নিপীড়কের ১২টি বৈশিষ্ট্য, এবং কালশিটে দাগগুলো

মৌসুমী দাশগুপ্ত: অনেক অনেক্ষণ ধরে লিফলেটটা হাতে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে করবী। বাইরে শীতের বেলা পড়ে আসছে দ্রুতই, কুয়াশা কুয়াশা বিকেলটা সন্ধ্যেয় গড়ালো বলে। এক ঝাঁক সাদা কালো পোশাক পড়া স্কুলের ছেলেমেয়ে দলবেঁধে কিচিরমিচির করতে করতে রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরছে। ওদের কলতানে অবশেষ ঘোর কাটলো কিছুটা। গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলো একবার, কোঁকড়া চুলের গুছিগুলো কানের পেছনে সরিয়ে নিল, কিন্তু ওঠা হলো না।

আলো আঁধারীতে আবার চোখ পড়লো লিফলেটটার দিকে। একটি দাতব্য সংস্থার লিফলেট, লিফলেট না বলে পুস্তিকা বা booklet বলাটাই বরং ঠিক হয়, ছয়-সাত পাতার পাতলা একটা বই-ই। নিশ্চয় চিঠির বাক্সের ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে কোনো এক স্বেচ্ছাসেবক। সংস্হাটি নির্যাতিত নারী এবং শিশুদের নিয়ে কাজ করে, বেশ পরিচিত নাম, টেলিভিশনে তাদের বিজ্ঞাপন চোখে পড়েছে কয়েকবার। বইটিতে বারোটি তারকা চিন্হের পাশে বারোটি বৈশিষ্ট্য লেখা, একজন নিপীড়ক বা abuser এর বৈশিষ্ট্য।

প্রথমটা বেশ অবাক করা, CHARMING; শুনতে কী সুন্দর, গুণবাচক একটা শব্দ! পড়ে শুরুতেই করবীর মনে হয়েছিল Prince Charming এর কথা। ছোটবেলায় রূপকথার গল্পে যে কিনা ছিল ব্যাং রাজকুমার, রাজকন্যার চুমুতে ব্যাং রাজপুত্রের মানুষ হবার সেইই গল্পটা।

পুস্তিকা বলছে, আ্যবিউজাররা খুব চার্মিং হয়, তারা জানে কী করে মন জয় করতে হয়, সুন্দর সুন্দর কথার ফুলঝুরিতে তারা খুব দ্রুতই মন ভোলায়, মোহগ্রস্ত করে। ‘আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না’, ‘তোমাকে না পেলে ঠিক মরে যাব’ এধরনের কথাগুলো ওরাই বলে। কী অদ্ভুত! কী অদ্ভুত! অবাক হয়ে ভাবে করবী! এগুলো তাহলে সত্যি নয়? তবে যে এতোদিন ভেবেছিল…

পরের তিনটা বৈশিষ্ট্য অবশ্য অত ভাল নয়, JEALOUS, CONTROLLING, MANIPULATIVE. আবার ভাল নয়ই বা বলি কী করে? নিজের মানুষটির টুকটাক ঈর্ষা দেখতে কার না ভাল লাগে? ‘সুরঞ্জনা, ঐখানে যেও না কো তুমি, বোলো না কো কথা ঐ যুবকের সাথে/ কি কথা তাহার সনে, তার সনে?…’ জীবনানন্দীয় ঈর্ষার সেই ছবিটুকু কি মধুর! করবী অবশ্য জানে আপাত:মধুর সেই ঈর্ষায় কতটা গরল লুকিয়ে থাকে। ‘দিনরাত লুকিয়ে লুকিয়ে কার সাথে ঘাপলা (কি বিশ্রী একটা শব্দ!) কর?’ থেকে শুরু করে ‘আমার ছোটভাই এর দিকে চোখ পড়েছে তোমার, আমি জানি!’ পর্যন্ত অসংখ্য বিষবাক্যের তিক্ততায় জীবনানন্দ হারিয়ে গেছেন বহু আগেই।

আর নিয়ন্ত্রণ? শেষ কবে তার হাতে নিয়ন্ত্রণ ছিল? মনে করতে কষ্টই হয়। তার প্রতি পদক্ষেপের জবাবদিহি তৈরী থাকতে হয়, নাহলে…, সেটা না ভাবাই ভালো। তবে এসবই ওর ‘ভালোর জন্যে’। ‘আরে, তোমাকে ভালবাসি বলেই তো তোমার সব খবর আমাকে রাখতে হয়। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে কত বিপদ-আপদ, তুমি কি সব জানো?’ তাই তো! এ দেশের হালচাল করবী আসলেই তেমন জানে না। রাতদিন ঘরে বসে থেকে জানবার সুযোগই বা কই?

