তর্জন-গর্জনেই যদি দম ফুরায়…..

শান্তা মারিয়া: একটু ব্যক্তিগত আলাপ দিয়ে শুরু করি।  আমি যখন কৈশোরে তখন আমাদের বাড়িতে বেশ ক’জন বাম ঘরানার বিপ্লবী আসতেন। তারা শিল্প-সাহিত্য সবকিছু নিয়ে এমন হই-চই করতেন যে মনে হতো আগামীকালই বিপ্লব করে ফেলবেন। সবকিছু ভেঙে চুরে তারা অতি দ্রুত বিপ্লব করার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। আমার বাবা প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ তাদের কথা শুনে হাসতেন।

বলতেন ‘তোমাদের এখনও চোখ ফোটেনি।’ তারপর বলতেন মার্কস, অ্যাঙ্গেলসের লেখাগুলো পড়তে। আরও বলতেন ‘অতিবিপ্লবী বা হঠকারী বিপ্লবী আসলে প্রতিবিপ্লবী।’

শান্তা মারিয়া

আমি তখন মনে করতাম, বাবা হয়তো ওদের মতো সাহসী নয়। কিন্তু পরে যখন তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেছি, তখন অবাক হয়ে দেখেছি, ওরা এমনকি কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর মতো আকারে ছোট বইটিও পড়েনি। আরও পরে ধীরে ধীরে সেই অতিবিপ্লবীদের কয়েকজনকে দেখেছি জামায়াতে যোগ দিতে। কাউকে কাউকে পীরের দরগার দিকেও ধাবমান দেখেছি। অনেককে দেখেছি, গার্মেন্টস কারখানার মালিক হয়ে নারী শ্রমিকদের উপর সবরকম শোষণ নির্যাতন চালাতে।

আজকাল এমন অনেক নারীবাদী তর্জন-গর্জন শুনি। অনেকটা এরকম: ‘লেসবিয়ান’ হলেই নারীর মুক্তি। বিয়ে না করলেই নারীর মুক্তি। সংসার থেকে বেরিয়ে এলেই নারীর মুক্তি। কেউ আবার নারীবাদী হতে গিয়ে চুল ছেঁটে ফেলছেন। কেউ গালাগালির বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। কেউ আবার যৌনতাকে বৈষয়িক উন্নতির স্বার্থে ব্যবহার করে ভাবছেন। এদের অনেকেই নিজের প্রচারের জন্য অন্য নারীকে আঘাত করতে, ‘ল্যাং মারতে’ , বা অপমান করতে দ্বিধা করছেন না।

কাউকে কাউকে দেখছি একটি বা দুটি বই প্রকাশ করেই নিজেকে এমন বড় লেখক ভাবছেন যে, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, নীলিমা ইব্রাহীম, রিজিয়া রহমান, সেলিনা হোসেন, রাবেয়া খাতুন, নাসরীন জাহান, ঝর্ণা রহমানের মতো পূর্বসুরী লেখকদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাচ্ছেন।

আমাকে তাদের অনেকেই বলেছেন, ‘বিশ বছর ধরে সাংবাদিকতা কিংবা লেখালেখি করে আপনারা কী …(একটি অশ্লীল শব্দ) করেছেন?’ আমি তাদের কথার জবাব দেবার প্রয়োজন বোধ করি না। জবাব নেই এই কারণে নয়। প্রয়োজন বোধ করি না কারণ আমারও আজকাল বাবার মতো মনে হয়, ‘এদের সঙ্গে কী তর্ক করবো, ওদের তো চোখই ফোটেনি’।

নারীবাদ তর্জন-গর্জন দিয়ে বা অতি হঠকারী কর্মকাণ্ড দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সমাজবিকাশের কোন স্তরে নারী ক্ষমতা হারিয়েছে, কেন নারী শোষণ ও বঞ্চনার শিকার, সেটা বুঝতে হবে আগে। পাঠের কোনো বিকল্প নেই। ফ্রেডেরিক অ্যাঙ্গেলস এর ‘দ্য অরিজিন অফ দ্য ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রোপারটি অ্যান্ড দ্য স্টেট’ না পড়লে সমাজ বিকাশের ধারা, সমাজে নারীর অবস্থান বুঝতে পারা সম্ভব নয়।

কার্ল মার্কস এর ‘ডাস ক্যাপিটাল’ দেখে যদি ভয় পান, তাহলে অন্তত ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’ পড়ুন। জানতে হবে ক্লারা জেৎকিন, রোজা লুক্সেমবার্গ এর মতো নারীদের কথা। পড়তে হবে সিমোন বোভ্যেয়ারের ‘সেকেন্ড সেক্স’। পড়তে হবে বেটি ফ্রিডানের ‘দ্য ফেমিনিস্ট মিস্টিক’। রোকেয়া রচনাবলীও পড়তে হবে। জানতে হবে সরলা ঘোষাল,  প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, মনোরমা মাসীমা, ইলা মিত্র, নাদেরা বেগমদের কথা।

আরও আগের গার্গী, মৈত্রেয়ী, চন্দ্রাবতী, সোনাভানদের কাহিনীও জানা দরকার। দরকার রাজিয়া সুলতান, চাঁদ সুলতান, ঝাঁসীর রাণীদের ইতিহাস জানা।  

নারীমুক্তির পথ একদিনে তৈরি হয়নি। ‘দিনের পথিক মনে রেখ, আমি চলেছিলেম রাতে, সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে হাতে’। গভীর অন্ধকারে যে অগ্রপথিকরা পথ চলেছেন, তাদের যদি নাই চেনেন তাহলে আজ দিনের আলোয় আপনার পথ কোন্ লক্ষ্যে নিয়ে যাবে আপনাকে? মরীচিকায় পথ হারিয়ে কেবলি যে পুরুষতন্ত্রের মরুভূমিতে ঘুরপাক খাবেন সে খেয়াল আছে?

