‘বিশেষ বিধান’, নাকি কন্যা শিশুর ফাঁস?

নাসরীন রহমান: অবশেষে সমস্ত প্রতিবাদ, সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জাতীয় সংসদে পাস হয়ে গেল বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল-২০১৭। নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স যথাক্রমে ২১ এবং ১৮ বছর নির্ধারণসহ বাল্য বিবাহ নিরোধে প্রয়োজনীয় বিধান রাখা হয়েছে বিলটিতে।  

কিন্তু কাদের স্বার্থে এই আইনটি?

‘এ বিলের অন্যান্য বিধানে যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোনো নারীর সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতার সম্মতিক্রমে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে বিবাহ সম্পাদিত হলে তা এ আইনের অধীন অপরাধ বলে গণ্য হবে না বলে বিলে বিশেষ বিধান করা হয়েছে ।’

নাসরীন রহমান

আমরা জানি বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনের ‘ বিশেষ বিধান ‘ এর প্রতিবাদে অব্যাহতভাবে প্রতিবাদ হচ্ছিল দেশজুড়ে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, নারী সংগঠন থেকে শুরু করে সচেতন সমাজ এই ‘ বিশেষ বিধান ‘ এর প্রতিবাদ করে আসছিলেন সংগত কারণে। কিন্তু শেষ অবধি ‘বিশেষ বিধানের’ বিপক্ষে দেশজুড়ে অব্যাহত প্রতিবাদ সত্বেও তা আইনে পরিণত হলো? এখন প্রশ্ন অব্যাহত প্রতিবাদ যেখানে চলমান, সেখানে তবে কাদের স্বার্থে এই ‘বিশেষ বিধান’? কেনইবা?

আমরা যদি গত ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি সংবাদের দিকে নজর দিই দেখবো সংবাদটিতে উল্লেখ ছিল, ‘বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান শুধু মেয়েদের জন্য নয়, ছেলেদের জন্যও প্রযোজ্য হবে ।’ সূত্র: প্রথম আলো ২৪,ফেব্রুয়ারি।
তবে অনেক বেদনার মাঝে এইটুকু আশ্বাসের যে, ছেলেদের ক্ষেত্রে ‘বিশেষ বিধান’ রাখা হয়নি।

যেই সুপারিশটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয় – সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি রেবেকা মোমিন ৯ ফেব্রুয়ারি সংসদে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন, তাতে তিনি সুপারিশ করেছিলেন ছেলেদের জন্যও ‘ বিশেষ বিধান’ সংযুক্ত করতে হবে। অবশ্য আইনের খসড়ায় ছেলেদের ন্যুনতম বিয়ের বয়স ২১ রাখা আছে।

এর আগে মেয়েশিশুদের বিয়ের ‘বিশেষ বিধানের’ পক্ষে যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে, ‘ অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়ে অঘটন ঘটালে সমাজের সব্বাই মেয়েটির দিকে আঙুল তুলবে। খারাপ বলবে। অঘটনের ফলে যে শিশু জন্ম নিবে তার ভবিষ্যৎ ও
অন্ধকার ।’ অথচ একই প্রসঙ্গে আবার বলা হয়েছে ‘বিয়ের পর ছেলেটা যদি চলেও যায় তাতেও কিছু আসে যায় না ।’

লক্ষ্য করুণ ‘ ছেলেটা চলে গেলেও কিছু আসে যায় না ‘ বাক্যটি! তবে কি এই সমাজে মেয়েদের জন্ম হয়েছে একা কলঙ্কের বোঝা বহন করার জন্য? ‘ ছেলেটি চলে গেলে আসে যায় না ‘ তবে তো বিয়েরইবা প্রয়োজন কী?

আজ বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনটি পাসের ক্ষেত্রে যুক্তি দেখানো হলো অনাকাঙ্ক্ষিত অন্তঃসত্ত্বাদের (ধর্ষণ জনিত বা অন্য
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কন্যা শিশু অন্তঃসত্ত্বা হলে) কথা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

আমরা বলবো, অনাকাঙ্ক্ষিত অন্তঃসত্ত্বাদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সেবা কি নেই? অনাকাঙ্ক্ষিত কনসিভ করার জন্য একটি কন্যা শিশুকে কেন আরও ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া হবে সন্তানটি জন্মদানের সুযোগ দিয়ে, বিয়ে নামক ‘বৈধতা’ দিয়ে? এই কন্যাশিশু সন্তানের জন্ম দিলে সে হবে মা এবং আরেকটি শিশুর মা, অথচ কন্যা শিশুটি নিজেই শিশু। একটি শিশু আরেকটি শিশুর দায়িত্ব কীভাবে নেবে?

