পুতুল, কথা বলো-আর চুপ থেকো না

তানজিরা খান: “পুতুলের মত সুন্দর মেয়েটা!”, “বাহ,পুতুলের মতো বউ এনেছেন!”- বাক্যগুলোর সাথে আমরা খুবই পরিচিত, বহুল প্রচলিত স্তুতিবাক্য, কিন্তু প্রশংসাটা আসলে কীসের, তার ঠিক উত্তর পাওয়া যায় না। তবে বোঝা যায়, মেয়ে হবার স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে চেনানো হচ্ছে ‘পুতুল’।

আমাদের দেশে মেয়েবেলার সংজ্ঞা পুতুল বিয়ে; পুতুল নিয়ে মোটামুটি পৃথিবীর সব দেশেই শিশুরা খেলে, কিন্তু বিয়ে তার অপরিহার্য অঙ্গ শুধু এই ভারতীয় উপমহাদেশেই। বিয়ে জিনিসটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা খুব যত্নের সাথে, সূক্ষ্মভাবে, ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয় আমাদের সমাজে। স্থুল প্রয়োগও দেখা যায়, আমার প্রজন্মের মোটামুটি সব মেয়েই এই কথা শুনে বড় হয় যে, পড়াশোনায় ভাল না করলে বিয়ে দিয়ে দেয়া হবে। তাদের অবচেতনে এই চিন্তাটা ঢুকিয়ে দেয়া হয় যে, পড়াশোনা তাদের জন্য অপরিহার্য না, শুধু বেটার অপশন। এবং বিয়ে হচ্ছে ত্রাণ (!), আবশ্যকতা এবং মুক্তির পথ। এই স্থুলতার ভয়াবহ রূপ এর মুখোমুখি আজকে আমরা।

২৪ নভেম্বর, ২০১৬ বাংলাদেশ মন্ত্রিসভায় একটি ড্রাফট ল উত্থাপিত হয়, যার মূল বক্তব্য হচ্ছে- ধর্ষিতাদের ক্ষেত্রে বিবাহযোগ্য ন্যুনতম বয়স ১৮ এর পরিবর্তে ১৫ করা, অর্থাৎ বাল্যবিবাহ আইনের শিথিলকরণ। এছাড়া ধর্ষক যদি লাঞ্ছিতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিয়ে করে, সেক্ষেত্রে তার জন্য কোন শাস্তি প্রযোজ্য হবে না।

তানজিরা খান

এই প্রস্তাবের যৌক্তিকতা ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করার আগে আমরা এর উৎস নিয়ে কথা বলি। তুরস্কের মন্ত্রিসভায় একই আইন প্রস্তাবিত হয় ২২ নভেম্বর, বুধবার। বিল উত্থাপনের পর The Justice and Development Party (Turkish: Adalet ve Kalkınma Partisi), সংক্ষেপে একেপি এর ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় (৩১৭ টি) বিল পাসও হয়।

এর স্বপক্ষে তুর্কি সরকারের আইনমন্ত্রী বেকির বোযদাগ এর যুক্তি ছিল- “ This is a step taken to solve a the problems aroused but child marriage in some parts of our country.” তার এই বক্তব্য ছিল তুরস্কে ক্রমবর্ধমান বাল্যবিবাহের কারণে সৃষ্ট আইনগত জটিলতা প্রসঙ্গে। বার্তা সংস্থা এএফপি’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “When a child is then born from this non-official union, the doctor warns the prosecutor and the man is sent to prison, putting the child and mother into financial difficulties,”

তুর্কি সরকারের মতে, এই সংশোধন (?) বা শিথিলকরণ ধর্ষণ বা বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ আরও সহজ করবে।

উদ্ভাবনীয় চিন্তাই বটে। এই আইন পাশ হবার প্রতিবাদে শুধু ইস্তানবুলেই প্রায় তিন হাজার নারী একত্রিত হয় কাদিকয় স্কয়ারে। এছাড়া আংকারা, ইযমির এবং ত্রাব্জোন শহরেও বিক্ষোভ ও অসহযোগ কর্মসূচি পালিত হয়। প্রবল চাপের মুখে অবশেষে প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইদ্রিম এই আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

নিজের দেশে ফিরে আসি; দেশের রাজনৈতিক কাঠামো যেখানে দুই নারী নেত্রী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সেখানে সংসদে এ ধরনের প্রস্তাব পাশ আমাদের হতাশ করে, এবং হতাশার জায়গা খুব দ্রুত নিয়ে নেয় আমাদের জাতিগত স্বভাবসুলভ নির্লিপ্ততায় যখন আরও কিছু বিষয় আসে আলোচনায়-

আমাদের দেশে বাল্যবিবাহের হার এশিয়া মহাদেশে সর্বোচ্চ (জ্বী, ভারতের চেয়ে বেশি )-৫২%, যার মধ্যে ১৮% বিবাহের ক্ষেত্রে মেয়ের বয়স ১৫ এর কম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জুলাই ২০১৪ তে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ২০২১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ নিরসনে জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন ও কার্যকর করা হবে; এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ রূপে নিরসন করা হবে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির এ ধরনের পরিণতি দেখেই আমরা অভ্যস্ত, যেমন অভ্যস্ত আমরা নির্লিপ্ততায়।

