কোন ‘তন্ত্র’ দিয়ে তৈরি এসব মানুষ?

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী: একটা ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে তছনছ হয়ে গিয়েছিলো কৈশোরের উদ্দাম আনন্দময় জীবন। বাবা- মায়ের চোখে সবচেয়ে সৎ, সত্যবাদী আর পড়ালেখায় মেধাবী বাড়ির যে ছোট্ট মেয়েটির জীবনে নেমে এসেছিলো ঘোর অমানিশা সেই আমি বাধ্য হয়েছিলাম অতি অল্প বয়সে কর্মজীবন শুরু করতে। উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর সাথে সাথেই। সে বিষয়ে বিস্তারিত পরে কোনোদিন লিখবো হয়তো।

একটি নামী ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং কোম্পানিতে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ (ফ্রন্ট ডেস্ক) হিসেবে কাজ করছিলাম। তের জন স্টাফের মধ্যে আমরা পাঁচজন মেয়ে এবং প্রত্যেকের একে অন্যের প্রতি সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব ছিলো। বয়সে আমিই সর্বকনিষ্ঠ। তাই কাজের বাইরেও অন্যরা আমাকে যথেষ্ট স্নেহ করতো। খবরের কাগজে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে সিনিয়র এক আপা আমাকে একরকম জোর করে সেখানে আবেদন করালো।

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী

ইন্টারভিউ দেবার পর চাকরিটা আমি পেয়ে যাই। মানব সম্পদ বিভাগ থেকে আমাকে বলা হলো, আমি ইন্টারভিউতে খুব ভালো করেছি, কেন আরো বেটার পোস্টের জন্য আবেদন করিনি। আমি সবিনয়ে জানাই, আমার শিক্ষাগত যোগ্যতায় টেলিফোন অপারেটর ছাড়া অন্য কোনো পদের জন্য আবেদন করা আপাতত সম্ভব হয়নি। তাই এই কাজটাকে সম্মান করেই করতে চাই।

একই সময়ে পরীক্ষা দিয়ে একটি খুব পুরনো, নামী পাঁচতারা হোটেলে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবেও কাজ পাই – তারও সূত্র ছিলো খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থার চাকরিটাই আমি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। চাকরি হবার পরেও মানব সম্পদ বিভাগ থেকে আরেকবার আমাকে ডাকা হয়, কারণ এখানেও আমিই বয়সের দিক থেকে সর্বকনিষ্ঠ কর্মী, তাই এতো বড় প্রতিষ্ঠানে, এতো রকমের মানুষকে হ্যান্ডেল করতে পারবো কীনা সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত হতে চাইছিলেন। সে যাত্রায়ও আমার সাক্ষাৎকার নিয়ে মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান সন্তুষ্টি  প্রকাশ করে বলেছিলেন, “আমি চাই তুমি যতোদিন কাজ করবে আজকের মতোই মাথা উঁচু করে যেন সেন্টারে চলাফেরা কর। “

মোটামুটি বিশাল এই সেন্টারে অল্পদিনেই সবার আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হলাম। শুধু একজন বাদে। সে ছিলো আমার সহকর্মী – বয়সে, অভিজ্ঞতায় আমার চেয়ে অনেক সিনিয়র। এখানে আমি প্রায় ছয় বছর কাজ করেছি। আগের অফিসে সিনিয়র আপারা আমাকে সস্নেহে আগলে রাখতেন। এখানে এসে যে সহকর্মী পেলাম, সেই ভদ্র(?)মহিলা প্রথম দিন থেকে আমার জীবন অতিষ্ঠ করার চক্রান্তে বদ্ধপরিকর। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, একটা অফিসে কাজ করার মতো সভ্যতার লেশমাত্র তার আচরণে অনুপস্থিত! একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরি জীবনের এই ছয়টি বছর আমাকে যে  সীমাহীন মানসিক যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছিলো, তা অবর্ণনীয় এবং কল্পনাতীত।

