আমার মুক্তি একজোড়া কেডস  

শান্তা মারিয়া: পাশের বাড়ির এক তরুণী সেদিন একটু ইতস্তত করে আমার ফ্ল্যাটে এলেন। তিনি শুনেছেন আমি সংবাদপত্রে চাকরি করি। তিনি বি.কম পাশ করেছেন। চাকরি খুঁজছেন। একটি চাকরি তাকে জোগাড় করে দিতে আমাকে অনুরোধ করলেন। তারপর কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপা, আপনিও তো বেশ বেঁটে। আমার মতোই।’

আমি হাসলাম। তরুণী দুঃখের সঙ্গে বললেন, ‘আপনার তো বিয়েও হয়েছে, চাকরিও হয়েছে।’ তারপর আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে আরেকটু অবাক হলেন। আমি তখন সদ্য অফিস থেকে ফিরেছি। পায়ে কেডস জুতো। সেই জুতো লক্ষ্য করে তিনি বললেন, ‘আপনি হিল পরেন না? আপনার হাজবেন্ড কিছু বলে না?’

তরুণী চলে গেলে পর আমি তার প্রশ্নটি নিয়ে ভাবতে ভাবতে শোবার ঘরে ঢুকলাম। কাজকর্ম পড়ে রইলো। আমার চোখে ভাসছিল নিজের বিগত জীবনটা। আমার উচ্চতা চার ফুট আট ইঞ্চি। এই চার ফুট আট ইঞ্চি উচ্চতার নিচে চাপা পড়েছিল আমার পুরো টিনএজ, তারুণ্য, বিবাহিত জীবন এবং কর্মজীবনের একটা বড় অংশের আনন্দ উচ্ছ্বলতা। বিষয়টা বুঝিয়ে বলছি।

শান্তা মারিয়া, লেখক ও সাংবাদিক

স্কুলে আমি ক্লাসে ফার্স্ট হতাম। শুধু ভালো ছাত্রীই ছিলাম না, অন্যান্য দিকেও বেশ প্রতিভা ছিল। কবিতা লেখা, ছবি আঁকা, আবৃত্তি, অভিনয়, উপস্থিত বক্তৃতা সবটাতেই বেশ ভালো ছিলাম। টিভিতে অনুষ্ঠান করতাম। নয় বছর বয়সে বই প্রকাশ হয়েছিল। কিন্তু হলে কী হবে? আমার সহপাঠীরা বিশেষ করে ক্লাসের ছেলেরা আমার জীবন অতিষ্ঠ করে দিয়েছিল উচ্চতা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে। ‘বুলিয়িং’ কী এবং কত প্রকার তা আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। আজ বুঝতে পারি তারা মেধায় হয়তো আমার সমকক্ষ ছিল না বলেই ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে শোধ তুলতে চাইতো।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও একই সমস্যা। মনে আছে স্টাডি ট্যুরে সিলেট গিয়েছিলাম। উচুঁ হিল জুতোর সঙ্গে ছিল একজোড়া কেডসও। জাফলং ও মাধবকুণ্ডে যাবার সময় আমি সেই কেডস পরেছিলাম। হিল এবং ফ্যাশনেবল স্যান্ডেল পরা অন্য মেয়েদের তুলনায় আমি বরং অনেক স্বচ্ছন্দে হাঁটছিলাম। সেজন্য শ্রদ্ধেয় আসাদুজ্জামান স্যার আমার প্রশংসাও করছিলেন।

কিন্তু গতি স্বচ্ছন্দ হলে কী হবে! কেডস পরে আমাকে ৪ ফুট ৮ ইঞ্চিই দেখাচ্ছিল। আর সহপাঠী মেয়েরা তাই নিয়ে হাসি ঠাট্টা বিদ্রুপ করছিল যথেচ্ছ পরিমাণে। হেসে উড়িয়ে দিলেও মনের ভিতরটা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল।

