কথার কথা না বলে বরং একটু ভাবি আমরা

দিনা ফেরদৌস: অনেক কথাই বলি আমরা। বলা শেষ হয়ে গেলেও কথা থেকে যায়। সেই থেকে যাওয়া কথাগুলো নিয়ে একটু ভাবলেই দেখা যায়, যা ভেবে কথাগুলো বলছি, অর্থ তার সম্পূর্ণ বিপরীতে যায়। যেমন, “জাতের মেয়ে কালোও ভালো”।
 
অর্থ দাঁড়ায়, জাতে তুলতে না পারলে গায়ের কালো রঙ মানা যায় না। কালো রঙকে ভালো বলতে হলে একশোটা যুক্তি লাগবে। তা না হলে বলতে হবে,”আমি কালো-মোটা তাতে কোনো সমস্যা নাই। এই সমস্যা নাই কথাটি মূলত কাকে বোঝানো হচ্ছে? নিজেকে তো অবশ্যই না। কোনো মানুষের মধ্যেই সব ধরনের গুণ থাকা বিরল। এই কালো-মোটা শরীর ছাড়াও আমাদের মধ্যে আরো বহু ধরনের অযোগ্যতা আছে। আর এমন বহু যোগ্যতাও আছে, যা থাকার কারণে বহু সুন্দরীদের থেকে আমরা এগিয়ে আছি।
 
দিনা ফেরদৌস

সিনেমার নায়িকা বা বিজ্ঞাপনের মডেল হতে না চাইলে কালো-মোটা বিষয়টি কোনো যোগ্যতাকে দমিয়ে রাখতে পারার কথা না। অথচ কাজের ক্ষেত্রে বহু দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও কতো কঠিন পরিশ্রম দিয়ে আমরা তা কাটিয়ে উঠি। কই কখনও তো বলি না কাজের ক্ষেত্রে দুর্বলতা কোনো সমস্যা না। উল্টো দিক থেকে যদি ভাবি যে, কালো এবং মোটা থাকাটাকে ভেতরে ভেতরে নিজেই কঠিন সমস্যা হিসেবে লালন করি। তারপর সমস্যা না বলে যুক্তি দাঁড় করাই।

অনেক বিবাহিত নারীই মজা করে স্বামীকে বলে থাকেন, “শুধু আমি বলেই তোমার সংসার করি”। কথাটা মজা করে হোক বা কথার কথা হোক, অতি সুখে কেউ নিশ্চয়ই এই জাতীয় কথা বলেন না। যেকোনো কষ্ট, বিরক্তি, মন্দ লাগা বা অতৃপ্তি থেকেই এই ধরনের কথা বলে থাকি। উল্টো দিক থেকে ভাবলে দেখা যাবে এইসব কথা শুধু নিজেকেই ছোট করছে। এমন সংসার কেনই বা করতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে মানে, না করে কোন উপায় নেই। নিশ্চয়ই এই সংসার করার পিছনে কোন  দায়, বাধ্যবাধকতা বা নিজের কোনো অক্ষমতা বা অযোগ্যতা আছে। আর আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তির অযোগ্যতার দায় তার নিজেকেই বহন করতে হয়।

ছোটবেলা এমন অনেকের সংসারের কথা মা, চাচীদের আলাপ করতে শুনেছি যে অমুক “আটকনে” আছেন, বিচার শেষে কী হবে কে জানে (“আটকনে” মানে হচ্ছে, মেয়ের স্বামীর বাড়ির সঙ্গে কোন কারণে বনিবনা হচ্ছে না, তাই বাপের বাড়ির লোকজন তাদের মেয়ে আটকে রেখেছেন। বিচার সালিশ করে স্বামীকে বুঝিয়ে মেয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠাবেন)। বিচার-সালিশ অবশেষে তাদের কাউকেই বাপের বাড়ি আটকনে আর থেকে যেতে হয়নি। সবকিছু মেনেই মেয়েদের সংসার করতে হয়।পুরুষ একদিন তার ভুল বুঝবে, এই জাতীয় বিশ্বাস সেইসব মেয়েদের ভেতরে এতো শক্ত  অবস্থানে ছিলো যে স্বামী-সংসারকেন্দ্রিক কোন প্রতিবন্ধকতাই সেখানে জায়গা করতে পারে নাই।

এক সময়কার সেইসব আটকনে থাকারা এখন যখন বলেন, আজকালকার মেয়েরা অল্পতেই স্বামীর সংসার ছেড়ে চলে আসে, কই আমরা কি সংসার করিনি? সংসার ছেড়ে যাইনি বলেই আজ কতো ভালো আছি। তখন বলার মতো কিছুই খুঁজে পাই না। বলতে ইচ্ছা করে, যৌবনে স্বামীর লাত্থি-গুতো খেয়ে টিকটিকির মতো টিকে থেকে, যৌবন অস্বীকার করে বুইড়া বয়সে সংসার টিকিয়ে রাখার ক্রেডিট আজকালকার মেয়েরা নেবে না। তারা লড়তে জানে, একা বাঁচতে জানে।