নারীর মুক্তি কোথায়? সমগ্র মানবজাতির মুক্তির বাইরে তো নয়। সমগ্র মানবজাতির মুক্তির ভিতরেই নারী, পুরুষ, ট্রান্সজেন্ডার সকলের মুক্তিই রয়েছে। চিন্তার স্বাধীনতা, শিক্ষা গ্রহণের অধিকার, পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক মুক্তি, সবকিছুই যে নারীর সামগ্রিক মুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

নারীমুক্তি বা সামগ্রিকভাবে বললে মানবমুক্তি একদিনে আসবেও না। মানুষের চিন্তার ভিতরে সামন্ততন্ত্র, পুঁজিতন্ত্র যতদিন দাপটের সাথে থাকবে, ততোদিন মানবতার মুক্তি ঘটবে না। এমনকি অর্থনৈতিক বেইজ পরিবর্তনেরও কয়েক প্রজন্ম পরে হয়তো সেটা সম্ভব হবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে সোভিয়েত আমলে রুশ নারী নিনা বালিয়াসনিকভাকে দেখেছিলাম। চীনের নারী চঙুশাওলিনকে দেখেছি। দেখেছি কিউবার এক নারীকে। নেদারল্যান্ডসের ক্যারেনকেও দেখেছিলাম। তাদেরকে পুরোপুরি ‘মুক্ত মানুষ’ বলে আমার কাছে মনে হয়েছিল। তাদের তিনজন সমাজতান্ত্রিক দেশ এবং আরেকজন জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বাসিন্দা। হ্যাঁ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের মুক্তির অবশ্যই অন্যতম বড় নিয়ামক।

সামন্ততন্ত্র, তার সহায়ক পুরুষতন্ত্র এবং তাদের হাতিয়ারগুলো নারীকে সিন্দুকে পুরে রাখতে চায়। অন্যদিকে পুঁজিতন্ত্র ও তার সহায়ক পুরুষতন্ত্র ও তাদের শক্তিগুলো নারীকে পণ্যে পরিণত করে। এর কোনোটিই নারীর সহায়ক নয়।

বোরখা বা বিকিনির মধ্যে নারীর মুক্তি নেই, নেই নিরাপত্তা। নারী বিদ্বেষী ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছিলেন, ‘আমরা সাহেবদিগের ন্যায় মা-বোনকে হাটে-বাজারে নাচাইয়া বেড়াই না, তাহাদের ঘরের কোণে পূজা করি’।

বস্তুত, কোনটারই দরকার নেই। পূজা করার বা নাচাইয়া বেড়াবার অধিকার যতোদিন পুরুষের হাতে, পুঁজির মালিকের হাতে, সামন্তপ্রভুর হাতে, ততোদিন নারীর মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। এমনকি এই মালিক যদি একজন বায়োলজিক্যালি নারীও হোন, তাতেও লাভ নেই। কারণ তার শ্রেণিচরিত্র ও শোষক রূপের কোনো পরিবর্তন তাতে হয় না।

প্লেবয় পত্রিকার সম্পাদক নারী হলেও লাভ নেই, পুরুষতান্ত্রিক কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠির প্রধান নারী হলেও না, ব্রোথেলের সর্দারনি নারী হলেও না। সর্বত্রই নারী সমভাবেই নির্যাতনের শিকার হবে।

প্রয়োজন সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন। সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার সমাজে অভিজিৎ বা তনু কেউই কিন্তু নিরাপদ নয়।  

নারী যখন নিজের শরীরের মালিক, নিজের জীবনের সকল সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মালিক, নিজের উপার্জিত অর্থের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখার মালিক, নিজের ইচ্ছায় প্রজনন সঙ্গী বেছে নেওয়ার মালিক, নিজের সুবিধাজনক পোশাক পরার বা খোলার মালিক, নিজের যৌনতার মালিক এবং নিজের স্বাধীন চিন্তার মালিক, তখনই সে স্বাধীন, মুক্ত।

চিৎকার, গলাবাজি, অশ্রদ্ধা, অশ্লীল বাক্য, চুলকাটা, চুল রাখা, লিপস্টিক পরা বা না পরা কোনোটার উপরেই নারীর মুক্তি নির্ভরশীল নয়। নারীর মুক্তির জন্য এগোতে হবে লম্বা দৌড়ের প্রস্তুতি নিয়ে। চিৎকারেই যদি দম ফুরিয়ে যায় তাহলে দীর্ঘদিন টিকবেন কিভাবে?

আর অন্য নারীকে ল্যাং মেরে, অন্য নারীকে বিপদগ্রস্ত করে নিজে  এগোনোটা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারই ছদ্মবেশী রূপ। অন্যকে শোষণের মানসিকতা নিয়েও এগোনো যাবে না। মানবিক হতে হবে। সমাজবিরোধী নয়, সমাজ প্রগতির মন নিয়ে লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। আজ এতোটুকুই বললাম। আগামিতে আরও কিছু বলবো।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.