আত্মবিশ্বাসই আত্মহত্যার একমাত্র প্রতিষেধ!

ফারজানা আকসা জহুরা: প্রায় টিভিতে একদল মানুষকে দেখা যায় আত্মবিশ্বাসী হতে, তাও তেল-সাবান-স্যাম্পু আর ক্রিম মেখে! তাদের এই সমস্ত বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই ভাবেন, আত্মবিশ্বাস বুঝি থাকে সৌন্দর্যে! তাই তো আরেক দল মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন নিজের সৌন্দর্য বিকাশে। খুব পরিচিত মানুষের চেহারাগুলি শুধু বদলায় না, বদলে যায় তাদের চিন্তা-চেতনাও।

ফারজানা আকসা জহুরা

না, সেই চিন্তায় আমি কোনো আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাই না, যা পাই তা হলো সৌন্দর্য কথন। কখনও কখনও আমিও তাদের এই সৌন্দর্য কথনে নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলি, আর ভাবি সৌন্দর্য মানেই বুঝি আত্মবিশ্বাস।  আচ্ছা, আত্মবিশ্বাস যদি সৌন্দর্যে থাকে, তাহলে এতো এতো সুন্দরী রমণী আত্মহত্যা করে কেন?

বেশ কিছু সুন্দরী রমণীর আত্মহত্যার কারণ হলো তার প্রিয় মানুষটির কাছ থেকে ভালোবাসা না পাওয়া। আত্মহত্যাকারিণী ধরেই নেন যে সে যেহেতু রূপবতী তাই সে সকলের  ভালোবাসার ও মনোযোগ সবই পাবেন। তিনি ভাবেন, ভালোবাসার যোগ্যতা যে সৌন্দর্য্য, তা তার আছে! তাই সবাই তাকে তার মতোন করেই ভালোবাসা দিবেন।

আচ্ছা ভালোবাসার জন্য বুঝি সুন্দরী হতে হয়?
কেন? নাটক সিনেমা দেখায় না, নায়িকার রুপে নায়ক পাগল, সেই রুপের কারণে তাদের মধ্যে প্রবল প্রেম-ভালোবাসার তৈরি হয়! তাই তো রূপবতীদের নিয়ে সিনেমা হয়, “কমলা সুন্দরী “, “খায়রুন সুন্দরী”, “এক হাসিনা থি ” ইত্যাদি। এই সব সিনেমার একই কাহিনী, ” নায়িকার সৌন্দর্যে নায়কসহ সবাই পাগল “। এই ধরনের সিনেমা দেখে বাস্তবের কমলা ও খায়রুন সুন্দরীরাও নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন ও ভক্ত তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

নাটক-সিনেমা ছাড়াও, তথ্য প্রযুক্তির যুগে ফেসবুক তাদের এই চাহিদা আরও ভালোভাবে পূরণ করছে। এতো এতো ফ্যান ফলোয়ার আর লাইক কমেন্টের ভিড়ে তারা ভালোবাসার সংজ্ঞা হারিয়ে, আত্মবিশ্বাসের খোঁজে আত্মহত্যা করে ফেলছে।

ছোটো থেকেই আমি কালো, সামাজিক ভাষায় অসুন্দরী, এই অসুন্দরীর জীবনে ছোটো থেকেই ভালোবাসার অভাব নাই , আর এর জন্য আমাকে তেল-সাবান-ক্রিম মাখতে হয়নি, না তথাকথিত স্মার্ট হতে হয়েছে। আমার আমিতেই আমি ভালোবাসা পেয়েছি, পেয়েছি আত্মবিশ্বাস। আমি তো কালো! তাতে কী? পরিবার আত্মীয়স্বজন আর আমার বোনেরা কখনও আমায় বলেনি, আমি দেখতে খারাপ বা অসুন্দর, প্রচণ্ড রাগী হওয়ার পরও সবাই আমাকেই বেশি আদর করতো। আমার সুন্দরী ফর্সা বোনেরাও আমার চোখ-চুল-নাক নকশার গুণগান গাইতো, ফুপু-খালা কেউ বাদ যায়নি প্রশংসা করতে, না সেটা শুধু চোখ নাক নকশার গুণগান নয়, আমার মেধার গুণগান। অথচ এই সবই আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা, কথায় আছে না,  যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা”। আমায় যে ভালোবাসবে তার কাছে আমার সবই ভালো লাগবে , এরজন্য বাড়তি রূপের দরকার নেই।

তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে প্রথম বুঝেছি আমি দেখতে খারাপ, আমার আশেপাশের বন্ধুরা আমাকে তাই বুঝিয়েছে , “আমি অসুন্দরী , তাই তো আমার কপালে প্রেমিকও জুটেনি ”! না, আমি এই সস্তা প্রেম নিয়ে বেশিদিন দুঃখ করিনি। ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এই জীবনে প্রেমিক নামক বস্তুটির কী দরকার, তাই বোঝার চেষ্টা করেছি। যেদিন বুঝেছি শরীরের বা সৌন্দর্য আড়ালে, কামনায় প্রেমিকের অবস্থান, তখন আর কীসের দুঃখ?

আমাদেরই ক্যাম্পাসের এক ছোটো বোন, “অল ফার্স্ট ক্লাস” পেয়েও অসুন্দরের কারণে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে যেদিন আত্মহত্যা করলো, সেদিন খুব কষ্ট লেগেছিল। মনে মনে বলেছিলাম আমারও তো অমন সময় এসেছিলো, আমি তো ফার্স্ট ক্লাসও পাইনি, তবুও তো মরিনি আমি! কটু কথায় যে এখনও চামড়া জ্বলে!

এইতো সেদিন এক লেখিকা বললেন, তিনি প্রায় ফেসবুকে কালো মেয়েদের কান্নাকাটি করতে দেখেন! শোনেন তাদের প্রেম বিয়ে না হওয়ার দুঃখ ! আচ্ছা, যে সমাজে কালো-খাটো-মোটা মেয়েরা বা মানুষেরা সামাজিকভাবে পদে পদে হেয় হয়, যে মানুষেরা পদে পদে হেয় হয়ে হয়ে জীবন সংগ্রাম শুধু চালিয়ে যাচ্ছে না, কিছু করার চেষ্টাও করছে, তাদেরকে আপনি আবার আপনার কটু কথায় হেয় করলেন, তাই নয় কি?

আমি বলবো, কোলো খাটো মোটা অসুন্দর মানুষদের কথা, আমি বলবো আমার কথা, আমি বলবো আমাদের সামাজিক বঞ্চনার কথা, আমি চাই না কেউ ভাবুক ভালোবাসা থাকে সৌন্দর্যে, আমি চাই না কেউ বলুক আত্মবিশ্বাস থাকে রূপে। আমি চাই না কেউ তার বৈশিষ্ট্য নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগুক।  আমি বলতে চাই, ভালোবাসা পেতে হলে অন্তর লাগে, রূপ নয়। আমি বোঝাতে চাই আত্মবিশ্বাসী হতে হবে গুণ দিয়ে, সৌন্দর্য দিয়ে নয়।

পুঁজিবাদী  এই সমাজ ব্যবস্থায় , সবাই যে চাকচিক্যের মোহে পড়ে আছে , সেই চাকচিক্যের বাইরে থাকে ভালোবাসা , ভালোবাসা পেতে হলে সবার আগে সেই রঙিন চশমা খুলে দেখতে হবে পৃথিবীকে , তবেই হতে পারবেন আত্মবিশ্বাসী । আর আত্মবিশ্বাসই জীবনের মূল চাবি কাঠি , আত্মবিশ্বাসই জীবন । আমার কাছে এক একটি জীবন এক একটি সংগ্রাম , বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাস।

শেয়ার করুন:
  • 103
  •  
  •  
  •  
  •  
    103
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.