তর্কযুদ্ধ: লেখকপত্নী বনাম নির্মাতা

শারমিন জান্নাত ভুট্টো: “ডুব” চলচ্চিত্রটি নিয়ে এখন যুক্তি আর পাল্টা যুক্তিতে ভরপুর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কেউ ধরছেন এক পক্ষের হাত, তো অন্যরা নিচ্ছেন এক হাত। তবে কেউ যদি এ বিষয়টা নিয়ে আমার মত জানতে চায়, তবে বলার অপেক্ষা রাখে না বিষয়টি নিয়ে আমিও আছি ফিফটি-ফিফটির ঘরে। কীভাবে সেটা সম্ভব? বলছি একটু শুনুন সময় নিয়ে।

১. শ্রদ্ধেয় লেখক হুমায়ূনপত্নী মেহের আফরোজ শাওন তার অভিযোগনামায় উল্লেখ করেছেন যে, তার আশংকা রয়েছে “ডুব” চলচ্চিত্রটিতে লেখকের এমন কিছু বিষয় এসেছে যা তাকে ও তার পরিবার এবং সর্বোপরি লেখকের ইমেজ জনসাধারণের কাছে ক্ষুণ্ণ হবে। এখন স্বাভাবিকভাবেই আমার মতো সাধারণ জনগণের মনে প্রশ্ন জাগছে, আমরা যারা লেখক হুমায়ূনের ভক্ত, তারা তাঁর জীবনের কোন দিকটি সম্পর্কে জানি না? তাঁর বাবা-মা, ভ্রাতৃদ্বয় এবং তাঁর সংসার জীবনের দুটি অধ্যায় সবকিছুই কিন্তু ওপেন সিক্রেট। তাহলে আর কী শংকা লেখকপত্নীর মনে জাগছে, ঠিক বোধগম্য হলো না।

লেখক ছাড়াও আরও তিনটি চরিত্র রয়েছে বলে পত্রিকার খবরে আমরা জানতে পারি। ইরফান খান অভিনীত ‘ডুব’ চলচ্চিত্রে ধারণা করা হচ্ছে লেখকের প্রথম স্ত্রী, তার কন্যা এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর চরিত্রে রুপদান করেছেন যথাক্রমে রোকেয়া প্রাচী, নুসরাত ইমরোজ তিশা এবং কলকাতার পার্ণো মিত্র। যেভাবে শাওন ডুব চলচ্চিত্রটি নিয়ে একের পর এক বক্তব্য দিচ্ছেন সেভাবে কিন্তু লেখকের প্রথম স্ত্রী কিংবা তাঁর সন্তানদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আমরা শুনতে পাইনি। তার মানে কী এই যে, লেখকের যেকোনো বিষয় নিয়ে কথা বলার বা মত প্রকাশের অধিকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শুধুমাত্র শাওনের ওপরই বর্তায়? জানি না যেসব প্রশ্ন তুললাম, তার উত্তরই বা কে দিবে! মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল তাই স্বাভাবিকভাবেই তা চলে আসলো সবার সামনে।

