আমাদের জীবনের রিমোট কন্ট্রোল অন্যকে দেবো কেন?

বিপাশা দেবনাথ: সামারে একদিন সব কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরছিলাম। বাসস্টপে এসে এলার সঙ্গে দেখা। পাতলা গোলাপী রংয়ের পাতলা টি শার্ট আর শর্টস পরা তামাটে চুলের এলা ২৯ ডিগ্রীর গরমে বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে বাসের জন্যে অপেক্ষা করছিল।

সে পোলিশ মেয়ে, ভীষণ মিশুক, আমরা হোস্টেলে একই তলায় থাকি, ছয় মাসের জন্যে আমাদের এখানে এসেছে পড়তে। আমাকে দেখেই উৎফুল্ল গলায় বললো, বাহ, আজকে আমরা একসঙ্গে বাসায় ফিরবো। আমি অবাক হয়ে মেয়ের আনন্দ দেখে বললাম, আমি তো জানতামই না এটা কোনো খুশির কারণ হতে পারে, তাহলে প্রতিদিন তোমার সঙ্গে এভাবে বাসায় ফিরতাম!

বিপাশা দেবনাথ

এলা জোরে হেসে বললো, উই উইশ! আমরা দুইজন যে দুটো সিটে বসেছি তার উল্টোদিকে এক বয়স্ক ভদ্রলোক বয়েস ৭০ হবে, আর এক ছেলে ২৫/২৬ হবে বসেছে। ভদ্রলোক বাইরের দিকে তাকাতে ব্যস্ত আর ছেলে তার মোবাইলে! আশেপাশে সিটের মাঝে আরও কিছু পুরুষ দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় আছে, আরো কিছু মেয়েও আছে এলার মতন কাপড় পরা, কারোর কারোর অন্তর্বাস বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে। বাসে চারপাশে খেয়াল করলাম কেউই কারোর দিকে তাকাচ্ছে না, যার যার নিজের কাজে ব্যস্ত, কেউ গল্প করতে ব্যস্ত।

আমার ঈর্ষা হলো, অনেক অনেক ঈর্ষা। আমার মা গরম সহ্য করতে পারেন না, কিন্তু বাংলাদেশে শাড়ি পরে নিয়মিত রোগী দেখেন, রাস্তায় চলাফেরা করেন। শাড়ীর ফাঁক দিয়ে কোনো ভাবেই যেন শরীর না দেখা যায় তার জন্যে কতগুলো সেফটিফিন লাগান। তারপরেও বাসে অনাকাঙ্খিত স্পর্শ থেকে নিজেকে বাঁচাতে সচেতন থাকতে হয় প্রতি মুহুর্তে!

আমার আরো ঈর্ষা হলো, কোন বন্ধু তাদের সতর্ক করলো না, দোস্ত, ওড়না ঠিক কর, ওই ব্যাটার নজর ভালো না। আর এই ঈর্ষা শেষ হলো মন খারাপ করে, ইশ, বাংলাদেশের মেয়েগুলো যদি এমনভাবে নিশ্চিন্তে চলতে পারতো। আমি বলছি না ছোট কাপড় পরতে হবে, মেয়েগুলো যেমন মন চায় তেমন কাপড় পরে ঘুরবে, যেখানে খুশি সেখানে, কেউ তাকাবে না, বলবে না দ্যাখ, কেমন পিঠ খোলা ব্লাউজ পড়েছে, কেমন আক্কেল?

ল্যাবে ঢুকবার সময় মোবাইল,ঘড়ি,আর কানের দুল অথবা হাতের রিং যাই পরি না কেন লকারে অথবা অফিসের ব্যাগে রেখে তারপরেই ল্যাবে প্রবেশ, তাই সময়ের দিকে খেয়াল রাখবার জন্যে কম্পিউটার অথবা ল্যাবের মেশিনের সঙ্গে থাকা ঘড়িই ভরসা। এমন নয় যে ল্যাবে এসব পরে যাওয়া যাবে না, তবে যেহেতু লেজার ল্যাব তাই অন্য কলিগদের মতন কিছু অলিখিত নিয়ম মানতেই হতো! সেদিনও অন্যান্য দিনের মতোই কাজ করছিলাম ক্লাস শেষ করে। কখন যে সময় গড়িয়ে রাত ৯টা বেজে গেছে খেয়াল করিনি ততক্ষণ, যতক্ষণ না পেটের ক্ষুধা তার বেল বাজালো। ল্যাবে কেউ নেই আমি ছাড়া, তাই সব কাজ শেষ করে ল্যাব বন্ধ করে, বাইরে এসেই নভেম্বরের হিমকরা বৃষ্টি জানান দিল যে বেশ রাত হয় গেছে, কারণ অন্ধকার হয়ে গেছে সেই বিকেল ৩টার কিছু পরেই। ক্যাম্পাস থেকে বাসা বিশ মিনিট হাঁটার পথ আর সেই সময়টুকুতেই ক্লান্ত শরীরে বাংলাদেশকে হাজার বার মিস করা হয়ে যায় আমার।

