কোথায় গেল আমাদের প্রতিবাদের শক্তি?

ফারহানা আনন্দময়ী: আজ মহান একুশের মাসের এই প্রথম বিকেলে একজন লেখক-প্রকাশকও কি দাঁড়িয়েছিলেন বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে, প্রাঙ্গনের বাইরে, টিএসসি-তে কিংবা শাহবাগে… একটা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে, যাতে লেখা ছিল “এই পুলিশি তদারকি আমার অপমান, আমার বইয়ের অপমান। মানি না, মানবো না।”
দাঁড়িয়েছিলেন কেউ? দাঁড়াননি।

আজ যারা কবি-সাহিত্যিকেরা প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সাহিত্য পদক নিলেন, এক মুহূর্তের জন্যেও কি কেউ একজন আত্মগ্লানিতে ভুগেছিলেন? একজন লেখকও কি মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্পর্ধিত উচ্চারণে বলতে পারলেন না, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাকে ক্ষমা করবেন। একজন লেখকের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রের এই চরম অপমানের মধ্যেখানে দাঁড়িয়ে আমি এই সাহিত্যপদক নিতে পারবো না। এই পদক আমাকে বাকিজীবন উপহাস করবে।”

এই যে হোমপেইজ জুড়ে বিভিন্ন বন্ধুলেখকেরা বইপ্রকাশের সচিত্র খবর ছাপাচ্ছেন, আপনাদের একজনের গায়েও কি এই অপমানের আঁচড় লাগেনি? একটুও গ্লানি অনুভব করছেন না? অন্তত এটুকু তো লিখতে পারতেন, “হ্যাঁ, এই বইমেলায় আমার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রের এই পুলিশি বই-তদারকি সিদ্ধান্তে অপমানিত বোধ করে আমি তার প্রতিবাদে বইপ্রচারের পোস্ট থেকে বিরত থাকলাম।”

কী দুর্ভাগা জাতি আমরা! একজন মাত্র শিরদাঁড়াযুক্ত লেখকও এই জাতি পায়নি।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না পাওয়ার জন্যে রাষ্ট্র এবং একাডেমির এতো নির্দেশ-আদেশ, এতো বর্বর আয়োজন। এখন আমি যদি বলি, এই পুলিশি তদারকিতে আমার লেখক অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হলো। সেটাও তো অনুভুতি। সেটা রক্ষা করার জন্যে রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

হায় রে আমার একুশ! হায়রে আমার বইমেলা! হায়রে আমার লেখক সত্ত্বা!

আগে লেখা একটি কবিতা আজ আবারও পোস্ট করছি, ক্রোধে-হতাশায়, মনের দুঃখে…

যখন চাই এক অনিবার্য ভাঙচুর-চুরমার
ভেঙে যাবে মগজের কার্ফ্যু…কবি আর কবিতার,
নখর উৎসব শেষে তখন শোকযাত্রার নীরবতা কেন ?
কবিরা কি সবাই অভিযাত্রী
মূক ও বধিরতার চূড়ায় ওঠার অভিযানে ?

আমি জানি, হে কবি, তোমরা নিশ্চয়ই ফিরবে স্তিমিত তর্কে।
এরপরের বার…এরপরের বর্ষায়, তোমার প্রিয় ঋতুতে
তুমি যখন খুব ঝুঁকে দেখতে চাইবে আমার নাভির অতল
এক চকিতে দেখে ফেলবো আমি
তোমার নাভির ভিতরে দগদগে জন্ম-ঘা।
তুমি যখন শুদ্ধাশুদ্ধির খেলায়
আমার নগ্ন পিঠে কবিতার শান্তিজল ছিটাতে আসবে
কবি, আমি ঠিক বুঝে নেবো তোমার অক্ষমতার হস্তসুখ।
আগামী বসন্তে তুমি যখন আবার আমাকে ডাকবে
সন্ধ্যার মেঘমালা,
দেখে নিয়ো কবি, পরদিন তোমার কবিতার খাতায়
সুখী সূর্যমুখী হাসবে না আর;
হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে কবিতাঘরের কড়ি-বর্গা-ছাদ।
মিলিয়ে নিয়ো কবি…
এই বিবস্ত্র বৈশাখে এ তোমার বান্ধবী-কন্যা-দয়িতার অভিশাপ।

(দয়িতার অভিশাপ)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.