২. বেশীদিন আগের নয় একটি হিন্দি চলচ্চিত্রের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে এখানে প্রসঙ্গক্রমে। প্রকাশ ঝা পরিচালিত চলচ্চিত্রটির নাম “রাজনীতি”। চলচ্চিত্রটিতে দেখানো হয় কিভাবে একটি পরিবার রাজনীতি, কর্তৃত্ব আর ক্ষমতার টানাপোড়েনে তাদের সম্পর্কগুলোকে বিসর্জন দিচ্ছে। চলচ্চিত্রটি দেখলে যে কেউই ভুলে ভেবে বসতে পারেন এটি হয়তো ভারতের ঐতিহ্যবাহী গান্ধী পরিবারকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে। তবে এখানে চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক খুবই দক্ষতা ও নিপুণতার সাথে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন, যেখানে দর্শকদের কিছুটা ভাবিয়ে তুলেছেন আর ঠেলে দিয়েছেন ইতিহাস, বাস্তবতা আর কল্পনার মাঝে। কিছু একটা মিলে যেতে যেতেও কোথায় যেন একটা অমিল। অনেকটা অপূর্ণতার বেদনা, তবে সেটা খারাপ কিছুই নয়। যে কারণে এ চলচ্চিত্রটির কথা উল্লেখ করলাম তা হচ্ছে প্রকাশ ঝা’কে কিন্তু গান্ধী পরিবার থেকে কোনো ধরনের অনুমতি নিতে হয়নি, কিংবা গান্ধী পরিবারের কোনো সদস্য বা প্রতিনিধিও এ বিষয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি। অমিতাভ বচ্চন অভিনীত অসম প্রেম নিয়ে চলচ্চিত্র “চিনিকম” আর “নি:শব্দ” এর সাথে লেখক হুমায়ূনের জীবনের কোনো অংশ মিলে গেলে তা নিতান্তই হবে কাকতলীয়।

একটি চলচ্চিত্র শুধুমাত্র তার গল্পের উপর ভর করেই চলে না, সেই সাথে মজবুত কাঠামো তৈরি করে পরিচালকের ভিজ্যুয়ালাইজেশন এবং তার ইমাজিনেশন পাওয়ারের (দু:খিত অনেকগুলো বিদেশী শব্দ ব্যবহারের জন্য) উপর। যেহেতু বাস্তব আর অবাস্তবতার সাথে মিল-অমিলের বিষয়টি দর্শক কোনো চলচ্চিত্র দেখার পরেই বুঝতে পারে, তাই এবারও ঠিক তেমনভাবেই দর্শকের হাতেই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের দায়িত্বটা দেয়া হোক।

“ডুব” চলচ্চিত্রটি দেখার সুযোগ পেলেই না তবে দর্শকরা তাদের রায় দিতে পারবে। দর্শক আর পাঠকের ভালবাসাতেই হুমায়ূন আহমেদ লেখক এবং চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন হয়েছেন। ব্যক্তিজীবন যদি কোনদিন রুপালী পর্দায় প্রদর্শিত হয়ও, মনে হয় না শ্রদ্ধেয় লেখকের জনপ্রিয়তায় কোনদিনও ভাটা পড়বে। পাঠক কিংবা দর্শকই যে দিনকে দিন হুমায়ূনকে তাদের মনে বাঁচিয়ে রাখছে, তা তাঁর পরিবারকেও স্বীকার করতে হবে নি:সন্দেহে।

৩. তবে হ্যাঁ, শাওন যে ধরনের অভিযোগ করছেন তা একেবারেই ফেলনা নয়। তিনি হয়তো ভাবছেন এমন কোনো স্পর্শকাতর বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে তার অজান্তে যা হয়তো তাঁর পরিবারের জন্য সাদরে গ্রহণ করাটা স্বাভাবিক হবে না। এমনিতেই লেখকের সংসার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় নিয়ে বহু কটু কথার শিকার হতে হয়েছে শাওনকে। বিষয়টা এমন পর্যায়ে গেছে যে, মনে হচ্ছে বান্ধবীর বাবাকে কেবল শাওনই বিয়ে করেছে, মেয়ের বন্ধুকে বিয়ে করেননি হুমায়ূন। অন্যায় যা করার সব শাওন করেছে, আর হুমায়ূন পুরুষ বলে তিনি ধোয়া তুলসী পাতা। আশ্চর্য আমাদের সমাজ!

