এবার নিজেকে একটু ভালবাসো তো দেখি মেয়ে – ১

শাশ্বতী বিপ্লব: বছর ঘুরে আবার এসেছে পলাশ ফোটার মাস। ভালোবাসার গন্ধমাখা ফেব্রুয়ারি। বইমেলা, পহেলা ফাল্গুন, অমর একুশে। বাতাসে বসন্তের আগমনী গান। মনটা এমনিতেই উচাটন হবে এই মাসে। তার উপর আবার যোগ হয়েছে ভালোবাসা দিবস। কর্পোরেট ভালোবাসার জয়জয়কার হলেও সেটাও ভালোবাসাই। আগে ফেব্রুয়ারী সাজতো বাসন্তী আর সাদাকালো রঙে। এখন সে লাল রঙেও সাজে। ভালোবাসার লাল রঙ।

শাশ্বতী বিপ্লব

আজ ভালোবাসা দিবসের রঙ ছড়িয়ে পড়বে বাংলা একাডেমী থেকে শাহবাগ, শাহবাগ থেকে ধানমন্ডি, নগর ছাড়িয়ে গ্রামে,পাহাড়ে, মেঠো পথে। অনলাইন থেকে অফলাইনে সব জায়গায় ছড়িয়ে যাবে রঙেরা। ভেলেন্টাইনের ইতিহাস যাই হোক, সবাই প্রেমেই থিতু হতে চাইবে এই দিনে। ভালোবাসাকে রাঙাতে চাইবে একটি দিনের উৎসবে। স্বপ্নের ফানুসেরা ড়বে কপোত কপোতির আকাশ জুড়ে।

কিন্তু এরই ফাঁকফোকর গলে আমার মনের কোণে উঁকি দিয়ে যাবে বিগত সময় জুড়ে ভালোবাসার অভাবে, ভালোবাসার অবহেলায় মরে যাওয়া, নিজেকে মেরে ফেলা নারীদের মুখ। আক্তার জাহান জলি থেকে শুরু করে জ্যাকুলিন মিথিলা পর্যন্ত। যারা ভালোবাসার অভাবে আত্মহত্যা করেছে, শুধু নিজেকে ভালোবাসেনি মোটেও।

এমনি করে প্রতিদিন মরে গিয়ে বেঁচে যায় বা জীবন্মৃতের মতো বেঁচে থাকে শত শত জলি, মিথিলারা। একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় প্রতিদিন। আমরা তাদের খোঁজ রাখি না।  

সময়ের সাথে যতই বদলে যাক ভালোবাসার পোশাকী রঙ ঢঙ, মোটেও বদলায়নি ভালোবাসার সম্পর্কের অসমতা, অসাড়তা। একটু খেয়াল করে দেখলেই টের পাওয়া যায় মেনে নেয়ার, মানিয়ে নেয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা। ভালোবাসার নামে চাপিয়ে দেয়া ভালোবাসাহীন সম্পর্কের বোঝা।

দুটি মানুষের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সাথে সাথে ডানা কাটা পড়ে মেয়েটির। সে কী পরবে, কীভাবে চলবে, কার সাথে মিশবে, কার সাথে মিশবে না, সেগুলো ঠিক করে দিতে থাকে ছেলেটি। ধীরে ধীরে সম্পর্কের বয়স যত বাড়তে থাকে, নিয়ন্ত্রনের মাত্রাও তত বাড়তে থাকে ভালোবাসার মোড়কে। ভালোবাসে বলেইনা এতো বাঁধানিষেধ! নইলে আর এতো দায় কীসের? মেয়েটিও সেটাকে ভালোবাসা বলেই মেনে নেয়। ছেলেটির পরিবারের জন্য ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে।

অধিকাংশ প্রেমিকই বেশিদিন বন্ধু থাকতে পারে না। কেমন করে যেন ধীরে ধীরে বন্ধু থেকে কর্তা বা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তার পরিবার থেকে, সমাজ থেকে প্রেমিক বা স্বামীর যে ভূমিকা সে দেখেছে, শিখেছে, তার বাইরে যেতে পারে না বা যেতে চায় না। আধুনিকতার, উদারতার মুখোশটা খুলে পড়ে ধীরে ধীরে। যে মেয়েটির নাচ দেখে সে প্রেমে পড়েছে, গান শুনে মুগ্ধ হয়েছে, অভিনয় দেখে বাকহারা হয়েছে, সেগুলো বন্ধ করার প্রসঙ্গ ওঠে। তাদের বাড়ীর বউয়েরা এসব করে না, করতে পারবে না। কাজেই বন্ধ করো সব।

বেশিরভাগ মেয়েই মেনে নেয়। মৃত্যু হয় একজন শিল্পীর, একজন কবির, একজন অভিনেত্রীর, একজন চিত্রকরের, একজন চিকিৎসকের, একজন খেলোয়াড়ের, এমনি শত শত সম্ভাবনাময় নক্ষত্রের। মেয়েটা ভাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে। ভালোবাসার ঘোরে দেখতেই পায় না শেকলটা। বিয়ে নিয়ে, সংসারের নিয়ে স্বপ্ন বোনায় মগ্ন থাকে।

কিন্তু ঠিক হয়না কিছুই। সে আরো পড়তে চাইলে বাঁধা পায়, চাকরী করতে চাইলে বাঁধা পায়, শিল্পচর্চা করতে চাইলে বাঁধা পায়। ধীরে ধীরে বয়স বাড়ে, স্বপ্নরা হারিয়ে যায়। সাথে বাড়ে মেনে নেয়ার কষ্ট, নিজের স্বপ্নটাকে ছুঁতে না পারার গ্লানি।

কিন্তু যদি একটু নিজেকে, নিজের স্বপ্নটাকে ভালোবাসতে পারতো শুরু থেকেই, যেটা মনে নেয় না সেটা মেনে না নিতো তবে জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো। আত্মহত্যা বা জীবন্মৃতের মতো বেঁচে থাকতে হতো না।

তাই আজকের তন্বী তরুণী তোমাকে বলছি, ভালোবাসতে গিয়ে নিজেকে ভুলে যেও না। ভালোবাসার মানুষটা যতই বলুক, যা মানতে মন সায় দেয় না, যাতে তোমার অন্তরের উষ্ণতা নেই, সেটা জোর করে নিজের উপর চাপিয়ে দিও না।

ভালোবাসার মানুষটাকে উজার করে ভালোবাসো ক্ষতি নেই, কিন্তু পাশাপাশি নিজেকেও একটু ভালোবেসো। অন্ধ ভালোবাসা তোমাকে বন্দী করে, যার থেকে তোমার মুক্তি মেলে না আর। তুমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাও, আর তিলে তিলে মরে যায় তোমার স্বপ্নেরা।

ভালোবেসো নিজের স্বপ্নটাকে। তুমি নিজেই নিজেকে ভুলে গেলে অন্য কারো দায় নেই তোমাকে মনে রাখার। কেউ মনে রাখে না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.