আমরাই মিথিলার হন্তারক

শিউলি শবনম: মিথিলা আমার বাল্যবন্ধু। আমরা একসাথে গলাগলি করে, হাত ধরাধরি করে বেড়ে উঠেছি। কতো গ্রীষ্মের দুপুরে গাছের মগডালে উঠে সবচেয়ে পাকা আমটি পেড়ে নিচে থাকা অপর সঙ্গীদের ছুঁড়ে দিয়েছি। জ্বীন-ভূতের ভয় উপেক্ষা করে তেঁতুল গাছে উঠে কাঁচাপাকা তেঁতুল পেড়ে জিহ্বায় ঘা না হওয়া পর্যন্ত চেটেছি।
শিউলি শবনম

কতো জ্যোৎস্না রাত আমাদের কেটেছে হা-ডু-ডু আর দাঁড়িয়াবন্ধা খেলে। বৃষ্টিদিনে ঘরের কোণে লুকোচুরি। কবিতা শুনতে ভালোবাসতো মেয়েটি। যেকোনো ভ্রমণে আমার কণ্ঠে কবিতা শোনা তার চাই-ই। সেই মিথিলা তুমুল ভালবেসে বিয়ে করে সুদর্শন এক পুরুষকে। আর বিয়ের বছর কয়েক না পেরুতেই ফুটফুটে সন্তানকে রেখে আত্মহত্যা করে বন্ধুটি! (যদিও আত্মহত্যাটা চাউর করা হয়েছিল স্রেফ, সে মরেছিল সুদর্শন স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে মাথায় আঘাতের চিহ্ন থেকে রক্তক্ষরণের কথা লেখা ছিল।)

সে ঘটনার আড়াই বছর পর আজ যখন মডেল জ্যাকুলিন মিথিলার আত্মহননের খবর পড়ি, আমি প্রথমে বাকরুদ্ধ হয়ে যাই বন্ধুর শোকে। কতো বয়েস হবে এই উঠতি মডেলের! এখনও তার চিবুকে লেগে আছে কৈশোরের সারল্য। মিথিলার আত্মহনন আমাদের মধ্যে কারো কারো কাছে তীব্র রসালো আলাপের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, সে তো ফেসবুক লাইভে ওপেন আসতো, নিজেই দাবি করতো বাংলাদেশের সানি লিওন সে, ওর জন্য শোক করার কিছু নেই। কেউ কেউ উল্লাসও প্রকাশ করছেন!
এই মিথিলা কি আমাদের সমাজ ব্যবস্থার সৃষ্টি নয়? নারী মানেই এখনও আমাদের কাছে শরীর সর্বস্ব মানুষ! আমাদের মতো ঊনমানুষ, ঊন শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষা, অসচেতনতা কি এর জন্য দায়ী নয়? মিথিলা চলার পথে ধারণ করার মতো, অনুকরণ করার মতো কোনো আদর্শ কি পেয়েছিল?
মিথিলারও নিশ্চয় স্বপ্ন ছিল এই সুন্দর পৃথিবীতে নিজের মতো ডানা মেলে ওড়বার। আমার বন্ধু মিথিলার মতো তারও নিশ্চয় আনন্দঘন একটা শৈশব ছিল। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষাটা সে কি পেয়েছিল?
ওর পরিবার কি ওকে সেটা দিতে পেরেছিল? মানুষ হওয়ার, মানবিক হওয়ার শিক্ষাটা কি সে পেয়েছিল? অথবা ‘পুরুষ’ বন্ধু ছাড়া কোনো ‘মানুষ’ বন্ধু কি আদৌ তার জুটেছিল? ওর সেসব তথাকথিত বন্ধু? যাদের সাথে মিথিলা দীর্ঘ আড্ডা দিতো, লাইভে আসতো, যেসব শুভার্থী ওর সৌন্দর্য, ওর লাস্যময়, আবেদনময় ভঙ্গী দেখার জন্য দিনরাত উন্মুখ থাকতো, প্রাণপাত করতো তারাও কি ওর মৃত্যুর জন্য দায়ী নয়? মূলত তাকে সানি লিওন কি আমরাই করে তুলিনি? আমরাই কি ওকে শরীর দেখানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করিনি? আবার দিনশেষে আমরাই বলছি, ওর জন্য কেন শোক করা!
মূলত আমরাই মিথিলার হন্তারক।
আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে আমরা তো জগাখিচুড়ি এক সংস্কৃতির ভেতর ক্রমশ: ঢুকে পড়ছি। অন্ধ অনুকরণ করতে করতে ভালোমতো না পারছি নিজেরটা লালন করতে, আবার না পারছি না অন্যেরটা ধারণ করতে। মিথিলা কি এই জগাখিচুড়ি সংস্কৃতির ভেতরেই হারিয়ে যায়নি? 
শিউলি শবনম, সংবাদ কর্মী
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.