প্রথম আলাপেই আমার আগে যারা এখানে কাজ করেছিলো, তারা প্রত্যেকেই যে চরিত্রহীন, পতিতা ছিলো তা সম্পর্কে সে আমাকে বিস্তারিত তথ্য দিলো। পরে জেনেছি  আসলে ওনার অত্যাচারেই কেউ কাজ করতে পারতো না এখানে। শিফটে কাজের সময় সুপারভাইজারকে না জানিয়ে যখন-তখন অফিসে আসতো – যেতো। আমাকে দিয়ে নিজের ডিউটি করিয়ে নিতে শুরু করলো। অথচ আমার কোনোদিন সমস্যা হলে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে সোজা না বলে দিতো।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রত্যেকের ফোনে নিয়মিত আড়ি পেতে ব্যক্তিগত ও অফিসের গোপন তথ্য জানা এবং সেগুলো নিয়ে নানানজনের  কাছে মুখরোচক গালগল্প করা তার কাজ! নিজের কার্যসিদ্ধির জন্য যার-তার সাথে অবলীলায় অশ্লীল কথাবার্তা বলতেই থাকতো। মানুষ যে এতো মিথ্যেবাদী আর এতো ধুরন্ধর হতে পারে, তাকে না দেখলে আমি জানতাম না।
ক্যান্টিন ম্যানেজারের সাথে ফোনে আজেবাজে কথাবার্তা বলে প্রায়শই ফ্রিতে খাবার আনাতো।

একদিন সালাদ খাবে ম্যানেজারকে ফোন দিয়ে  শসা আনালো। শসা পেয়ে হাসতে হাসতে  আবার ফোন করে বলে, “এটা কী সাইজের শসা পাঠালেন? এটা কী শসা না অন্য কিছু?”
এই হলো তার রসিকতার স্ট্যান্ডার্ড!

রাজেশ্বরী প্রিয়রঞ্জিনীর আঁকা ছবি

নিজে ভুল করলে চোখের পলকে তা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতো না।
রোজ সকালে পেপার পড়া, নাশতা করা সব ব্যস্ততম টেলিফোন বোর্ডের ওপরেই করতো। এমনকি ঘুমিয়েও থাকতো!  সেই সময় আমাকে সে কাজে বসতে দিতো না, নিজেও একটা কল রিসিভ করতো না। ওদিকে এক্সচেঞ্জের বোর্ড লাল বাতিতে ভরে যেতো! না বলে পারছি না, নাশতার পর প্রতিদিন নিয়ম করে অফিস রুমের সাথে লাগোয়া ফ্রেশরুম ব্যবহার করে ইচ্ছে করে দরজা খুলে রেখে দিতো। দুর্গন্ধে সেখানে টেকা দায়। কান্না আসতো আমার।
বিনা কারণে দুর্ব্যবহার করা তো ব্যাপারই না, অতি জরুরি কাজে তার কাছে সাহায্য চাইলে সেসময় কথার কোনো জবাব দিতো না।
উপর মহলকে ঠিকই  হাতে রেখে চলতো।

উদ্ভট সব মিথ্যে অভিযোগ করতো আমার নামে। একদিন সুপারভাইজার ভদ্রলোক ডেকে বললেন, “আপনাদের মধ্যে সম্পর্ক যাই থাকুক, গতকাল ওনার শাশুড়ির মৃত্যু সংবাদ এসেছে, অথচ অনেক অনুরোধের পরেও  আপনি ওনাকে  ফোনটা দেননি – এটা কীভাবে হয়?”

আমি সত্যিই আকাশ থেকে পড়লাম, কেননা এরকম কোনো ঘটনা তো ঘটেইনি!!  তাহলে এর ব্যাখ্যা আমি কীভাবে দেব? তারপরও সুপারভাইজার সাহেব রায় দিলেন, “নন্দিনী, যেহেতু আপনি বয়সে ছোট, আপনিই ক্ষমা চেয়ে নেন!! “
তিনি সব জানলে, বুঝলেও অপারগ ছিলেন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।

এই ঘটনার পরেও তার দৌরাত্ম্য কিছু কমে না। কালো – ফর্সা, সুন্দর – অসুন্দর নিয়েও তার বিস্তর আলোচনা – পর্যালোচনা।  অপ্রাসঙ্গিকভাবে সে মুখের সামনেই বলতে থাকে সে কত লম্বা, ফর্সা, সুন্দরী আর আমি নাকি কালো, বেঁটে এবং অসুন্দর এবং অবশ্যই চরিত্রহীন! টেলিভিশনে আমার মায়ের কোনো সাক্ষাৎকার প্রচারিত হলে পরদিন এই নিয়ে টিপ্পনী কাটতে ছাড়তো না ।