আমাদের দেশের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এমনই যে, সেখানে পুরুষদের দ্বিতীয়, তৃতীয় বিয়েতে কোনো আপত্তি থাকে না। কিন্তু সেই একই সমাজে কোনো মেয়ে যদি দ্বিতীয় পত্নী হয়, কিংবা হয় বিধবা তাহলে তো কথাই নেই। ইট,পাটকেল সবই খেতে হয় ওই নারীকে। সমাজটা এমন যেখানে নারীর ঘাড়ে অন্যরা নি:শ্বাস নেয়, আর কাজ সারার পর সেই নারীর ঘাড়েই দোষ চাপিয়ে দিতে মহা ওস্তাদ।

তবে এখানে ব্যক্তি শাওনের যে জায়গায় ভুল হচ্ছে বলে আমি মনে করি (বার বার বলছি এটা আমার মত, তা ভুলও হতে পারে), তা হচ্ছে বরাবরের মতো তিনি লেখক হুমায়ূনকে সবার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রেখে “গড” (সম্পূরক অর্থে) এর আসনে বসিয়ে দিচ্ছেন। মানুষ হিসেবে সবারই কম-বেশী ভুল, ত্রুটি, বিচ্যুতি থাকেই। হুমায়ূনও ব্যতিক্রম ছিলেন না, বরং প্রবলভাবেই সেই ভুলগুলো করেছেন। তবে তিনি তাঁর জীবনে কোন কিছুই লুকিয়ে করেননি। তাহলে হুমায়ূনের কোনো কর্মের জন্য শাওন আপনি কেনো বারংবার নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন?

হুমায়ূনের জীবনপঞ্জি তাঁর সব বইয়ের থেকেও সবচেয়ে বেশী আলোচিত,আলোড়িত এবং সবচেয়ে বড় “ওপেন বুক”। শাওন যখনই এ খোলা বইয়ের ওপর মোড়ক বসাতে চান, তখনই কিন্তু ঝামেলাগুলো বাঁধে। লেখক হুমায়ূন কিন্তু এখন আর ব্যক্তি পর্যায়ে নেই, ছিলেনও না, তিনি দেশের সম্পদ আর তাঁকে নিয়ে উন্মাদনা হবে, যা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। এটা হয়তো মানিয়ে নেয়ার সময় এসেছে।

আশংকা করছি, অনেক অন্ধ ভক্ত হয়তো বলেও বসতে পারেন, যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাদম্বিনীকে নিয়ে তৈরি হওয়া কোনো চলচ্চিত্র আটকে না যায়, তাহলে লেখক হুমায়ূন ও তার সম্পর্কের জাল নিয়ে কেনো বুনন হবে না? হুমায়ূন কি শুধুই শাওনের যেখানে অন্যদের ভালবাসা প্রকাশের আর কোনো অধিকার নেই? হুমায়ূন ভক্ত বলে কথা, তাই এধরনের প্রশ্ন তারা করতেই পারে অনায়াসে।

৪. চলচ্চিত্রের ভাষায় “ Special Screening” বলে একটা শব্দ আছে। যেহেতু কারো ব্যক্তিগত বিষয় অনুমতি ছাড়াই চলচ্চিত্রে ফুটে উঠার আশংকা তৈরি হয়েছে, সেখানে এই Special Screening করে কি সেই সমস্যা উতরে যাওয়া যেতো না? নেগেটিভ মার্কেটিংও বড় একটা বিষয় এখনকার যুগে। বলা হয়ে থাকে যে, হিলারি ক্লিনটন নির্বাচনে হেরেছেন কারণ তার পিআর টিম সবসময় প্রচার করতে থাকতো ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতিবাচক দিকগুলো। আর এভাবেই অনেকটা অজান্তে কিংবা নিজেদের ভুলে হিলারি টিমই জনপ্রিয় করে তুলেছে ট্রাম্প বাহিনীকে।

ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে ভারতের নির্বাচনে। যেখানে নরেন্দ্র মোদীকে নিচু দেখাতে প্রতিপক্ষ সব সময় ব্যস্ত ছিলো। শুধু তাই নয়, চায়ের দোকানে কাজ করে এখন রাজনীতির মাঠে লড়াই করছে, প্রতিপক্ষ এই নেতিবাচক খবর প্রচার করার কারণেই কিন্তু সর্বমহলে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন মোদী।