তাছাড়া বিবাহ নামক সামাজিক ও ধর্মীয় অনুমোদন পেলে অর্থাৎ ‘সহবাসের বৈধ অনুমোদন’ পেলে অঘটনঘটনপটিয়সিরা হবে স্বামী- স্ত্রী, এই বৈধ স্বামী –স্ত্রী তখন বছর বছর আরও সন্তান জন্ম দিবে, কারণ তখন তাদের ‘ খারাপ ‘ বলবে
না সমাজ !

অথচ চিকিৎসা শাস্ত্র বলে ১৮ বছর বয়সের আগে কন্যা শিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে বিয়ের উপযুক্ত হয়ে গড়ে উঠে না এবং সন্তানের জন্ম দেয়ার তো প্রসঙ্গই আসে না। কৈশোরের চাপল্যে বা ধর্ষণজনিত কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত এই গর্ভের দায় কিন্তু কন্যা শিশুটিকেই বহন করতে হবে ‘সন্তানের পরিচয় কী হবে ভেবে’! এবং তা ‘বিশেষ বিধানের’ যাঁতাকলে!

আরেকটি প্রসঙ্গ আসে তা হচ্ছে, ধর্ষকের শাস্তির বিষয়টি রহিত হয়ে যাচ্ছে এই আইনের বলে, উপরন্তু তার ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে পুরস্কার হিসেবে। কেন? আইন তবে কাদের জন্য? ধর্ষকের জন্য? অর্থাৎ এই আইনটির ‘ বিশেষ বিধান ‘ কার্যকরি হলে দেখা যাবে অপরাধীকে দায়মুক্তির বাবস্থা রাখা হচ্ছে ! এতে করে বিচার , আইন নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ থেকেই যায়। আর ধর্ষকের যদি শাস্তি এড়ানোর ব্যবস্থা আইনেই থাকে, তবে ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ারই প্রবণতা দেখা দিবে, নয় কি? বিয়ের আশায় কু-পুরুষেরা হয়ে উঠতে পারেন একেক জন ধর্ষক!

নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার, নারীর উন্নয়ন নিয়ে এতো ঢোল পিটানো হয়; বড় বড় বাণী, সেমিনার এই – সেই আর ভেতরে রাখা হয় এক ছিদ্র! যে ছিদ্র দিয়ে নারী উন্নয়নের জোয়ারের সুফল জলাঞ্জলি যায়! এই যে বৈপরীত্য, এই বৈপরীত্য থাকলে নারীর কাঙ্খিত মুক্তি কী করে সম্ভব?

আজ যখন কন্যাশিশুরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে ‘বাল্য বিবাহ’ ভেঙে দিচ্ছে, দৃষ্টান্ত হচ্ছে মেয়েদের এই সাহসিকতার সংবাদ, তখন বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনের খসড়ার ‘ বিশেষ বিধান ‘ মেয়েদের গলায় ফাঁস হয়ে উঠবে তা নিশ্চিত করেই
বলা যায়।

‘সমাজ খারাপ বলবে ‘ কথাগুলো শুনলে মনে হয় আমরা মশার ভয়ে মশা না মেরে বরং মশারীর ভেতর ঢুকে থাকার পক্ষপাতী ! অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কারোই কাম্য না, কিন্তু তার সমাধান আমরা কেন সঠিক পথে খুঁজছি না? ধর্ষককে পুরষ্কৃত করা নয়, বরং আমরা সমাজে এমন মূল্যবোধের চর্চাকে উৎসাহিত করি যাতে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’ না ঘটে।

যুক্তি দেখানো হয়, ‘সরকারকে শুধু শহরের কথা চিন্তা করলে হয়না, প্রত্যন্ত গ্রামের কথাও ভাবতে হয়’; কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েরাও বোধকরি আজ আর বাল্য বিবাহের কথা ভাবেন না। কলসিন্দুরের অদম্য সাহসী ফুটবলার মেয়েরা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ‘বিয়ে’ ‘প্রতিবন্ধী ছেলেশিশুর বউ ‘ হওয়া তাঁদের লক্ষ্য নয়, বরং জীবনকে সঠিকভাবে গড়ে নেয়াই তাঁদের লক্ষ্য।

বিশেষ বিধান নয়, বরং কন্যাশিশুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হোক। স্কুলের গেটে, স্কুলের পথে যেসব বখাটে ছেলেরা মেয়েদের উত্যক্ত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক; নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি ইত্যাদি ঘটনাগুলোয় অপরাধীর বিচার যথাযথভাবে কার্যকর করা হলে অপরাধের সংখ্যা যেমন কমবে, তেমনি ‘ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’ও এড়ানো যাবে।

‘বিশেষ বিধান’ এর যাঁতাকলে কন্যা শিশুর জীবনকে দুর্বিষহ করা নয়, বরং সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠুক নারীর প্রতি ‘যৌন হয়রানির ‘ বিরুদ্ধে।

