জয়ারা কেন জ্যাকুলিন হয়ে যায়!

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী: জ্যাকুলিন মিথিলা নামের এক মডেলের আত্মহত্যার খবরে সামাজিক গণমাধ্যমগুলো সরগরম। কে এই জ্যাকুলিন মিথিলা?

জ্যাকুলিন মিথিলা, যিনি নাকি বাংলাদেশের সানি লিয়ন হতে চেয়েছিলো। ঢাকাই ছবির ” আইটেম গার্ল ” এই মডেল যে কোনো মূল্যে নিজেকে লাইম লাইটে আনার জন্য মরিয়া ছিলো। ফেইসবুক লাইভে তার খোলামেলা শরীরী বিভঙ্গ দেখার জন্য লাখো লাখো ফলোয়ারের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল।

অনলাইন ঘেঁটেঘুটে মোটামুটি এই তথ্যই পাওয়া যায় জ্যাকুলিন সম্পর্কে। তার ” পর্নস্টার মার্কা ” ছবিগুলো দেখতে দেখতে ইচ্ছে হয় বাইরের পর্দাটা সরিয়ে আরেকটু গভীর কিছু জানার। কেননা এ পর্যন্ত যা যা জেনেছি এগুলো একজন মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয় হতে পারে না।

পোশাকি নামের আড়ালে তার নিজস্ব একটি নাম ছিল। বাবা- মায়ের একমাত্র সন্তান জয়া শীল। কিশোর বয়সে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে আলাপ হয় মায়ের দূর সম্পর্কের আত্মীয় উৎপল রায়ের সাথে। কিছুদিন পরে মাকে জানিয়েছিল উৎপলের সাথে তার প্রেমের সম্পর্কের কথা।

নিতান্তই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই কৈশোর পেরোনো মেয়েটির রঙিন শোবিজ জগতের মোহে পড়ার কারণ কী অর্থনৈতিক মুক্তি নাকি জনপ্রিয়তার হাতছানি? কারণ যাই হোক মিডিয়াতে কাজ করতে চাওয়া দোষের তো কিছু না । অনেকেই তো সসম্মানে কাজ করছেন এই পেশায়।

ঢাকার রামপুরায় তিন রুমের একটি বাড়িতে একটি রুম সাবলেট নিয়ে মায়ের সাথে থাকতো জয়া। এখানে সে  জ্যাকুলিন মিথিলার জীবন- যাপন করতো। মডেলিং, ঢাকাই ছবিতে আইটেম নাচ নেচেও হয়তো কাংখিত ” লাইম লাইটে ” আসতে পারেনি সে। টাকার অভাব বড় ভয়ংকর, বড় নিষ্ঠুর। সেই অভাব থেকে বাঁচতেই বোধ করি সে শরীরকে পুঁজি করে সস্তা জনপ্রিয়তা দিয়ে অর্থ উপার্জনের শর্টকাট রাস্তায় নেমে পড়ে বা নামতে বাধ্য হয়।

মধ্যরাতে যেসব লোলুপ পুরুষ নগ্ন নারীদেহের খোঁজে লালায়িত হয়ে থাকে তাদেরই কোটি কোটি আঙুল সচল হয়ে ওঠে, মোবাইল কিংবা ল্যাপটপের বোতাম চাপ দিয়ে শুরু হয় পর্নসাইটে অবাধ বিচরণ। এদের মধ্যে থেকেই প্রায় দুই লক্ষ ” ফলোয়ার ” বা অনুসারী জুটে যায় নিয়মিত অনলাইনে জ্যাকুলিন মিথিলার দেহের আনাচ কানাচের ইঞ্চি মাপার জন্য। তারাই আবার এখন জয়া শীলের মৃতদেহের ধর্ষক। নিজেদের বিকৃতি নিয়ে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই অথচ সব মেয়েই তাদের কাছে গণিকা !

নাহলে কেউ একজন মৃত মানুষ সম্পর্কে লিখতে পারে – ” এখনো মরে নাই, একটু আগে লাইভে দেখলাম, আমাদের বিনোদন বাঁইচা আছে ?? “

আরেকজন মন্তব্য – ” পোস্টমর্টেমের সময় ডাক্তারের না জানি কী হাল হয়! “

এভাবে নিজের উন্মুক্ত বক্ষ উপস্থাপন করে কত টাকা আয় করতে পেরেছিলো জ্যাকুলিন তা জানিনা। তবে একটি পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি, কিছুদিন আগে জয়ার ভালোবাসার মানুষ উৎপলের মায়ের অপারেশনের জন্য জয়া পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলো। যদিও উৎপলের স্কুল শিক্ষক মা ও পরিবার সামান্য নাপিতের মেয়ে নষ্ট ভ্রষ্ট জয়াকে মেনে নেয়নি কখনো।