আহারে রিকশা!! ক্যাম্পাসের ভেতরের রাস্তাগুলো বেশ ফাঁকা, গোটা ক্যাম্পাস পার হয়ে তবেই বাসা। হালকা বৃষ্টির মাঝে হুডি মাথায় দিয়ে মনে হলো, ঢাকায় হলে কি আমি এভাবে হাঁটতে পারতাম অথবা ল্যাবে নিশ্চিন্তে এতো রাত পর্যন্ত কাজ করতে পারতাম, তাও উইকেন্ডের আগের রাতে? এমন নয় যে এই প্রথমবার একা হাঁটছি, এর আগেও ক্যাম্পাস থেকে ক্রিসমাস এর ছুটি শুরুর আগে শেষ কর্মদিবসের অনুষ্ঠান শেষ করে হেঁটে ৫ কিলোমিটার দূরে থাকা হোস্টেলে ফিরেছি, কারণ বাস রাত ১২টার পর বন্ধ হয়ে যায়। আর এখন তো মাত্র এক কিলোমিটারের ব্যাপার।

কিন্তু কখনো ভয় বা শংকা এসে মাথায় জায়গা করে নেয়নি! এতসব ভাবতে গিয়ে আমি আবার ঈর্ষান্বিত হই। ঢাকা শহরে সাত বছর থেকেছি, কুমিল্লাতে গোটা কৈশোর কাটিয়েছি, কিন্তু আমি কখনো সন্ধ্যা ৭টার পর বাসায় ফিরলেই মা-বাবা অস্থির হয়ে যেতেন, একা হাঁটতে যাওয়া দূরের কথা। লাইব্রেরী থেকে অনেক রাত করে ফিরেছি শুনে বাবা অবাক হন, মা বারণ করেন না, তারা জানেন তাদের মেয়ে হাজার মাইল দূরে এমন দেশে আছে যেখানে নিরাপত্তা আছে।

এখানে অনেক রাতে ট্রামে চড়ছি, বাসে চড়ছি, কিংবা হোস্ট ফ্যামিলির সঙ্গে ক্রিসমাস কাটিয়ে শেষ ট্রেনে করে বাসায় ফিরেছি, কিংবা ৭০০ বছরের পুরনো ক্রিসমাস ক্যারোল শুনতে ভোর ৪টায় বাসা থেকে বেড়িয়েছি নিশ্চিন্তে। না এখানকার ছেলেরা, না এখানে থাকা আমাদের উপমহাদেশের ছেলেরা, কেউ বাজেভাবে তাকায়নি, টিজ করেনি, কোন অনিশ্চয়তায় ভুগতে হয়নি অথবা বার বার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে হয়নি পিছনে কেউ আছে কিনা! যদিও দেশে থাকার সময়কার সচেতনতা সম্পূর্ণ চলে যায়নি।

আমার বাসার উপর তলায় দুই ফ্যামিলি থাকে। তাদের প্রত্যেকের দুই জোড়া ছানাপোনা। জার্মান পিচ্চি ছেলেমেয়েগুলো পুরোই পুতুলের মতন। একদিন দেখলাম, মেয়ে পিচ্চিকে তার বাবা খুব বকছেন, মেয়ে পারলে কেঁদে দেয়। আমি তাকিয়েছি দেখে মেয়ের মা বললেন, সেদিন স্কুলে কোন পিচ্চি দুষ্টুমি করেছে, আর সে ওই পিচ্চিকে শায়েস্তা করেছে। আমি বললাম, বাহ, বেশ ভালো তো। মা অবাক করে দিয়ে বলল, ভালো মানে? কারোর কথা ভালো না লাগলে কমপ্লেইন করবে টিচারের কাছে। ওর রাইট আছে, তাকে সেটা জানতে হবে।

আমি বললাম, ছেড়ে দাও, ছোট্ট মেয়ে কীইবা বুঝবে! আমাকে থামিয়ে বললো, নাহ ও এখন না বুঝলে আর বুঝবে না। এখানে ছেলেমেয়ে ব্যাপার না, সবাই সমান শাস্তি আর আদর পাবে। ও আজ যদি জানতো তাহলে সমস্যাটা আমাদের পর্যন্ত আসতো না, নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে হবে সেটা ওকে এখনই বুঝতে হবে। আমি হাল ছেড়ে দিলাম। কয়েকদিন পর দেখি, ছোট ছেলেটা স্নোম্যান বানাতে গিয়ে দুষ্টূমি করেছে, তাই তাকে খেলার বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে যতক্ষণ না সে স্যরি বলছে।

