ম্যাসকুলিনিটির নেগেটিভ সংজ্ঞায়ন বন্ধ হোক

তামান্না তাবাসসুম: নারী নির্যাতনের কোনো খবরের সাথে সাথেই অনেকে মুখ বাঁকা করে বলে যে ক্রিমিনাল তার পুরুষত্ব জাহির করেছে। এই কথাটি স্যাটায়ার করে বলা হলেও এর ইফেক্ট কিন্তু ভয়াবহ। ধর্ষককে বার বার পুরুষত্ব জাহির করেছে বলে আমরা কেন পুরুষত্বের ভুল সঙ্গায়ন করছি? শুধু পুংলিঙ্গ থাকলেই পুরুষ হওয়া যায় না। ঐ সব ক্রিমিনালদের পুংলিঙ্গধারী কীট বলা যেতে  পারে। এদের ক্ষেত্রে মানুষ বা পুরুষ কোন বিশেষণই যায় না।
ধর্ষণের খবরের নিচে কমেন্টে যারা মেয়ের দোষ খোঁজে তারা এরকম বলে যে, পর্দা ছাড়া মেয়ে হইলে যেকোনো পুরুষেরই পুরুষত্ব জেগে উঠবেই, তাই এটা জায়েজ!

একদিকে ব্যঙ্গ করে আমরা নেগেটিভিটি দেখাচ্ছি, আবার আরেকদল সিরিয়াসলি নেগেটিভিটি প্রমোট করছে।  

আর এভাবে বলতে থাকলে তো শিশু-কিশোররা ধরেই নেবে যে, বিকারগ্রস্ততাই বোধহয় পুরুষত্ব। হিরোইজমের সংজ্ঞা পাল্টে গেলে তো সমস্যা।

তামান্না তাবাসসুম

এখন যারা ক্রিমিনাল, তারা তো ক্রিমিনালই, তাদের আলাদা কোন দেশ, জাতি, জেন্ডার, কিচ্ছু নাই। এদের জাতটাই আলাদা। এ দেশীয় পুরুষেরা ক্রিমিনাল হয় কিছুটা নিজের কারণে,বাকিটা সমাজ ব্যবস্থার কারণে। এ সমাজে ছেলেদের মধ্যে মেয়েদের হেয় করার সব উপাদান প্রদান করা হয় সে ছেলেমেয়ের পার্থক্য বোঝার আগেই।

একটা শর্ট ফিল্ম দেখেছিলাম, সেখানে দেখিয়েছে ছোটবেলা থেকে ছেলেদের শেখানো হয় -ছেলেদের কাঁদতে হয় না। এটা না শিখিয়ে যদি এভাবে শেখানো হতো মেয়েদের কাঁদাতে হয় না (আমার মতে, মেয়ে না বলে কাউকে কাঁদতে হয় না বললে ব্যাপারটা আরো জেন্ডার নিউট্রাল হয়), তাইলে হয়তো সংসারে নারী নির্যাতন অনেক কম হতো।   

Social discourse হতে হয় ডিরেক্ট, mass people সরাসরি বলা জিনিসটাই বুঝে নেবে। হিউমেন কমিউনিকেশন সবচেয়ে জটিল কমিউনিকেশন —বিশেষ করে আমাদের মতো un/half-educated commoners আর অনেক ক্ষেত্রেই ill-educated elites-দের সমাজে।

বিভিন্ন আর্টিকেলে, গল্পে এমনভাবেই দেখানো হচ্ছে যে পুরুষ মানেই খারাপ। তার মানে যারা খারাপ না, তারা খুব মহান। এখানে অস্বাভাবিক ব্যাপারকে স্বাভাবিক করে দেখানো হচ্ছে। কোনো অপরাধে নারী জড়িত থাকলে বলে যে নারী হয়ে কীভাবে এই কাজ করলো? পুরুষের বেলায় তা বলা হয় না কেন?

তার মানে ধরেই নেয়া হয় যে, পুরুষ মাত্রই খারাপ, তাই তার খারাপটা টেকেন ফর গ্র‍ান্টেড। আর যারা খারাপটা করছেন না, তারা মহান! আবার এই মহানদেরও বিভিন্ন কথা শুনতে হয়, তাদের নিয়ে হাসাহাসি করে মানুষ।