‘ডুব’ যদি নেতিবাচক প্রচারণা পেয়ে থাকে তাতে খুব একটা সমস্যা আমি নিজেও দেখছি না। নেতিবাচক এ মার্কেটিংকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছেন দুপক্ষই। ফারুকীর পাতা ফাদেঁ পা দিলেন শাওন? নাকি দুজনেরই ফাঁদ এটি, বুঝতে হবে।

৫. একটু আগেই যে নেগেটিভ মার্কেটিংয়ের কথা বলছিলাম তার আদৌ কি কোন দরকার আছে মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর মতো জনপ্রিয় নির্মাতার? নাটক, বিজ্ঞাপন কিংবা চলচ্চিত্র সর্বত্রই যেখানে তার স্বচ্ছন্দ পদচারণা, তাকে কি কারোও ঘাড়ে বন্দুক রেখে লক্ষ্য ঠিক করতে হয়, ঠিক মানতে পারলাম না। তবে হ্যাঁ তিনি যদি সত্যিই কোন বায়োপিক বানিয়ে থাকেন, যদিও দর্শক সেটি জানতে পারবে চলচ্চিত্রটি হলে দেখার পর, তবে তার জন্য ফারুকী সাহেবের সৌজন্যতা প্রকাশ অবশ্যই বাঞ্ছনীয়।

তবে কোনো ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ, আর কারো জীবনকে উপজীব্য করে বায়োপিক বানানোর মাঝে যে ব্যাপক বিস্তর রয়েছে, তাতো আমরা সাধারণ দর্শকও বুঝতে পারছি। তাহলে আসল সমস্যাটা কোথায়? উত্তর নিশ্চয় খুঁজে বেড়াচ্ছে হুমায়ূন ভক্তরা। সত্যিই যদি “ডুব” একটি বায়োপিক হতো, তবে এ চলচ্চিত্রের সাথে জড়িতরা বিশেষত প্রযোজক অবশ্যই অনুমতি সাপেক্ষে সেটি নির্মাণ করতো শুধুমাত্র আইনী জটিলতা থেকে রেহাই পেতে।

শারমিন জান্নাত ভুট্টো

আরো একটি শংকা ও প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর সেটি হলো জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রযোজক সংস্থা না হয়ে যদি ইমপ্রেস টেলিফিল্ম হতো, তখনও কি এভাবেই শাওন আওয়াজ তুলতেন? জানি না, তবে এটি শুধুই একটি শংকা মাত্র।

যেকোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে কতো কাঠ-কয়লা পোড়াতে হয়, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সেখানে আশংকা আর আপত্তির জের ধরে কোনো অভিযোগ করা এবং সেই চলচ্চিত্রকে মুক্তির আলো দেখতে না দেয়াটা খুব একটা বিচক্ষণতার কাজ নয়। এমনিতেই আমাদের চলচ্চিত্রের যে হাল, তাতে দর্শকদের খুব একটা হলে টেনে নেয়া যায় না। তার উপর তথ্য মন্ত্রণালয় আর সেন্সর বোর্ডের সেন্সলেস কাজ দেখলে তো নির্মাতাদের আগ্রহে ভাটা পড়তে দেরী হবে না।

মিডিয়ার সহকর্মী একে অপরের প্রতি কী ধরনের সম্মান,ভালবাসা আর আস্থা পোষণ করে তা হয়তো আমরা সাধারণ জনগণ দেখতে পাই, বা অনুধাবন করতে পারি শুধুমাত্র শিল্পীদের কাজের ধরন দেখে। সুলতান সুলেমানের বিপক্ষে নেমে শিল্পী সমাজ জানান দিয়েছিলো তারাও পারে ঐক্যবদ্ধ হতে। আর এখন এও দেখলাম তারা চাইলে অভিযোগের ভিত্তিতে চলচ্চিত্রও আটকে দিতে পারে অনায়াসে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে শিল্পী সমাজ এমনকি জনগণ, কারো মাঝেই নেই ঐক্য, কিংবা দেখা মিলে না শান্তির ঝলক। আপাতদৃষ্টিতে, ঐক্য ও শান্তি দুজনেই এখন নিরুদ্দেশ। ফিরে আসুক তা সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.