নিজের উপার্জনের টাকায় প্রথম মোবাইল ফোন কিনলাম। ব্যস! শুরু হয়ে গেল – ” আরে!  আজকাল দেখি কাজের বুয়াদের হাতেও মোবাইল! ”  তার এসমস্ত কুৎসিত কথাবার্তার পরিপ্রেক্ষিতে মৌনতা আর ঠাণ্ডা চাহনি ছাড়া কোনো উত্তর আমার জানা ছিলো না। আমি যে পরিবেশে বড় হয়েছি, সেখানে বাড়িতে যারা সাহায্য করে, তাদেরকে ” কাজের বুয়া ” বলারও প্রচলন ছিলো না প্রকৃতপক্ষে।

মাত্র দুই হাত দূরত্বে বসেও দাঁতে দাঁত চেপে এসব কথা না শোনার ভান করে থাকতাম। চুপচাপ কাজ করতাম।  কারণ ততোদিনে আমি বুঝে গেছি, এই অফিসে সবাই আমার শুভাকাঙ্ক্ষী হলেও কী এক রহস্যময় কারণে তার এইসব অনাচারের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলবে না! একদিন স্টাফ বাসে একগাদা লোকের সামনে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ আপাকে চিৎকার করে অপমান করলেও কেউ কোনো প্রতিবাদ করলো না। সুপারভাইজার আমাকে বলতেন, ” উনি যে আপনাকে এসব বলে আমি বুঝলেও একটা প্রমাণ তো লাগবে। “

২০০৩ সালে আমি তখন সন্তানসম্ভবা। প্রথম সন্তান। নিজের শরীরে নতুন আরেকটি প্রাণের স্পন্দন! কী নির্মলতা ! প্রতিটি মুহূর্তই কী স্বর্গীয় অনুভূতি! প্রাণভরে এই সময়টুকু উপভোগ করতাম।
এই সময় আমার সেই তথাকথিত সহকর্মী, যে নিজেও দুই সন্তানের জননী, বলা শুরু করলো, “কাউলা (কালো) জামাইয়ের বাচ্চা তো কাউলাই হবে। এই কাউলা লোকজন দেখলে আমার বালতি এনে বমি করতে ইচ্ছে করে”। যারা পড়ছেন তারা বোধ করি বুঝতে পারছেন আমার জীবনসঙ্গী, সন্তানের বাবার গায়ের রঙ কালো (কাউলা)।

সন্তান ধারণের সময় বিশাল পেট হয়ে গেলো আমার। এতো বিশাল যে চার মাসের সময় আমার মা হেসে বলতো, “যমজ মনে হয়”। সন্তান হওয়ার একদিন আগেও অফিস করলাম। আমার সহকর্মী নামের কলঙ্ক হুংকার দিয়ে জানালো, ” কী একটা হাতি এনে বসিয়ে রেখেছে এখানে?”
একজন নারী, একজন মা, আরেকজন সন্তানসম্ভবা নারীর প্রতি এহেন কদর্য ভাষা প্রয়োগ করতে পারে, আমি সত্যিই জানতাম না।

মাতৃত্বকালীন ছুটি পেলাম ষোলো সপ্তাহ।
বাচ্চাকে নিয়ে কাজে ফিরলাম। মেয়েকে ক্যারিয়ারে বেঁধে, তার জিনিসপাতি একটা ব্যাগে নিয়ে অফিসে যেতাম। ছয় মাস বয়সের পর থেকে সকালেই বাড়ি থেকে নিজের রান্না করা সুজি, জাউ, সবজি আর মাংসের খিচুড়ি, ফল, স্যুপ – এসব নিয়ে যেতাম।

অফিসে বাচ্চা রাখার ব্যবস্থা ছিলো। বিশজন বাচ্চা একটা বড় ঘরে। যদিও তখন খুব স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, এমনকি বাচ্চাদের জন্য ফ্রেশরুমের ব্যবস্থাও ছিলো না। তবে চারজন কর্মী যারা বাচ্চাদের দেখভাল করতো, তারা যথেষ্ট আন্তরিক ছিলো। আমরা যে স্টাফ বাসে যাতায়াত করতাম, সেখানে আমরা তিনজন মা বাচ্চা সাথে নিয়ে অফিস করতাম। তিনটে বাচ্চাকেই সবাই খুব আদর করতো বাসে। আমার মেয়েও বাসে উঠলে সবাই কাড়াকাড়ি করতো। সেই একমাত্র ব্যক্তি যে আমার  শিশুকন্যাকে দেখলেই মুখটা বাঁকা করে ঘুরিয়ে নিতো।

বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য সকাল- বিকেল, চা – বিরতি, আর দুপুরের খাবারের সময় দ্রুত খাওয়া সেরে আমরা মায়েরা ছুটতাম ক্রেশে। সেন্টারে ফিডার নিষিদ্ধ ছিল। যেহেতু জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিয়েই কাজ, তাই মায়েরা যাতে সন্তানদেরকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত  স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি পরিপূর্ণভাবে বুকের দুধ খাওয়াতে পারে এ ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিল কর্তৃপক্ষ।

একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা – মার্জিত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তিনি একদিন এসে জানালেন, আমার এভাবে ক্যারিয়ারে বাচ্চাকে নিয়ে আসা দেখে তাঁর খুবই ভালো লেগেছে। এরপর থেকে মেয়ের  “অপ্সরী” নামের অর্থ জেনে তিনি প্রায় সময় সকালে অফিসে ঢোকার আগে “গুড মর্নিং”  জানিয়ে মিষ্টি হেসে বলে যেতেন, “অপ্সরী – A fairy from heaven – I like it!”
তার এই উৎসাহ দেয়াটা আমারো খুব ভালো লাগতো।

সুপারভাইজার বদল হয়েছে। নতুন জনকে ভদ্রলোক বলেই জানতাম। অচিরেই টের পেলাম আমার সহকর্মী তাকে যা উল্টোপাল্টা বুঝায়,  তাই বোঝেন তিনি। হঠাৎ নির্দেশ দিলেন, আমি বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য কতক্ষণ ক্রেশে থাকি সেই সময়কাল গণনার জন্য ইন – আউট খাতায় সই করতে হবে আমাকে।

অন্যান্য বিভাগে কাজ করা মায়েদের কারো জন্য এই নিয়ম ছিলো না। ব্যাপারটা অপমানজনক, তবু করলাম সই। একদিন ছুটির পরে মেয়েকে নিয়ে বাসের দিকে এগোচ্ছি, নতুন সুপারভাইজার আমার আট মাস বয়সী কন্যার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন, “কী, তুমি তো অনেক বড় হয়ে গেছো, এখনো মায়ের দুধ খাও!! ”
সহকর্মীর বাচ্চারা একদিন অফিসে এলে আমি স্বাভাবিকভাবেই আদর করলাম। পরদিন শুনি আমাকে দেখামাত্রই চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, ” আমি কালকেই জানতাম নোংরা মহিলার কুনজর লেগে আমার মেয়ে অসুস্থ হবে। “

আসলে কোন ডিজাইনে যে আক্রমণটা শুরু করবে বোঝা খুব মুশকিল ছিলো।

বড় কন্যার নয় মাস বয়সে আমার শরীরে আবারো হঠাৎ নতুন হৃৎস্পন্দন অনুভব করলাম। পরে শুনেছি বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর এই সময়টাতে অনেকে মেয়েরাই সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ে। কিছুতেই বাচ্চাকে হারাতে চাইনি। আবার কাউকে বলতে সংকোচ হচ্ছিলো। ভালোবেসে বাঁধা ঘরে আমি কাজ করছি, মেয়ের বাবা তখনো চারুকলার ছাত্র, পাশাপাশি যা কাজ পায়, করে। সবচেয়ে বেশি ভয় মাকে জানাতে। জানার পরে বাবা – মা, ডাক্তার বরং আরো সাহস দিলেন। আর পেছনে তাকালাম না। বড়টাকে কোলে আর যে আসছে তাকে পেটে নিয়ে কাজ করতে লাগলাম। ছুটির পর একদিন বাস স্টপেজে নামতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। কাক ভেজা হয়ে বাড়ি ফিরলাম আমরা  মা – মেয়ে।

ছোট সন্তান হবার আগে শরীরটা একটু বেশিই দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। একদিন অফিসের রেস্ট রুমে মাথা ঘুরে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়ালাম, নিজেই মাথায় পানি দিলাম।
শরীরের এই অবস্থা, ওদিকে মার ওপেন হার্ট সার্জারি হলো, পরপরই বাবার ব্রেইন স্ট্রোক।

সহকর্মী আর সুপারভাইজারের মানসিক নির্যাতন আর হয়রানির মাত্রা দিনদিন বাড়তে লাগলো।
একদিন তলব করা হলো আমাকে। আমার বিরুদ্ধে এবারের অভিযোগ, আমি নাকি অফিসের রেস্ট রুমে বমি করে ভাসিয়েছি! সেই থেকে আমার বিশিষ্ট পরিচ্ছন্ন সহকর্মী রেস্ট রুম ব্যবহার করতে পারছে না।
যথারীতি বানোয়াট কাহিনী।
মায়ের অপারেশনের সময় ছুটি চাইতে গেলে সুপারভাইজার বললেন, ” আপনার আর কোনো ভাইবোন নেই? মায়ের অপারেশনে আপনারই যেতে হবে?  “
কিছু বলার শক্তি হারালাম।