আমাদের দেশের আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞা প্রণীত হয়েছে ১৮৬০ সালের পেনাল কোড অনুযায়ী। সংজ্ঞার যুগোপযোগিতার অভাব এখানে ভয়ের কারণ না, ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, এই সংজ্ঞা আশ্রয় নিয়েছে ‘শরীয়া আইন’ এর, যার অনুসারে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য নিদেনপক্ষে চার জন সাক্ষী উপস্থিত থাকা প্রয়োজন, অন্যথায় ধর্ষিতাকে অবৈধ সম্পর্কের দায়ে অভিযুক্ত করা যেতে পারে।

আবার একই সাথে আদালতে ধর্ষণের কেস এর শুনানির সময় সম্পর্কিত ব্যক্তি, প্রশাসন ও আইনজীবী ছাড়া আর কেউ উপস্থিত থাকার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আমাদের আইন কাঠামোর এমন অসামঞ্জস্যতাই অধিকাংশ সময়ে ধর্ষণের অপরাধকে আদালত পর্যন্ত আসতেই দেয় না। ধর্ষিতাদের অসহায়ত্ব এখানেই শেষ নয়আমাদের দেশে দাম্পত্য জীবনে সংঘটিত ধর্ষণের কোনো বিচার নেই। বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্রে ধর্ষক এখানে অপরাধী না, স্বামী। জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এখানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ না, জায়েয বরং।

এসব প্রতিকূলতা পেরিয়ে যারা বিচার দাবির সাহস করে, হয়তো পায়ও, তারাও সামাজিক প্রতিকূলতার কারণে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে কখনোই ফিরতে পারে না। এদেশে ধর্ষণের শিকার নারীদের জন্য নেই কোনো support center, specialized asylum অথবা rehabilitation centerঅবিবাহিত মায়েদের শিশুদের জন্য নেই রাষ্ট্রীয় পরিচয় অথবা শিক্ষার ব্যবস্থা। প্রচণ্ড ট্রমার শিকার হয়েই শেষ হয় না ধর্ষণের বিভীষিকা, তীব্র অস্তিত্ব সংকট নিয়েও কাটাতে হয় বাকি জীবন। প্রতিকূলতা ও অসহায়ত্ব মেয়েগুলোকে পাথরের পুতুল করে দেয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই।

সমাজ এসব পুতুলের মুক্তির(?) একমাত্র পথ হিসেবে মেনে নেয় ‘বিয়ে’কে। এই মনোভাব আমাদের আজ এমন জায়গায় নিয়ে এসেছে যেখানে একজন মা তার মেয়েকে পুতুল খেলার বয়সে পুতুলের মতো বিক্রি করে দিচ্ছে আরেকজন এর কাছে একটি সামাজিক প্রথার মাধ্যমে বিনিময়ে পাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা, কতটুকু পাচ্ছে তাও প্রশ্নের বিষয়।

রক্ষকের ভক্ষক হবার কথা শুনে এসেছি আমরা, এখানে ভক্ষককে আমরা রক্ষীর দায়িত্ব দিচ্ছি। শিক্ষা বা জ্ঞানের অভাব শুধু নয়, প্রকৃত সাহায্য নেই বলে আমরা সাহায্যের হাতই খুঁজি না। এই প্রতিকূলতার উৎস পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাই শুধু না, বরং আমাদের নারী বিদ্বেষ। আমরা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সমাজের সবাই কম-বেশি নারী বিদ্বেষী।

তাই সাহায্য হতে হবে নিজেদের, দাঁড়াতে হবে নিজের পাশে, বলতে হবে নিজের কথা। প্রাণের স্পন্দন প্রকাশ যদি না পায়, তাকে জড় হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য পৃথিবী বা সমাজ, কাউকেই দোষ দেয়া যায় না!

সবশেষে বলি, যারা জাতির বিবেক হয়ে পথ প্রদর্শন করছেন তারাও পুতুলদের জড়তার সুযোগ নিচ্ছেনকিন্তু পুতুলরা কি ততোটা দুর্বল আজ? এই উপমহাদেশের সাম্যবাদের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠির মধ্যেও খুঁজে পেয়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে অসীম বিপ্লবের শক্তি তাই জড় পুতুল যদি নিজের শক্তিতে জেগে ওঠে, কথা বলে ওঠে, তবেই বিবেকের ঝাণ্ডাধারীদের বিবেক কিছুটা হলেও জাগ্রত হবে ধর্ষণকারীকে বাঁচানোর জন্য বাল্যবিয়ের এই বিশেষ ব্যবস্থার নামে মানবতাকে ধর্ষণের দিকে ঠেলে দেয়া থেকে বিরত হবেন বলে আশা জাগে

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.