বাড়ির পরিবেশ কি খুব সহজ ছিল? মোটেই নয়। আমি লেখাপড়ায় ভালো করছি, কবিতা লিখে পুরস্কার পাচ্ছি, সোভিয়েত নারী, ভারত বিচিত্রাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা ছাপা হচ্ছে, তা নিয়ে মায়ের ভালো লাগা কতোটা ছিল জানি না, কিন্তু আমার উচ্চতা নিয়ে তার ছিল বিস্তর খারাপ লাগা। আমাকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘বেঁটে বামন’। আমার আদৌ বিয়ে হবে কিনা সে সন্দেহ তার ছিল প্রবল। ক্লাস সেভেন থেকেই উচুঁ হিলের সঙ্গে আমাকে বেঁধে দিয়েছিলেন।

স্কুলে তো ‘স্কুল শু’ পরতে হতো। কিন্তু আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে, অনুষ্ঠানে বলতে কী বাড়ির বাইরে ফ্ল্যাট স্যান্ডেল বা জুতো পরা ছিল নিষিদ্ধ। আমার পা খুব ছোট সাইজের। ফলে বাজার ঘুরে এই ছোট সাইজের পায়ের জন্য উঁচু হিল কেনা হতো। দোকানে কিনতে না পাওয়া গেলে অর্ডার দেওয়া হতো, বা ব্যাংকক থেকে আনানো হতো। আমার লম্বা খালাতো ভাইবোনরাও আমার উচ্চতা নিয়ে হাসি ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো যথেষ্ট পরিমাণে। যদিও মেধায় আমি তাদের চেয়ে বেশিই ছিলাম। আমার মা একবার মেতে উঠলেন আমাকে হরমোন চিকিৎসা দিয়ে লম্বা বানানোর জন্য। তবে সেবার আমার বাবা প্রবল আপত্তি করায় আর সেটা করা হয়নি।

আমি ঢাকা লিটল থিয়েটারের নাটকে অভিনয় করতাম। ভালোই করতাম। কিন্তু একটু বড় হওয়ার পর মা মঞ্চে অভিনয় বন্ধ করে দিলেন, কারণ মঞ্চে খালি পায়ে নামতে হতে পারে এবং তাতে আমার উচ্চতা সকলের হাসির উদ্রেক ঘটাতে পারে।

যা হোক। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ‘খাটো বউ’ নিয়ে শাশুড়ির বিস্তর আফসোস শুনলাম। শ্বশুরবাড়ি গ্রামে। সেখানে যাবার পর শাশুড়ি চুপি চুপি আমাকে বলে দিলেন, আমি যেন কখনও পা থেকে উঁচু হিল জুতো না খুলি। বিশেষত আত্মীয় কুটুমদের সামনে। সম্ভব হলে তিনি হয়তো হিল আমার পায়ের সাথে সেলাই করে দিতেন।

আমার লম্বা স্বামী প্রায়ই উপদেশ দিতেন, ‘তুমি শার্ট-প্যান্ট পরো না। ওতে তোমাকে বেঁটে দেখায়।’ তিনি লম্বা নারীদের পছন্দ করেন। তাই কোনো লম্বা নারী দেখলেই সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে থাকতেন। আমি কোনো শাড়ি পরলে মন্তব্য করতেন, ‘অমুক আপা এটা পরলে বেশ ভালো মানাতো। উনি লম্বা তো, শাড়িতে তাই ওকে খুব সুন্দর লাগে’।

জনকণ্ঠে যখন আমি চাকরি করি তখন নিজের উচ্চতা নিয়ে মরমে মরে থাকতাম। আমার প্রিয় সহকর্মীরা আমার সৌন্দর্য নিয়ে কোনো প্রশংসা করেননি, তবে উচ্চতা এবং উঁচু হিল নিয়ে বিস্তর হাসি-তামাশা-মন্তব্য করেছেন।

লেখাটা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে তাই দুঃখের প্যাচাল সংক্ষেপে সারছি।

