বাঙালী নারীর পোশাক…

মৃন্ময় আহসান: পোশাকের প্রধান কাজ ক্ষতিকর বস্তুর হাত থেকে শরীরকে সুরক্ষা দেয়া, যেমন: প্রখর সূর্যতাপ, শীতল বায়ু, বৃষ্টির পানি প্রভৃতি প্রাকৃতিক বস্তু যেগুলোর মাত্রাতিরিক্ত সংস্পর্শ মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়াও পোকা-মাকড় বা অন্যান্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে প্রাথমিকভাবে শরীরকে রক্ষা করাও পোশাক ব্যবহারের অন্যতম প্রধান কারণ। মানবসভ্যতার আদিতে আমাদের পূর্বপুরুষেরা গাছের লতা-পাতা, ছাল-বাকল, পশু-পাখির চামড়া-পালক প্রভৃতি দিয়ে পোশাকের কাজ চালাতো।

মূলত অঞ্চলভেদে আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর নির্ভর করত পোশাকের ধরন। পোশাক তৈরির উপাদান হিসেবে উক্ত অঞ্চলে প্রাপ্য ও সহজলভ্য বস্তুর উপরই নির্ভরশীল ছিল আদিম মানুষেরা। সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষের পোশাকের ক্ষেত্রেও বিবর্তন ও আধুনিকায়ন চোখে পড়ে। পোশাক ব্যবহারের মৌলিক কারণগুলো ছাড়াও ঐচ্ছিক কিছু কারণও যুক্ত হয়, যেমন: শরীরের সৌন্দর্য বর্ধন করা, যৌনাঙ্গ ঢেকে রাখা ইত্যাদি।

বাঙালী নারীর পোশাক কী? চোখ বন্ধ করলে প্রথমেই কল্পনায় যে ছবি ভেসে ওঠে তা হচ্ছে ‘শাড়ি পরিহিতা একজন বাঙালী নারী!’ বাঙালী নারীর পোশাকের ইতিহাস মূলত শাড়ির ইতিহাস! যদিও হাল সময়ে শহুরে মেয়েদের ওয়ারড্রবে সালোয়ার-কামিজ, জিন্স-টপস, বোরখা-হিজাব, টিশার্ট এসে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু গ্রামীণ বা আধা-শহুরে সমাজ, এমনকি পুরোদস্তুর শহুরে সমাজেও আটপৌরে শাড়ির কদর খুব একটা কমেনি। শাড়ি কেবল নদী-বিধৌত এই ব-দ্বীপের নারীদের পোশাক’ই নয়, উপমহাদেশের বেশ কতগুলো অঞ্চলেও হাজার হাজার বছর ধরে ১২ হাত লম্বা এই পোশাকটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু বাঙালী নারীর মতো এতোটা আপন করে আর কেউ শাড়িকে গ্রহণ করতে পারেনি।

দীর্ঘ এই পথ পরিক্রমায়, শাড়িতে লেগেছে বিবর্তনের ছোঁয়া। একগিট, এক কুঁচি থেকে কয়েক কুঁচি; যুগে যুগে পরিবর্তন এসেছে বাঙালী নারীদের শাড়ি পরার ধরনে। অন্যান্য সংস্কৃতির প্রভাবে আধুনিক বাঙালী নারীর পোশাক হিসেবে শাড়ির সাথে যুক্ত হয়েছে ব্লাউজ, পেটিকোট প্রভৃতি। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের মোঘল শাসন, পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসন; নানাবিধ সংস্কৃতির প্রভাব সত্ত্বেও শাড়ি টিকে গেছে বাঙালী নারীর প্রধানতম পোশাক হিসেবে।

২.

পোশাকের সাথে সম্পর্কযুক্ত আবহাওয়া ও জলবায়ু, তথা প্রাকৃতিক পরিবেশ যা পৃথিবীর একেক স্থানে একেক রকম। কোথাও শীত বেশি, কোথাও গরম; কোথাও প্রবল বর্ষণ তো কোথাও তীব্র খরা। এজন্য বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের সংস্কৃতি ও তার বস্তুগত উপাদান হিসেবে পোশাক-আশাকও ভিন্ন ভিন্ন। আফ্রিকার উষ্ণ অঞ্চলের নারীরা যেমন ভারী পোশাক পরে চলতে পারবে না, তেমনি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলে বসবাসকারী নারীরাও প্রচণ্ড শীতের মধ্যে কেবল হালকা সুতির কাপড় পরে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবে না। পোশাকের সার্বজনীনতা নিছক’ই বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।

নব্বইয়ের পর থেকেই ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে’ এক শ্রেণীর ধর্ম ব্যবসায়ীরা খুব পরিকল্পিতভাবে নারীদের পোশাক নিয়ে শোরগোল করে আসছে। ওয়াজ-মাহফিল, তাবলীগ-বয়ানের মাধ্যমে প্রথমে ‘হিঁদুয়ানি পোশাক’ বলে শাড়িকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এরপর নারীদের অন্যান্য পোশাকগুলোরও সমালোচনা করে বোরখা-হিজাব প্রোমট করা হচ্ছে। ফলে শহরে বা আধা-শহুরে সমাজে বোরখা-হিজাব পরিহিতা নারীর সংখ্যা বাড়ছে। পোশাকের ক্ষেত্রে খুব সচেতনভাবেই সংস্কৃতির পরিবর্তে ধর্মীয় ট্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। আদতে এ ধরনের কার্যকলাপের মূল লক্ষ্য, ধীরে ধীরে নারীর চলাচল সঙ্কুচিত করে আনা। অতঃপর তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা। এর ফলে লাভবান হবে উক্ত ধর্ম ব্যবসায়ীরা।

