পণ দিয়ে কি আসলেই সুখ কেনা হয় মেয়ের?

অচিন্ত্য সাহা: গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর, খাঁ খাঁ রোদে তেষ্টানোই দায়, তার উপর মরার কাকগুলোর এই কা কা শব্দ মনটাকে আরো উতলা করছিলো। নীলুটার কোনো বিপদ হল নাতো? ছোট মানুষ, বাবা-মা ছাড়া কখনও থাকেনি। কিন্তু মেয়ে হয়ে জন্মেছে, স্বামীর ঘরে জীবন কাটানোটাই তো নিয়তি।

আজ পনেরো দিন হলো নীলুর বিয়ের। দ্বিরাগমনের পর এখন পর্যন্ত নীলুর কোনো চিঠিপত্র আসেনি। না জানি কী করছে মেয়েটা! চিন্তায় চিন্তায় অস্থির লাগে মাঝে মাঝে। দুই দিন ধরে আবার মাধবটার জ্বর, নীলুর মার প্রেসারটাও বেড়েছে। দুই দিন পর পর নীলুর মার শরীর বিগড়াচ্ছে। আজকাল কবিরাজী ওষুধে কি আর কাজ হয়? শহরে গিয়ে ভালো এলোপ্যাথিক ডাক্তার দেখানো উচিত। কিন্তু সে উপায়ই বা কীভাবে হবে, হাত যে একেবারে শূন্য।

নীলুর বিয়েতে অনেক ধারদেনা হয়েছে। ময়রার দোকানে মিষ্টির টাকা, শ্যাকরার দোকানে গয়নার টাকা, খগেনের মাছের টাকা বাকি। এর মধ্যে গরুগুলোর খড়ও প্রায় শেষের দিকে। দু:শ্চিন্তায় রাতের ঘুম উবে যায়। চারজন মানুষের খাবারের যোগান দেওয়া চাট্টিখানি কথা না। তিন মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে চাষের জমি সব শেষ। পণের টাকা জোগাড় করতে নীলুর বিয়েতে শেষ জমিটুকুও বিক্রি করতে হলো।

পণের টাকা হিসাবে এই বাজারে দুই লাখ টাকা যদিও বেশী না, কিন্তু দুই মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর তাই যেন এখন পাহাড়সম। কিন্তু মোটা বেতনের চাকুরী, বংশ গৌরব ভালো এমন ছেলে পাওয়াও তো চাট্টিখানি কথা না। যদিও পণের টাকা আর বিয়ের আনুষঙ্গিক কিনতে গিয়ে বরযাত্রীদের খাবারের আয়োজন খুব একটা ভালো করা সম্ভব হয়নি।

বরের এক মামা তো দুই কথা বেশ শোনালেন, ‘আরে মশাই মোটে তো মাত্র একশ বিশ জন বরযাত্রী, তাতেই এই অবস্থা! আমাদের বাড়ীর মেয়ের বিয়েতে আমরা হাজারের নিচে লোক খাওয়াই না’। নীলুর বরের সামনে লজ্জায় আমার মাথা নিচু হয়ে গিয়েছিলো। হালের একটা গরু বিক্রি করলে হয়তো খাসির মাংসের আয়োজনটুকু করা যেত। কিন্তু সাহস হয়নি। গরুগুলোই তো এখন শেষ সম্বল। কিন্তু সবকিছুর পরও ভালো একটা বর জুটলো নীলুর কপালে, তাতেই শান্তি। ভালো না হলে কি আর এই বাজারে কেউ দুই লাখ টাকা পণে বিয়ে করতে রাজী হয়? এখন নীলুটা আমার সুখী হলেই হয়।

সময় বদেলছে, কিন্তু পণ প্রথার চিত্রটা বোধহয় খুব একটা এখনও বদলায়নি। আগে রেডিও, সাইকেল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল, এখন ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে গাড়ি, বাড়ি, এপার্টমেন্ট পর্যন্ত যোগ হয়েছে। সমাজের হিসাবে ভালো একটা পাত্রের চাহিদা পূরণ করতে এখনও নিম্নবিত্ত অনেক বাবাকেই ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়।

তবু মেয়ে সুখী হোক। কিন্তু আদতে কি মেয়ে সুখী হয়? যথেষ্ট অবস্থাসম্পন্ন হওয়ার পরও হাত পেতে পণের টাকা নিতে যাদের এতোটুকু লজ্জা হয় না, কনের বাবা নিম্নবিত্ত জেনেও যাদের লম্বা চৌরা লিস্টের এতোটুকু হেরফের হয় না, সেসব আত্মমর্যাদাবিহীন লোভী মানুষ কি আসলেই কাউকে সুখী করতে পারে?? 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.