এই জায়গাটায় এসে চোখ আটকে যায় আমার। সিনেমাতে প্রায়ই দেখা যেতো, নায়ক মাস্তান হলেও মহৎ, অসদুপায়ে টাকা আয় করলেও বস্তিতে গিয়ে গরিবদুঃখীদের মাঝে সেই টাকা বিলিয়ে দেয়। তখন আর তার অসততা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তুমুল করতালিতে দর্শক সেই মহানায়ককে গ্রহণ করে নেয়।

জয়ার আত্মহত্যার খবর জ্যাকুলিন মিথিলা নামের অখ্যাত মডেলকে লাইম লাইটে এনে দিলো ঠিকই। খবরের পাতায় পাতায় তার শরীর বিকোনোর কাহিনী। কোথাও নেই জয়া শীল নামের অতি সাধারণ মেয়ের কথা যে আর দশটা বোকা মেয়ের মতো ভালোবেসে সর্বস্ব হারিয়েছিলো। সিনেমার মাস্তান নায়কের মতো তার ভাগ্যে তুমুল করতালি জোটেনা, সম্মান জোটেনা – বেঁচে থেকেও না, মরে গিয়েও না। বরং মধ্যরাতের অন্ধকারে ইন্টারনেটে বসে কল্পনায় যারা তার শরীর হাতড়ে মজা লুটেছে, তারাই তার মতো নষ্ট, পাপী মেয়ের চরিত্রের শ্রাদ্ধ করছে তিনবেলা।

জ্যাকুলিন মিথিলার “সুইসাইড নোট” টাতেও চোখ আটকে যায় আমার। আবারো মনে হয়,  অপরিণত বয়সের বোকা প্রেমে আর ছেলেমানুষি অভিমানে ভরা এই সুইসাইড নোট

দেহের পসরা সাজানো কোনো জ্যাকুলিন মিথিলার লেখা হতে পারে না। আবেগপূর্ণ এই চিঠি লিখেছে ‘জয়া’ নামের এক সাধারণ মেয়ে। উৎপলের বৌদি রূপা তাকে টাকার বিনিময়ে উৎপলকে ছেড়ে দিতে বলাতে তীব্র অপমানিত বোধ করেছিলো সে। প্রশ্ন রেখে গেছে সে – ” আমি কী রাস্তার মেয়ে? ” উৎপল তাকে এড়িয়ে চলছিলো, দেখা করতে চাইলেও দেখা করেনি। এসব সে মেনে নিতে পারেনি। তাই সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।

আত্মহত্যার আগে লেখা চিরকুট উৎপলের জন্য এক বুক ভালোবাসা আর অভিমানে ঠাসা। শেষে লেখা আছে – ” তুমি ভালো থেকো উৎপল  – I love you ” – সাত বছর ভালোবেসে বিয়ে হয়েছিলো জয়া আর উৎপলের।  উৎপল সব জেনেও তাকে বিয়ে করেছে, মায়ের চিকিৎসার টাকা নিয়েছে – একটা নাপিতের মেয়ে বা পর্ন তারকাকে পরিবারে ঠাঁই দেয়া যায়না অথচ তার পর্ন ব্যাবসার টাকায় চিকিৎসা করাতে লজ্জা করলো না তাইনা?

মনে পড়ছে একসময়কার শক্তিমান অভিনেতা ডলি আনোয়ারের কথা। আরো মনে পড়ছে অভিনেতা  মিতা নূর আর মডেল সাবিরার কথা। প্রত্যেকেই প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
ভারতের দক্ষিণী ছবির পর্নতারকা সিল্ক স্মিতা তীব্র অর্থকষ্টে আত্মহত্যা করেছিলেন।

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী

খুব জানতে ইচ্ছে করছে, মিডিয়াতে কাজ করতে এসে কেনই বা জয়ারা জ্যাকুলিন হয়ে যাচ্ছে?

মানসিকভাবে প্রচণ্ড দুর্বল আর ভারসাম্যহীন না হলে কেউ আত্মহত্যা করতে পারেনা। সেটাকে জয় করা খুব জরুরি। হতাশাকে দমন করতে শিখতে হবে। আত্মহত্যা কোনো সমাধান বা মুক্তির পথ হতে পারে না। মেয়েদেরকে বলছি, চলো এবার একটু বুদ্ধিমান হই। ভালোবেসে মরে যাওয়ার কিছু নেই। এতে কারো কিছু এসে যায় না। কারো কোনো বোধোদয় হয় না।
বরং আমরা জীবনের জয়গান গাইতে শিখি, নিজেকে ভালোবাসতে, সম্মান করতে শিখি। আমার জীবনের মূল্য যদি আমার কাছেই না থাকে তাহলে অন্যে কী মূল্য দেবে?  জীবন এক চলমান সংগ্রাম। তবুও জীবন সুন্দর।

” নিত্য পূর্ণ ধরা জীবনে কিরণে। “

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.