ভাষা থাকুক যার যার, রাষ্ট্র হোক সবার

সাদিয়া রহমান: একুশ মানে চেতনা, একুশ মানে মাথা নত না করা। ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস। ফেব্রুয়ারি মানে বই মেলা। যেই ফেব্রুয়ারির এত মাহাত্ম্য, এত গৌরবান্বিত ইতিহাস জেনে বড় হয় বাঙালীরা, “বাংলাদেশী”দের সবার কাছেই কি তা এতোটা গৌরবের?

ওই যে পাহাড়ে যাদের বসবাস, ওই যে সিলেটে যে জাতির ঠিকানা, সেই যে গোবিন্দগঞ্জে যাদের ভিটামাটি ছিলো, তারাও তো বাংলাদেশীই, না? তাদের কাছেও কি এই দিনটা এতোটাই গৌরবের? গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হওয়া সংবাদ বলে ২০১৬ সালেও পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ রাস্তায় নেমেছিলো মাতৃভাষায় অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের দাবি নিয়ে।

শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে তা অবশ্য জানা নেই। তবে এটুকু জানা আছে যে বৈষম্য এতোদিন ধরে তৈরি হয়েছে তা এক বছরে যাওয়া হয়তো সম্ভব না। তবু তা দূর করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া উচিত জোরেশোরেই। যেই ভাষাকে ভালোবেসে ১৯৫২ সালে কারফিউ ভেঙেছিলো তৎকালীন তারুণ্য, বুকে ধারণ করেছিলো বুলেট সেই ভাষাভাষীর মানুষেরা কিনা সেই অঞ্চলের সবার মাতৃভাষা সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে? 

তৎকালীন পাকিস্তানের একমাত্র মাতৃভাষা উর্দু করতে চাওয়ার অন্যায় প্রতিবাদে যেই শক্তি, যেই চেতনা মাঠে নেমেছিলো, সমতার যে স্বপ্ন নিয়ে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলো, সেই একই অঞ্চলে যখন একজন আদিবাসীকে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য দ্বিতীয় ভাষা বাংলা শিখতে হয়, তখন তা ভারী কষ্টের হয় নাকি?

সারা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে আমাদের এই ২১শে ফেব্রুয়ারি। সারা পৃথিবীতেই বিভিন্ন দেশে বেশ জাঁকজকমভাবে পালন করা হয় এই দিন। এমনকি এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামাবাদেও ২০১৫ সালে পাঞ্জাবী ভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দানে রাস্তায় দাঁড়ায় সেখানকার মানুষ। 

উইকি বলছে ভাষার জন্য এই দান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পাওয়ার তাৎপর্য হলো  “To promote the preservation and protection of all languages used by people of the world”। 

এতো বড় একটা স্বীকৃতির যে গৌরব তা কি আদিবাসীদের ভাষার কষ্টে বেশ ম্লান হয়ে যায় না? মজার ব্যাপার হলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই ইস্যুটা প্রায় আড়ালেই থেকে যায়। আড়ালে থেকে যায় তাদের শিক্ষা, তাদের ভাষা। তাদের সম্পর্কে ধারণা বলতে এটুকুই থেকে যায় তারা পাহাড়ে মাচাতে বাস করে এবং তাদের জন্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা থাকে। এই ধারণা নিয়ে আর কতদিন?

আমরা পারি, আমরা অতীতে পেরেছি আমরা ভবিষ্যতেও পারবো ভাষাকে মর্যাদা দিতে। ভাষার মর্ম আমরা বুঝি আমরা জানি। এই বই মেলায় এই ভাষার মাসে আমরা আশা করতে চাই আর কাউকে মাতৃভাষার জন্য রাস্তায় নামতে না হোক। এই ভাষার মাসে বলতে চাই “ভাষা থাকুক যার যার রাষ্ট্র হোক সবার”? 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.