”An abuser always portrays himself as a victim. Nothing is his fault. Even after hitting his partner, he’ll say, ‘you made me hit you, it’s your fault.”
‘তুমি ছিঁচকাঁদুনি, তাই তো আমার রাগ উঠে যায় আর তোমার গায়ে হাত তুলে ফেলি। আমার দোষ, বলো?’ ‘আমাদের অফিসের ম্যানেজার শালা আমাকে একদম দেখতে পারে না, তাই আমার চাকরিটা চলে গেল। আমি সারাজীবনই পরিস্থিতির শিকার’।

He is also NARCISSISTIC and INCONSISTENT. এই ভাল, এই খারাপ। সকালে ভালবাসার কথা শুনে মন ভালো হয়ে গেল, কিন্তু দুপুর না হতেই মুখ ভারি, বিকেল হবার আগেই অকথ্য গালিগালাজ, কেন কোন দোষে, বুঝে উঠতে পারে না সে। না, সেটা নেহাত ভুল বলা হলো। তার দোষগুলো তাকে প্রতিনিয়তই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হয়।

‘কী হাবিজাবি রান্না করো? একফোঁটা মুখে তোলা যায় না।’ ‘কাপড়টাও ঠিকমতো ইস্ত্রি করতে জানো না, এরকম বউ থেকে লাভটা কী?’ এসব সমালোচনা রোজকার ডালভাত। An abuser is very CRITICAL, no matter how hard you try, you’ll never be able to satisfy him’.

এতোটুকু পড়ে আর এগোতে ইচ্ছে করেনি। মনে হয়েছে, কী হবে এসব জেনে? যাকে ভালবেসে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে সব ছেড়েছুঁড়ে চলে এলো, তার যদি কিছু দোষ ত্রুটি থাকে তো কী করার আছে? মানিয়ে নিতে হবে এই আর কী!

এবার তার উঠতেই হবে, সুদীপের ফেরার সময় হয়ে এলো বলে। ঘরের কোনো কিছু সামান্য অগোছালো হলেও সুদীপ বড় রাগ করে। সেজন্যই আসলে পাপোষের উপর পাতলা বইটা পড়ে থাকতে দেখে ওটা তুলে নিয়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলতে যাচ্ছিল করবী। হঠাৎ চোখ আটকে গিয়ে অযথা অনেকখানি সময় নষ্ট হয়ে গেল। এখনও তার খাবার বানানো বাকি, রাতের জন্য টুকটাক রান্নাও করতে হবে। কাগজটা ফেলে দিতে গিয়েও কী ভেবে রান্নাঘরের ছুরি-কাঁচি রাখার ড্রয়ারটার এককোণে রেখে দিল আবার।

সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে চা খাবার পর সুদীপ কিছুক্ষণ কম্পিউটারে বুঁদ হয়ে থাকে। দেশের যতো খবরের কাগজ অনলাইনে আছে খুঁটে খুঁটে সব পড়ে আর অনবরত বিরক্তিতে নাক সিঁটকায়। ‘দেখো কাণ্ড, আজকেও পাঁচটা খুন হয়েছে। কী যে হবে দেশটার!’ ‘দুর্নীতিতে এবারও আমরা শীর্ষে,বাহ্! সাবাশ বাংলাদেশ!’

অবাক হয়ে করবী মাঝেমাঝে ভাবে, একটা ভাল খবরও কী থাকে না কোনো একটা দৈনিকে! বলার সাহস করে না। তার কোনো কথায় বা কাজে কখন রেগে যাবে সুদীপ, এটা বুঝে ওঠাই মুশকিল। কে জানে হয়তো তারই বুদ্ধির অভাব! তবে যে সবাই বলতো… সবাই, সবাই, কারা সেই সবাই? সুদীপ ছাড়া আর কেউ তো তার জীবনে নেই-ই বলতে গেলে। বাবা সুদীপকে শুরু থেকেই অপছন্দ করেছিলেন, তারপরও করবীর জোর ইচ্ছার কাছে হার মেনে দিয়েছিলেন বিয়েটা। সুদীপের সাথে বাবার সম্পর্কটা কখনই সহজ হয়নি। সেকারণেই হয়তো ওর বাবার বাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ রাখাটা সুদীপ তেমন পছন্দ করে না।

