই তাম্রপাত্রটি স্রোতে ভেসে চলে আসে সিংহলী। সিংহলরাজের গৃহে ঠাঁই হয় মিহিরের, সিংহল রাজ খনা ও মিহির এ দুটো শিশুকে একত্রে লালন-পালন করতে থাকেন।

তখনকার সময়ে ভারতবর্ষ হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় অত্র এলাকার সমাজ ছিল চরমভাবে শ্রেণী বিভাজিত, সাধারণ মানুষ ছিল শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত। শিক্ষা সমাজের উঁচু স্তরের মানুষের একক সম্পত্তি ছিল, তাও ছিল কেবলমাত্র পুরুষদের দখলে, উঁচু শ্রেণীর নারীরা কিছুটা শিক্ষা যদিও পেতেন, তাও কীভাবে সুনিপূণ করে গৃহকর্ম করা যায় তার উপর, আর পুরুষের মনোরঞ্জন করবার কলাকৌশল। এমন এক সময়ে খনা মিহিরের সাথে জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্রে পড়ালেখা করেন এবং যৌবনে তারা বিয়ে করেন।

কালক্রমে খনা জ্যোতির্বিদ্যা, কৃষিশাস্ত্র, গণস্বাস্থ্য এবং প্রাত্যহিক জীবন সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞানার্জনে পারদর্শি হয়ে উঠেন। এক সময় খনা-মিহির গণনার মাধ্যমে জানতে পারেন, মিহির উজ্জয়িনীর সভাপণ্ডিত বরাহমিহিরের পুত্র, ফলে তারা উজ্জয়িনীতে ফিরে আসেন। কিন্তু বরাহমিহির মিহিরকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন না, কারণ তিনি পুত্রের জন্মের পরেই জানতে পেরেছিলেন, তার পুত্র একবছর বয়সেই মারা যাবে। খনা তখন তাঁর একটি গণনার বচন দিয়ে শ্বশুরের গণনা ভুল প্রতিপন্ন করেন-

কিসের তিথি কিসের বার, জন্ম নক্ষত্র কর সার 
কি করো শ্বশুর মতিহীন, পলকে আয়ু বারো দিন। 

খনার প্রজ্ঞা ও মেধায় মুগ্ধ হয়ে পণ্ডিত বরাহমিহির খনা-মিহির’কে সাদরে গ্রহণ করেন, কিন্তু এই মুগ্ধতাই একসময় ঈর্ষায় পরিণত হয়। খনা ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন বিদূষী ও প্রজ্ঞাবান নারী। তিনি কৃষি, স্বাস্থ্য, কৃষ্টি, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে থাকেন। তিনি সকল বিষয়ই ছন্দময় শ্লোকের মাধ্যমে রচনা করেন, যাতে শিক্ষাবঞ্চিত সাধারণ মানুষ সহজেই এসব মনে রাখতে পারে।

‘হাত বিশে করি ফাঁক, আম-কাঁঠাল পুঁতে রাখ।

গাছ গাছালি ঘন সবে না, গাছ হবে তার ফল হবে না।’

কিংবা-

‘পশ্চিমে ধনু নিত্য খরা, পূর্বে ধনু বর্ষে ঝরা।’

খনার এসব শ্লোক শুধু উক্তিই নয় কেবল, এ আমাদের জীবন যাত্রার বিজ্ঞান, কৃষি বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান, যা ছিল বাস্তবধর্মী ও কুসংস্কারমুক্ত। খুব অল্প সময়েই খনার পাণ্ডিত্য জনশ্রুতিতে পরিণত হয়, ফলে মহারাজ বিক্রমাদিত্য খনাকে রাজসভার দশম পণ্ডিত হিসেবে আসন দান করেন। একজন নারীর এমন ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও পাণ্ডিত্যে পুরুষতন্ত্রের ভিতকে নাড়িয়ে দেয়, খনার ক্রমবর্ধমান মর্যাদা তার শ্বশুর বরাহমিহিরকে ঈর্ষান্বিত করে তুলে। বরাহ খনার প্রজ্ঞা ও মেধাকে নেয় ঔদ্ধত হিসেবে।

ধারণা করা হয় এখানেই খনার দেহাবশেষ রয়েছে

শ্বশুর বরাহ পুত্র মিহিরকে আদেশ করেছিলেন খনার জিভ কেটে তাঁর ঔদ্ধত্যের শাস্তি দিতে।

কথিত আছে, জিভ কাটার আগে সাত দিন সাত রাত খনা টানা কথা বলেন কৃষকদের সঙ্গে। তিনি জল, জংলা আর ফসলের সূত্র দিয়ে যান তাঁদের। তাঁকে ঘিরে বসে সব প্রাণে গেঁথে নেন দেউল নগরের কৃষকেরা। সাত দিন শেষে কাটা জিভের রক্তক্ষরণে প্রাণ যায় খনার।

কথিত আছে খনা’র প্রকৃত নাম ‘লীলাবতী’ জিভ কেটে ফেলার কারণেই পরবর্তিতে ‘লীলাবতী খনা’ নামে পরিচিতি পান।

খনার প্রকৃত নাম যাই হোক না কেন, তার জীবনেতিহাস নিয়ে যত কল্পকাহিনীই প্রচলিত থাকুক না কেন, তার পরিণতিও হাইপেশিয়ার মতো অত্যন্ত করুণ ও বেদনার।

একজন নারী বলেই কি খনার এই নির্মম পরিণতি? নাকি চাষাভুষাদের সঙ্গে যে তিনি মিশেছিলেন, সে-ই তাঁর কাল হয়েছিল? পুরুষতন্ত্র নাকি শ্রেণী কাঠামো? নাকি দুটোই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর বিপক্ষে? নারীর কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা হয় সব যুগে, সব সমাজে। তবু এগিযে যায় জীবনের গান সকল সমাজে সকল কালে। আর তাই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে খনা বা তাঁর মতো নারীরা বেঁচে থাকে আজীবন, নিকষ আঁধারে পথ দেখার পরবর্তীদের।

তথ্যপঞ্জি

১. খনার বচন, কৃষি ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি, আলী নওয়াজ, ঢাকা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, শ্রাবণ ১৩৯৬।

২. খনার বিজ্ঞান, অরূপ রাহী (সম্পাদনা), ঢাকা,  ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০০৭।

৩. চন্দ্রকেতুগড়, এনামুল হক, ঢাকা, আইসিজেবিএ, ২০০১।

৪. নারী ও গণিত, সফিক ইসলাম।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.