আমার মুক্তি ঘটলো চীন দেশে গিয়ে। সেখানে গিয়ে প্রথম শুনলাম আমি ‘ফিয়াওলিয়াং’ মানে সুন্দর। হিল ছাড়াই সুন্দর। কেডস পায়েই সুন্দর। সেখানে গিয়ে শুনলাম আমার চোখ, ঠোঁট, নাক সুন্দর। শুনলাম আমার গড়ন সুন্দর। শুনলাম, সব পোশাকেই আমি সুন্দর। শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, প্যান্ট, শার্ট, শর্টস, সুইমিং কস্টিউম, চীনা পোশাক সবকিছুতেই নাকি আমাকে দারুণ মানায়। একথা বললেন চীনারা। বললেন ইংরেজ, জার্মান, ফরাসিরা। আর আমার সেরা বন্ধু আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুললেন। বললেন, আমি লম্বা না বেঁটে তাতে কী আসে যায়! লেনিন, নেপোলিয়ন, শচীন টেন্ডুলকারের উদাহরণ দিলেন। মানুষের সৌন্দর্য তো তার দৈহিক উচ্চতায় নয়, সৌন্দর্য তার মানসিক উচ্চতায়।

আমি হিল ছেড়ে কেডসকে সঙ্গী করলাম। যে আমি রণপা পায়ে দুপা যেতে টলমল করতাম, সে আমি পাহাড়ে চড়তে শিখলাম। বলতে গেলে আমি হাঁটতে শিখলাম নতুন করে। দাঁড়াতে শিখলাম মাথা উঁচু করে।

দেশে ফিরে এলাম এক নতুন আমি। নতুন শান্তা। আজ আমি নিজের ইউটেরাস, গোড়ালির হাড়ের উপর চাপ সৃষ্টি করা পেন্সিল হিলগুলোকে ছুঁড়ে ফেলতে পেরেছি। এখন আমি কেডস পরি। ইচ্ছে হলে বেছে নেই কোলাপুরি কিংবা নাগরা। পায়ে পায়ে আমার রিকশা লাগে না। আমি হাঁটি। দীর্ঘ পথ হাঁটি। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হাঁটি। কে আমাকে বেঁটে বললো তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। পুরুষের চোখে, নারীর চোখে, কারও চোখেই আর আমার হিল পরে, ‘পেলভিক বোনে’র তেরটা বাজিয়ে সুন্দরী সাজার খায়েশ নেই।

এতগুলো ব্যক্তিগত কথা আমি আজ অকপটে বললাম শুধু এই কারণে যে, আমার মতো আরও অনেক মেয়ে সারাজীবন নিজের উচ্চতা নিয়ে মানসিক সংকোচে ভোগে। আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে। উঁচু হিলকে আশ্রয় করে তারা সুন্দর হতে চায়। আবার পাশ্চাত্যে অনেক নারীকে (যাদের উচ্চতা সংকট নেই) বোঝানো হয় যে, উঁচু হিল হলো ফেমিনিন। হাই হিল নাকি সেক্স অ্যাপিল বাড়ায়। হাই হিলের কারণে বিভিন্ন রকম শারীরিক সমস্যায় ভোগেন অনেক নারী।

আর আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ-রাস্তাঘাটে, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুমহলে কম উচ্চতার নারীকে প্রচুর ব্যঙ্গবিদ্রুপ সহ্য করতে হয়। যারা বিদ্রুপ করে তাদের উদ্দেশ্যে আমি, ৪ ফুট ৮ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের শান্তা মারিয়া, বলতে চাই যে, এসব বিদ্রুপের মাধ্যমে আপনারা আপনাদের মানসিক খর্বতাই প্রকাশ করছেন, আর কিছু নয়। আর যেসব নারীর উচ্চতা আমার মতোই কম, তাদের বলতে চাই, আত্মবিশ্বাসী হোন। নিজেকে বলুন, আপনি সুন্দর। কম উচ্চতা নিয়েই সুন্দর। হিল নয়, কেডস পায়ে হাঁটুন। আপনাকে যে জীবনের পথে হাঁটতে হবে অনেক অনেক দূর।  

শেয়ার করুন:
  • 806
  •  
  •  
  •  
  •  
    806
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.