করবী ভাবে, মা বেঁচে থাকলে ব্যাপারটা হয়তো অন্যরকম হতে পারতো, শাশুড়ীরাই তো জামাই আদর করে বেশি। কিন্তু মা তো চলে গেছেন সেই কত বছর আগে, করবীর ফ্রক পরা বয়সে। বাবা আর দাদা বউদির সাথে কালেভদ্রে ফোনে কথা হয়, তাও ‘কেমন আছো, ভাল আছি’ ধরনের কথাবার্তা। অথচ এই বাবা আর দাদাই ছিল করবীর পৃথিবী।
বুকের ভিতর থেকে একটা চাপা নি:শ্বাস বেরিয়ে আসে। তরকারীর কড়াইতে ঢাকুনিটা চাপিয়ে ধনেপাতা কুঁচানোর জন্য ছুরি বের করতে যেতেই আবার সেই কাগজটা।

An abuser is HYPERSENSITIVE and always tries to ISOLATE his victim from family and friends, so that she becomes totally dependent on him.
He is also VICIOUS and CRUEL. ‘I’ll kill you before I let you go’.

পিঠ ছাপানো একঢাল কোঁকড়ানো চুল আর ব্লাউজের নিচে গোল গোল সিগারেটের দাগগুলো শিরশির করে উঠে, দুচোখ জোর করে বন্ধ করে দৃশ্যগুলো স্মৃতির পর্দা থেকে আড়াল করতে চায় ও, ওসব মনে করবে না সে কিছুতেই। ভুলে যাবে বিচ্ছিরী গালিগালাজগুলো, ভুলে যাবে ঠোঁটে নিজের রক্তের স্বাদ, ভুলে যাবে শক্ত একটা হাত ওর দিকে উঠে আসার ছবিটা। কিছুতেই, কিছুতেই ওগুলো মনে আসতে দেবে না ও, ওগুলো সব ভুল, সব অতীত। সব মানুষই তো ভুল করে, তাই না! সুদীপ তো কতবারই ক্ষমা চেয়েছে ওর কাছে, বলেছে আর এরকম হবে না কোনদিন।

He will swear never to hit you again, but unless he receives professional help and develops strong accountability, it’s unlikely that he’ll change. Last and 12th characteristics of an abuser is being INSINCERELY REPENTANT.

হঠাৎ করে পোড়া তরকারীর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে রান্নাঘরে, কাগজটা ড্রয়ারে রেখে এক ছুটে ঢাকুনিটা সরাতেই করবীর জানা হয়ে যায় আজ তার কপালে অনেক দু:খ আছে।

পরদিন ঝুম দুপুরে একটি শ্যামাঙ্গী তরুণীকে দেখা যায় একটি পুস্তিকা হাতে টেলিফোনের কাছে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। কোঁকাড়ানো চুলের ফাঁকে ফাঁকে কিছুটা শুকনো রক্ত এখনো লেগে আছে, নীচের ঠোঁটটা বিশ্রীভাবে ফোলা আর সারা শরীরে প্রচন্ড ব্যথা।

কাগজে লেখা, ‘If this article helped you to realise, you or your loved one in an abusive relationship, call National Domestic Violence Hotline on this number.’
সাত সংখ্যার একটি নম্বর ছোটবেলার ছড়ার বইএর ‘টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার’ এর মত মেয়েটির চোখের সামনে ঝিকমিক করতে থাকে। যেন বলে, ‘ফোনটা করো, একটা ফোনই তো, একটু সাহস করে করে ফেলো, তাহলেই এই দু:সহ জীবন থেকে মুক্তি’।

তিরতিরে কাঁপা হাতটা উঠে আসে ফোনের রিসিভারে।
মন বলে, ‘ফোন করবে? কেলেংকারি, লোক জানাজানি, বাবা হয়তো দু:খে হার্টফেলই করবেন’। হাতটা আবারও নেমে যায়…

বি.দ্র. গল্পটা মনগড়া, কিন্তু বৈশিষ্ট্যগুলো নয় ।

শেয়ার করুন:
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
    16
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.