আমি দেখি আর ঈর্ষান্বিত হই আবারও। আমাদের দেশের মেয়েরা তো জানেই না তার রাইট কী কী যতক্ষণ না সে সমস্যায় পড়ছে। আমি নিজেই তো জানতাম না আমার দেশের আইন আমার জন্যে কি কি সুবিধা-অসুবিধা রেখেছে।

অনেকেই বলেন, মেয়েগুলো প্রবাসে এলেই গলা বড় হয়, কেউ নারীবাদী হয়, আর কেউ মানবতাবাদী হয়, আর কেউ এককাঠি সরেস হয় এই বলে যে গেল গেল উচ্ছন্নে গেল মেয়ে। কেন হয় এমন? আমি নিজেকে যখন এই প্রশ্ন করি তখন একটাই উত্তর আসে, ঈর্ষা। আপনি একে ঈর্ষা অথবা হিংসা যা মনে হয় বলতে পারেন। ঈর্ষা অথবা হিংসা তো দ্বিপাক্ষিক, একপক্ষ আমরা বা আমি, আর দ্বিতীয় পক্ষ হলো এদেশের মেয়েরা। কেন? ওদের দিকে তাকাতে কে বললো? নিজের কাজ নিজে করে কোন দিকে না তাকিয়ে চলা যায় না? আমার উত্তর, না যায় না। কেন? যদি আপন মনে নিজের কাজ নিজেই করতে হবে, তাহলে দেশে থাকলেই পারতাম, বিদেশে এতো কষ্ট করে আসার কি দরকার ছিল? নিজেকে বিদ্যায় উন্নত করতে এই বিদেশ আমার জন্যে চীন দেশে পাড়ি দেয়ার সমতুল্য। আর এসব দেশে কাজে হোক, পড়াশুনায় হোক, কাউকে জিজ্ঞেস না করলে কেউ আগ বাড়িয়ে সাহায্য করেন না।

এখন প্রশ্ন করেন, এতো জেনে কী হবে? যা পাওয়া যায় তাই নিয়ে থাকা যায় না? তাহলে বলবো, না যায় না। কারণ জানাটা আমার প্রয়োজন, আমার অধিকার! আর অল্পে যদি সন্তুষ্ট থাকা যায় তাহলে, রাস্তায় মেয়েদের এতো হেনস্থার শিকার হতে হতো না, সেফটিফিন বা এন্টিকাটার নিয়ে বের হতে হতো না। একথার পর অনেকেই বলবে, প্রবাস যেহেতু ভালো তাহলে ওখানেই থেকে যাও শুধু শুধু আমাদের মেয়েদের নিয়ে কেন টানাটানি করো? উত্তর একটাই, আমরা বাঙ্গালী মেয়েরা অনেক যোগ্য। এই যোগ্যতার অপচয় হোক আমরা চাই না, এই যোগ্যতার রিমোট কন্ট্রোল কারোর হাতে পড়ুক চাই না।

আমরা ঈর্ষান্বিত হয়ে চিংকার করি আমাদের স্বদেশী মেয়েদের জন্যে। যদি কারোর কানে একটু পৌঁছায়, কেউ যদি একটু ডানা ঝাপটানোর চেষ্টা করে, শুধু এইটুকুর জন্যেই! সবকিছুতেই অন্য দেশকে অনুকরণ করি আমরা, এই ভালো দিকগুলোও যেন অনুকরণ করি, সেটা বলার জন্যেই আমরা চিৎকার করি।

একটু সম্মান-মর্যাদায় বেঁচে থাকা মানুষ হিসেবে সবার চাওয়া, মেয়ে নয় বরং একজন মানুষ হিসেবে সেই সম্মানটুকু নিয়ে যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় সে জন্যেই এই চিৎকার করা। নিজের অধিকার নিয়ে যেন সচেতন হয়, স্ব-নির্ভরশীল যেন হয়, আত্মসচেতন যেন হয় সেটা জানান দেয়ার জন্যেই আমরা চিৎকার করি। কারণ দিনশেষে এই মেয়েগুলো যে আমাদেরই কারোর আত্মজা, এরা যদি না উন্নত হয় জাতি হিসেবে আমরাই পিছিয়ে পড়বো সবদিক থেকে!

লেখক: মাস্টার্স অধ্যয়নরত, টেকনিকাল ইউনিভার্সিটি ড্রেসডেন, জার্মানি।

শেয়ার করুন:
  • 22
  •  
  •  
  •  
  •  
    22
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.