সেদিন দেখলাম একজন বিয়ের ছবি আপলোড দিয়েছেন- ছবিটা এমন যে কনে বিদায়ের সময় বউ তার ভাইকে জডিয়ে ধরে কাঁদছে। পাশে বর নিচের দিকে তাকিয়ে আছে  স্যাড ফেইস করে।  
এখন এই ছবির নিচের কমেন্টগুলা দেখি –  
‘কী ব্যাপার, বরও কাঁদে নাকি? হাহাহা’ , ‘বাব্বাহ বউয়ের কান্না দেখে বরও কাঁদে, বউয়ের জন্য এত্তো মায়া? হিহিহি!’ ‘বউ পাগলা হয়ে গেলি, নাকি বউয়ের কান্না দেখে কাঁদছিস?’
সবগুলো কমেন্টই বরকে এভাবে ইনসাল্ট করে মজা নিয়ে।   
এখন কথা হচ্ছে, জীবনসঙ্গীর কষ্ট যদি কাউকে না ছুঁয়ে যায়, তাইলে সে কিসের মানুষ হইলো? বউয়ের কান্না দেখে বরের খারাপ লাগতে পারে না?
আমাদের সমাজের সেট করে দেয়া পুরুষ মানুষের সংজ্ঞায় মানবিক দিক থাকতে নেই? আমি সবচেয়ে মাইল্ড উদাহরণটা দিলাম, ভয়াবহ ঘটনাগুলা আমাদের সবারই পরিচিত, নতুন করে বলার কিছু নাই।

স্ত্রৈণ শব্দটা যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, মেয়েদের বেলায় সেই অর্থে কোন শব্দ নাই।    

সেই অনেক আগে থেকেই প্রবাদের নেগেটিভ সব ক্যারেক্টারিস্টিক এনে বলা হয়, এটাই নাকি পুরুষ এর বৈশিষ্ট্য, অন্যায় করলেও তারা রাজা- এই টাইপ কথাবার্তাগুলা আমরা জানি, তাই আমি আর রিপিট করে এর ‘মর্যাদা’ বাড়ালাম না। তুলনামূলক নিরাপদ একটা উদাহরণ দিলাম- ‘লজ্জা নারীর ভূষণ, পুরুষের না’- কেন ভাই, পুরুষরা কি সব নির্লজ্জ, বেহায়া, বেশরম হবে তাইলে?  

বাবারা আমাদের সমাজের সবচেয়ে অপ্রশংসিত ব্যক্তি। এমনও পুরুষ দেখেছি যারা স্ত্রী মারা যাবার পর সন্তানদের কথা চিন্তা করে আর বিয়ে করেননি। তাদের গল্প আমাদের লেখকরা বলেন না, আমাদের বইগুলোতে শুধু সেক্সিস্ট পুরুষই দেখানো হয়।  
রিসার্চে দেখা গেছে যে সময়টায় সুইসাইডের খারাপ দিক নিয়ে ক্যাম্পেইন করা হয়, তখন সুইসাইডাল এটেম্পট বেশি বেড়ে যায়। তাই অন্যায় প্রতিরোধে টেকনিক্যাল হতে হবে। মিডিয়া আমাদের যেমনটা শেখায়, আমাদের আচরণে তেমনটাই প্রভাব পড়ে।

ব্যাপারটা এমন যে ক্রাইম পেট্রল পোগ্রাম দেখে খুনি কেমনে ধরে তার চেয়ে পোলাপান খুন করার উপায় শিখে বেশি। তাই শুধু অন্যায় তুলে ধরলেই সমাজ চেইঞ্জ হয় না, এমনভাবে তা প্রকাশ করতে হয় যাতে মানুষের মনে কোন নেগেটিভ ইফেক্ট না পড়ে। সেক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার খুব জরুরি।  

যে ভুলটা হয় বীরাঙ্গনাদের কথা বলার সময়। বইয়ে ধর্ষণ শব্দটা এভয়েড করতে গিয়ে আমরা ভিক্টিমের ইজ্জত নিয়ে টান দেই।

পুরুষের মতো পুরুষ তো ‘লিটন নন্দী’, যে পহেলা বৈশাখের সময় নিপীড়িত মেয়েগুলাকে সাহায্য করেছিলো। খাদিজাকে কোপানের পর যে ছেলেটা   হাসপাতালে নিইয়ে গেল পুরুষ তো সেই ছেলেটাও। এই হিরোদের কেন আমরা প্রমোট করি না? যেখানে গুণীর কদর নাই, সেখানে গুণী জন্মায় না। লিটন নন্দীর মাকে ঐ বছর রত্নগর্ভা পুরস্কার দেয়া উচিৎ ছিল।

নারী নির্যাতনের খবরগুলা যেভাবে ভাইরাল হয়, তার মধ্যে যে অল্প কয়েকটার বিচার হয়, সেগুলোও তেমন ভাইরাল করা উচিৎ। “ধর্ষণকারীর কোন বিচার হয় না” টাইপ একটা বদ্ধমূল ধারণা যেন সুপ্ত অপরাধীদের মনে না থাকে।   

ইংলিশ পেইজগুলাতে দেখবেন তারা Real Man এর একটা আলাদা সঙ্গায়ন করে প্রচারণা চালাচ্ছে। যেমন –

Real man Invest in long-term love; not short term lust.

You are not a real man if you abuse women.

The real power of a man is in the size of the smile of the women sitting next to him.

You can’t be a real man if you don’t look out for your kids. They need you.

বাংলা পেইজগুলাতেও এমনটা হলে মন্দ হতো না। শুধু নারীদের পাল্টানোর চিন্তা করলেই সমাজ পাল্টাবে না। পরিবর্তন আনতে হবে হাতে হাত রেখে।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.