এরপর আবার তলব – ” আপনি এতো শর্ট টাইমের মধ্যে বাচ্চা নিতে গেলেন কেন? পরপর দুই বছর মেটারনিটি লিভে যাবেন, এটা তো এইচআর থেকেও মানবে না। আর শিক্ষিত একটা মেয়ে হয়ে এখন যদি বলেন বুঝতে পারেননি বা এক্সিডেন্ট, সেটা তো একসেপ্টেবল না, তাই না? “

এবার সরাসরি মানব সম্পদ বিভাগে জানালাম।
সব শুনে তদন্তে নামলে আরো একগুচ্ছ মিথ্যে গল্প বানিয়ে বলে এলো মিথ্যুকটা।
মানব সম্পদ বিভাগে প্রায় সবাই আমাকে সাহস জুগিয়েছে যেন চাকরিটা আমি কিছুতেই না ছাড়ি। দুইজন বাচ্চা নিয়েই আমি অফিসে আসতে পারবো। কিন্তু ওই যে বললাম, কী এক অজানা কারণে সহকর্মীর এসব অনাকাঙ্ক্ষিত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে তারা ব্যর্থ হলো এবারেও।

আমি কৃতজ্ঞ তাদের প্রতি। বিশেষ করে আমার পিতৃতূল্য একজন মানুষ ছিলেন এখানে। খুব স্নেহ করতেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় আমি প্রাইভেটে গ্রাজুয়েশন করলাম। ব্রিটিশ কাউন্সিলে কোর্স সম্পন্ন করলাম। পরবর্তীতে আমার ব্যাংকের চাকরিতেও তিনিই আমাকে সহায়তা করেছিলেন।

ছোট কন্যার জন্মের পর আমি স্বেচ্ছায় চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলাম । এরকম মানসিক নির্যাতন সহ্য করে দুই বাচ্চাকে নিয়ে অফিস করাটা খুব দুষ্কর হয়ে পড়েছিলো। বছর দেড়েক পর ব্যাংকে যোগ দিয়েছি। যেদিন কাজে যোগ দেই  কাকতালীয়ভাবে সেদিনই সেই সুপারভাইজার ভদ্রলোকের সাথে দেখা। তিনি ব্যাংকের গ্রাহক। ব্যাংকে যখন মোটামুটি পুরনো হলাম, একদিন এসে আমার নাম ধরে খুঁজলেন। কথায় কথায় বললেন, “আপনার সাথে যে অন্যায় হয়েছে তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আপনি তো ভালো জায়গায় আছেন, প্লিজ কিছু মনে রাখবেন না। আসলে মানুষ যে এতো খারাপ হয় আমার ধারণা ছিলো না। আমি সত্যিই দুঃখিত।”

শুনেছি সেই সুপারভাইজার ভদ্রলোকের চাকরিটা খোয়াতে হয়েছিল আমার সেই প্রাক্তন সহকর্মীর কূটকচালির কারণে।
আমার পরে আরো দুইজন মেয়ে কাজ করতে এসেছে, যারা একইভাবে নির্যাতিত হয়েছে, একজনের সাথে এমনকি হাতাহাতি, চুলোচুলি পর্যন্ত হয়েছে। পরে তাদেরকে অন্য বিভাগে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

তবে, ” সত্যি সেলুকাসের বিচিত্র এই দেশে ” কী এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে ওরকম অসুস্থ মানসিকতার একজন স্টাফ দিনের পর দিন সহকর্মীদের ওপর অত্যাচার – মিথ্যাচার করে আজ পর্যন্ত বহাল তবিয়তে টিকে আছে  – ভেবে পাই না।

উচ্চ পদে যারা আসীন, তাদের মধ্যে কে সত্য আর কে মিথ্যে, কী ন্যায় আর কী অন্যায় এই বিচারটুকু করার মতো বিবেচনা বোধই যদি না থাকে, তাহলে তাদের সেই বিবেচনা বোধের অভাবের কারণে যে কত শত মেয়েরা কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় – সে দায়টা কী কেউ নেবে?

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.