আজকালকার মেয়েরা অনেক কিছুর সঙ্গেই আপোস না করলেও তাদের কিছু হতাশা দেখলে প্রচণ্ড বিরক্ত লাগে। যেমন অনেক মেয়ের মুখেই শুনি, ছেলেরা সুন্দরী মেয়ে পেলে যোগ্যতার ছাড় দেয়। মানে দাঁড়ায়, মেয়েদের সৌন্দর্য্য তার একটা বিশাল যোগ্যতা। সৌন্দর্য্য কোনো যোগ্যতা কিনা তা আমার আলোচনার বিষয় না। যেই ছেলে আপনাকে তার যোগ্য মনে করছে না, সেই ছেলের জন্য এতো হাহাকার কিসের সেটাই অবাক করে। এমন বহু ছেলে আছেন যারা বিয়ে করার সময় উচ্চ শিক্ষিত, চাকরিজীবী মেয়ে খুঁজেন। তখনও চারদিকে মেয়েদেরই বেশি কানাঘুষা শোনা যায় যে, শুধু উচ্চ ডিগ্রিধারী থাকায় এই রকম অসুন্দর মেয়ে আমাদের ছেলের জন্য নিয়ে আসলাম।

বইনেরা, ছেলেরা কী চায় না চায়, তার চিন্তা বাদ দিয়ে স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে নিজে কী চান, তা নিয়ে ভাবুন। যে আপনার দিকে তাকায় না তার জন্য হাহাকার করে তার প্রতি আগ্রহী মেয়েদের লিস্ট বড় করা থেকে বিরত থাকুন। নিজের পছন্দ অনুযায়ী মানুষ খুঁজে নিন আপনার লিস্ট অনুযায়ী।

আপনার পছন্দের লিস্ট অনুযায়ী মানুষ বেছে নিন বলতে মনে পড়ে গেলো, বেশ কিছুকাল আগে বরের সঙ্গে তার পরিচিত কোনো মেয়ের বিয়ের দাওয়াতে যাওয়ার কথা। আমার বর পরিচয় করিয়ে দিলেন কনের সাথে। জিজ্ঞেস করলাম কনেকে, কী অবস্থা? কনে বললেন, আর বলবেন না ভাবী, মাথার উপর এতোগুলো বড় ভাই-বোন থাকতে নিজের বিয়ের পাত্র নিজেই খুঁজ়ে বের করলাম (যদিও মজা করে বলেছেন, লাভ ম্যারেজ তাদের), আর বিয়ের সব শপিং নিজেই করলাম।

কথাটি শুনেই বর আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন। পরে বললেন, ওদের পরিবারের সবাই খুব স্মার্ট আর কর্মী (আমার আধুনিক বর মেয়েদের জ্ঞানচর্চা, বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টনেস, কর্মদক্ষতাকে সব সময়ই খুব সম্মান করেন, যার ভাগ্যে কিনা জুটেছে দুনিয়ার সবচেয়ে আনস্মার্ট, নিষ্কর্মা মেয়েটি)। বরকে বললাম, এখানে স্মার্ট বা কর্মী হওয়ার বিশেষ কিছু নাই। পড়াশুনা জানা মেয়ে, চাকরি করে, তার বর সে ঠিক করবে না তো কে এই দায়িত্ব নেবে? আর বিয়ের শপিং তো নিজে করাই ভালো। তার খুশি হওয়া উচিৎ যে, সে এই সুযোগ পেয়েছে নিজের পছন্দ অনুযায়ী জিনিস কেনার।

আরেক বিয়েতে গিয়ে এই রকম শুনি যে, কনে খুব স্মার্ট, যে নিজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বিয়ের দিন কনে পার্লারে একা গেছেন সাজতে (যদিও সঙ্গে গাড়ি ছিলো আবার সাজুগুজু শেষে গাড়ি করে পরিবারের লোকজন নিয়ে আসছেন সেন্টারে কনেকে)। যে মেয়ে সারা বছরই একা পার্লারে যায়, সে বিয়ের দিন ধরেই নিলাম একাই গেছেন, এতে স্মার্টনেসের বিশেষ কিছু আমার মনে হলো না।

আমরা মেয়েরা নিজেদের স্বাধীনচেতা বলতে চাই, আবার নিজের কাজ স্বাধীনভাবে করতে পারার সুযোগ পেলে তার জন্য হাটে-মাঠে-ঘাটে প্রশংসা খুঁজে বেড়াই। বহু চাকরিজীবী মেয়েদের মুখে শুনেছি, “চাকরি করি, তাই স্বাধীন মতো থাকি (আমি সেইসব চাকরিজীবী মেয়েদের কথা বলছি, যারা নিজের চাকরির পয়সা দিয়ে কসমেটিক আর শাড়ি-গহনা কিনে স্বাধীনতা ভোগ করেন,সংসারের খরচ, বাচ্চার ডায়পার থেকে শুরু করে বিকেলের নাস্তার বিস্কুট পর্যন্ত পতিদেবতার দায়িত্ব মনে করেন)।

কোনো ছেলের যখন চাকরি থাকে না, আমরা তাকে বেকার বলি, কিন্তু কোনো মেয়ে একই যোগ্যতা নিয়ে ঘরে বসে থাকলে আমরা তাকে বেকার মেয়ে হিসেবে ভাবতেই পারি না। বহু মা’কে বলতে শুনেছি, ঘরে জোয়ান ছেলে থাকতে মেয়ের রুজ়ি খাই। অথচ সংসারে বহু জোয়ান মেয়ে থাকতে’ও তো ছোট ভাইকে বোনের বিয়ের টাকা রোজগার করতে অজানা দেশে কাজের জন্য পাড়ি জমায়। এইসব কোন ঘটনাই আমাদের সমাজের বাইরের নয়।

তো কথা হচ্ছে কথার কথা অনেক কথাই বলি আমরা। বলার আগে আর একটু ভেবে বলার সময় মনে হয় এখন হয়েছে আমাদের। সবাই এতোবেশি বুঝি যে আড়াল করা কঠিন। তার কথার কথা বাদ দিয়ে আসল কথা নিয়েই যেনো ভাবি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.