নারীর প্রতি সহিংসতার জন্যও ধর্ম ব্যবসায়ীরা নারীর পোশাককেই বারবার দায়ী করে থাকে। তাদের মত অনুযায়ী নারীকে চটের বস্তা দিয়ে আগাগোড়া মুড়িয়ে দিলেই সহিংসতা থেমে যাবে! অথবা নারী ঘর থেকে বের না হলেই হয়! মাথা ব্যথা যেহেতু হচ্ছে, মাথাটাই বরং কেটে ফেলা আর কি!

নারী দেখলে লোল পড়া যাদের প্রবৃত্তি, তাদের লোল আটকানোর সাধ্য চটের বস্তা বা কংক্রিটের দেয়াল, কোনটারই নেই! লোল ঝরা মানুষগুলোর জিহ্বা কেটে ফেলা এক্ষেত্রে একটা সমাধান হতে পারে বৈকি!

৩.

ধর্ম ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য যেমন আছে, তেমনি এদেশে কিছু সাইনবোর্ডধারী ‘প্রগতিশীল’ গোষ্ঠী আছে যাদের সাথে উক্ত ধর্ম ব্যবসায়ীদের বৈসাদৃশ্য সামান্যই। ধরুন মেঘের কারণে একদিন আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না, এই শ্রেণীর প্রগতিশীলেরা বলবে এর জন্য ধর্ম দায়ী! বিশেষ করে, বিশেষ একটি ধর্মই কেবল দায়ী!

সংস্কৃতির কোন উপাদান যেমন রাতারাতি তৈরি হয় না, তেমনি রাতারাতি নিঃশেষও হয় না। শত শত বছর ধরে পলি জমতে জমতে যে ভূমি গড়ে ওঠে, তা কেবল এক রাতের জলোচ্ছ্বাসেই পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে না। আর গেলেও, সেখানকার জল অগভীর থাকে, মারিয়ানা ট্রেঞ্চ হয়ে ওঠে না!  

মৃন্ময় আহসান

বোরখা-হিজাব যেভাবে, বা যে উপায়েই আসুক না কেন, বিজাতীয়-সাম্প্রদায়িক পোশাক হিসেবে এগুলোকে এককথায় বাতিল বলে দেয়াটা কোনো কাজের কথা না। একইভাবে হিজাব পরিহিতা কোন নারী দেখলেই তাঁকে সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় মৌলবাদী ভেবে নেয়াটাও অন্যায়।

আপনি যখন হিজাব-বোরখা দেখলেই ‘গেল! গেল!’ রব ওঠাবেন; আর টপস-জিন্সসহ অন্যসব পশ্চিমা ধাঁচের নারী পোশাকের ব্যাপারে প্রশ্ন উঠলে বলবেন ‘এগুলো সাম্প্রদায়িক পোশাক নয়!’ তখন বুঝে নিতে হবে ‘সম্প্রদায়-মৌলবাদ’ সম্পর্কে আপনার ধারণা ঠিক ‘পরিণত’ নয়। জনমানুষের পালস না বুঝলে, সংস্কৃতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা ও শ্রদ্ধা না থাকলে; আপনার সুপারিশকৃত সমাধান সমাজে আরও নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।

৪.

মানবসভ্যতা মূলত অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে, কোনমতেই পিছিয়ে যাচ্ছে না। এমনকি কেউ চেষ্টা করলেও আমাদের আর পিছনে টেনে নিয়ে যেতে পারবে না। কোন মানুষ বা গোষ্ঠী নয়, মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সময়। আর সময়কে কে’ই বা বেঁধে রাখতে পারে? পারে না!

সংস্কৃতি স্থির নয়, পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনও আবার রাতারাতি হয় না, বরং তা হয় প্রয়োজনের তাগিদেই। কোন ধর্ম ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী বা অন্য কেউ নয়; নারীর পোশাক কী হবে সেটা নারীকেই নির্দিষ্ট করতে হবে। সেই পোশাক শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, টপস-জিন্স, টিশার্ট, বোরখা-হিজাব যা’ই হোক; সেটা যেন হয় নারীর জন্য আরামদায়ক ও কার্যোপযোগী। সেই পোশাক যেন কোনভাবেই নারীর চোখের দৃষ্টিকে ‘সঙ্কুচিত’ অথবা ‘বিমুখ’ করতে না পারে। নারী যেন তার স্বাভাবিক দৃষ্টি দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চারপাশটা দেখতে পারে, এটুকুই প্রত্যাশা।

আইনস্টাইনের একটা কথা দিয়ে শেষ করি, “জীর্ণ পোশাক বা সস্তা আসবাবপত্র নিয়ে লজ্জিত হবার চেয়ে জীর্ণ চিন্তা বা সস্তা দর্শন নিয়ে বেশি লজ্জিত হওয়া উচিৎ। ভিতরের বস্তুর চেয়ে বাইরের মোড়ক বেশি আকর্ষণীয় হলে সেটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।”

মৃন্ময় আহসান, গল্পকার

ইমেইলঃ [email protected]

শেয়ার করুন:
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
    27
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.