নারীবাদী আন্দোলনে আমি কি অচ্ছুৎ?

বিথী হক: যে মেয়েটা, যে ছেলেটা নারীবাদ শব্দটার সাথে পরিচিত নয় তারা যদি ব্যাক্তিজীবনে এর প্রয়োগ করতে চায় তাহলে কি পারবে? মানে তারা তো নারীবাদ বোঝে না, সে বিষয়ে পড়াশোনাও করেনি। তাদের কি তাহলে নারীবাদ চর্চা সহীহ?

এটা অবশ্য নতুন ট্রেন্ড নয়। বাঙালি ইতিহাস বলে একজন কিছু করতে চাইলে বা ভাল কিছু করলে তার পা চেপে ধরে নিচে নামিয়ে আনা আমাদের জাতীয় সুন্নতি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমরা কিছু পারি আর না পারি অন্যকে ম্যানিপুলেট করতে আমাদের জুড়ি মেলা ভার। এমনিতেই নারীবাদ আন্দোলনটা এই অর্ধশিক্ষিত/অশিক্ষিতের দেশে হেসে উড়িয়ে দেবার মতো ঠুনকো বিষয়। এ দেশে নারী কী, আর নারী আন্দোলনই বা কী!

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী বর্তমান শিক্ষার হার ৬৫ শতাংশ। এই শিক্ষিতের মধ্যে অর্ধেক যদি নারী হয় তাহলেও সাড়ে ৩২ শতাংশের বেশি শিক্ষিত নারী হয় না। এই ৩২ শতাংশ নারীর মধ্যে কতজন নারীবাদী? মানে কতজন নারী নিজেদের অধিকার বিষয়ে সচেতন? নারীবাদ তো অধিকার মানে সমানাধিকার আদায়ের আন্দোলন, না কি? তো, সে অধিকার সম্পর্কে কতজন সচেতন? কতজন নারী স্বামীর মাইর না খেয়ে নিজে উপার্জন করে? সে সংখ্যা কতটা সবাই জানে, যেমন জানে এ দেশের নারীরা নিজে উপার্জন করে খাওয়ার চেয়ে স্বামীর মাইর খেয়ে দু’বেলা খাবার খাওয়াকে সুবিধাজনক মনে করে।

তো, এই যখন দেশের সার্বিক চিত্র আর নারীবাদের উত্থান তো নারীবাদকে এবং সেইসাথে নারীবাদীদের আমাদের মাথায় তুলে নিয়ে নাচবার কথা। তারা তো চেইঞ্জমেকার, যুগ যুগ ধরে চলে আসা নারী নিপীড়ন বন্ধে এরাই তো অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।  

কিন্তু কেউ যদি হঠাৎ করে এসে বলে এরা মানে, এসব নারীরা, যারা নারীবাদী আন্দোলন করছে, তারা এসব আন্দোলন-টান্দোলন করতে পারবে না। পারবে না কারণ তারা র‍্যাডিক্যাল ফেমিনিজম বোঝে না, সেকেন্ড ওয়েভ ফেমিনিজম বোঝে না। তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়ালো?

ধরলাম তারা পড়াশোনা জানে না। তাহলে যারা পড়াশোনা জানে না, তারা সমানাধিকার দাবি করতে পারবে না? সমানাধিকারের জন্য লড়াই করতে পারবে না? অধিকার কি শুধুই পড়াশোনা জানা পণ্ডিত, তালেবরদের জন্যই?

ধরেন আমি অশিক্ষিত, আমি মূর্খ, আমি নারীবাদ নিয়ে পড়াশোনা করিনি, নারীবাদ বলে যে একটা শব্দ আছে তাও কোনদিন শুনিনি। তাহলে কি আমি নারীবাদী হতে পারবো না? নারীবাদ পড়াশোনা জানা শিক্ষিতদের আন্দোলন? শুধুমাত্র তারাই এসব বড় বড় টপিক নিয়ে কথা বলতে পারবেন? আমার মতো অশিক্ষিত, অল্পবিদ্যার মানুষ নিজের অধিকার কি সেটা জানতে চাইতে পারবো না? আমার অধিকার বিষয়ে বড় গলা করে কথা বলতে পারবো না?

আমি বলতে পারবো না আমাকে ধর্ষণ করে রক্তাক্ত করে ক্ষমতাশালীরা ঝোঁপের আড়ালে ফেলে গেলে সেই রক্ত শুধু আমার একার শরীর থেকেই যায় না, আমার রক্ত সমগ্র নারীর শরীর থেকে যায়!

আমি বলতে পারবো না আমার স্বামী-শ্বশুর সব ভালো ভালো খাবার খেয়ে অল্প একটু ঝোল-ভাত রেখে যায় আমার আর বাড়ির বউগুলোর জন্য? আমি কি বলতে পারবো না, আমি নারী বলে কতবার মানুষের কাছে আমার পছন্দ/অপছন্দের ধার না ধেরে নিজের জীবনের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছি! তারপর কোনো একদিন নিজের শক্তিতে, নিজের পায়ে, নিজের বুদ্ধিতে উঠে দাঁড়িয়েছি। নতুন করে স্বপ্ন দেখেছি, আবার নিজের মতো করে বেঁচেছি। আমি আর কারও ধার ধারি না, আবার আরেকজন পুরুষসিংহকে জীবনের সাথে জড়িয়ে আমার নতুন জীবন সাজিয়ে তার হাতে তুলে দেব না, এটা আমার সিদ্ধান্ত।

আমি কি এসব বলতে পারবো না? আমি বিয়ে করবো কী না, বিড়ি খাবো কী না, ওড়না পরবো কী না; আমি অশিক্ষিত বলে এসব বলার অধিকার কি আমার নাই? কিংবা আমার বাসার যে গৃহকর্মি, বা ইটখোলার সেই মেয়েটা যে উদয়াস্ত জীবনের পরিশ্রম করে তাকে এখন কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো পড়ে নারীবাদ বুঝতে হবে?

কারা নারীবাদী আর কারা নারীবাদী নয় এই সার্টিফিকেট সুশীলরা না দেওয়া পর্যন্ত তার মানে আমি কোনো জাতের না? আমি তো জানতাম অশিক্ষিতরা, অল্পবিদ্যাশ্রীরা “আমি সব জানি, তোমার চেয়ে বেশি জানি” টাইপরা গর্বে ফুলে-ফেঁপে থাকে। আর শিক্ষিতরা থাকে নুয়ে-বিনয়ে; তারা নিজের শিক্ষা নিয়ে বড়াই করে না, অন্যের শিক্ষাও মাপতে যায় না। আর শিক্ষার সাথে কে, কোন অধিকার আদায়ের আন্দোলন করবে সে সিদ্ধান্তের ধারে কাছে দিয়েও যায় না। তাহলে কি শিক্ষা/অশিক্ষার সংজ্ঞা বদলে গেছে পাঞ্জেরী? কোনো অধিকারের আন্দোলনে শিক্ষিত না হলে অংশগ্রহণ করা যাবে না!

মুক্তিযুদ্ধে তো শিক্ষিতের চেয়ে অশিক্ষিতরাই বেশি ছিল। আমরা কি তাহলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ব করতে পারবো স্যার? আফটার অল, আমার অশিক্ষিত বাপ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল অধিকারের জন্যই। আর সেই অশিক্ষিত বাপের অশিক্ষিত সন্তান সেই আমিই করছি নারীবাদী আন্দোলন। শিক্ষিতের এ আন্দোলনে আমার কি কোনই জায়গা নেই? আমি কি এতোই অচ্ছুৎ?

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.