আমি আমার লেখায় একটি কথা সবসময় বলি যে , মেয়েদের সঠিক ব্যক্তিত্বই পারে তাঁদের আত্মমর্যাদার সংগ্রামে টিকিয়ে রাখতে। তাই উচিত ধর্ষকের পুরস্কারের ব্যবস্থা না করে বরং শিক্ষা বাবস্থাকে ঢেলে সাজানো। অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, উন্নয়নমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা কারিকুলাম গ্রহণ করা, যাতে শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠতে পারে এক একজন সত্যিকারের খাঁটি মানুষ। 

আলোচনায় এই পর্বে এই প্রসঙ্গের অবতারনা করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, জাতিসংঘের ‘ নারীর প্রতি সকল বৈষম্য বিলোপে ‘ কিছু ধারার ব্যাপারে বাংলাদেশের আপত্তি অব্যাহত আছে ! সেখানে যুক্তি দেখানো হচ্ছে , ইসলামপন্থিরা ক্ষেপে যেতে পারেন! কী অদ্ভুত কথা! ক্ষমতা, রাজনীতি, ধর্ম ব্যবসায়ী ও ধনতন্ত্র যদি হাতে হাত ধরে চলে তবে নারীর মুক্তি সুদূর পরাহত!

ইতিমধ্যে শিক্ষা কারিকুলামে পরিবর্তনের নামে যা পরিবর্তন হয়েছে তা নিয়ে অনেক সমালোচনা শোনা যাচ্ছে , যা স্পষ্টত নারীর প্রগতির বিপক্ষে ! আসলে এসবই হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের রাজনৈতিকতা ; আমরা দেখতে পাই নারীর উন্নয়ন ও প্রগতির পথে প্রথম বাধা আসে ফতোয়ার বৈধতা দানের মাধ্যমে এবং এর হাত ধরে পরবর্তীতে আসে আরও সব সমালোচিত পদক্ষেপ !

২০১১ সালের ১২ মে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ে ফতোয়ার বৈধতার ঘোষণা যা আমাদের উদ্বেগে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল তখন; এই ফতোয়া, সালিশ কাদের স্বার্থে ছিল? সেই সময় সালিশ নিয়ে কিছু মর্মান্তিক ঘটনার জের ধরে মানবাধিকার সংস্থাগুলো আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলো; অথচ সব প্রচেষ্টা বার্থ করে দিয়ে
আদালতের রায়ে ফতোয়া বহাল থাকে!

জবরদস্তির এই প্রবঞ্চ সুবিধা দিচ্ছে আসলে গ্রামীণ ক্ষমতাশালীদের ! সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সময়ের আলোচিত ঘটনাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফতোয়া, সালিশ, ভিকটিমের প্রতিকূলেই গেছে আর
প্রভাবশালীদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। সালিশের অপমান সহ্য করতে না পেরে ভিকটিমের আত্মহত্যার ঘটনাও আমরা দেখেছি সংবাদমাধ্যমে। অথচ সেই সালিশ, ফতোয়ার পক্ষে রায় আমাদের এটা ভাবতে বাধ্য করে যে এটা আসলে
পুরুষতান্ত্রিক ভাবাদর্শের প্রকাশ বা ‘ মদিনা সনদের ‘ আলোকে দেশ পরিচালনার ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা!

এই ‘বিশেষ বিধান’ ‘ফতোয়া – সালিশ’ পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রতিক পরিবর্তন, সবই ‘মদিনা সনদ ‘ – এর আলোকে দেশ পরিচালনার ঘোষণার সাথে সম্পৃক্ত কিনা, তা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে, আশাকরি ভাববেন সকলে।

আজ হেফাজত সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে মূর্তি অপসারণের কথা বলে, অন্যথায় হুমকি দেখানোর সাহস দেখায় তাঁরা ! এই সাহস তাঁরা পায় কোথায়? আসলে ওই যে বললাম, বিশেষ ধরনের রাজনৈতিকতা; যা প্রথম শুরু হয়েছিলো
ফতোয়া বহাল থাকার রায় এর মধ্য দিয়ে।
এবং পরবর্তীতে আসে পাঠ্য পুস্তকে পরিবর্তন এবং সর্বশেষ বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনের খসড়ায় ‘বিশেষ বিধান’।

পরিশেষে একটি কথা বলে লেখাটি শেষ করতে চাই, বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের কথা যতোই বলা হোক, কিছু সাফল্য বাদ দিয়ে আজ পদে পদে বাধা নারীর অগ্রযাত্রায়; নারী যতোদিন না তা সম্যক উপলব্ধি করতে পারছেন, ততোদিন নারীর কাঙ্ক্ষিত মুক্তি সম্ভব নয় ; এবং এ জন্য প্রয়োজন নারীবান্ধব সমাজ গঠনের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ।

নাসরীন রহমান
কলাম লেখক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.