‘ফেয়ার’ ধারণার পুরোটাই আনফেয়ার ও বৈষম্যমূলক

রিয়াজুল হক: (১) কেউ কি কখনও দেখেছে কালো গোলাপ কখনও ফোটে না, শুধু অকালে ঝরে পড়ে। কেউ কি কখনও দেখেছে কালো পাখি কখনও ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়ায় না। কেউ কি কখনও দেখেছে কালো মাছ কখনও জলে খেলা করে না। কেউ কি কখনও দেখেছে কালো রঙের কোনো প্রজাপতি সবুজের বুকে তার রঙ ছড়ায় না। কেউ কি কখনও দেখেছে কালো রঙের কোনো চিতা ক্ষিপ্রগতিতে দৌঁড়ায় না। প্রকৃতিতে প্রাণীর মহিমায়, সচলতায়, স্বাধীনতায়, বিকাশে তার শরীরের রঙ কোনো প্রতিবন্ধকতা ও পার্থক্য তৈরি করে না।

২. প্রকৃতি বলে না সাদা সারস শ্রেয়, আর কালো ময়না নিচ ও হেয়। প্রকৃতি বলে না সাদা পায়রা শান্তির দূত, আর কালো পায়রা অশান্তির প্রতীক। সুনীল অাকাশে সাদা ও কালো পায়রা উভয়ে ঘুড়ে বেড়ায় অবাধে। প্রকৃতির কাছে তারা সকলেই আবশ্যিক উপাদানসম জীব বা বায়োটিক। অাসলে প্রকৃতি তার সৃষ্ট সব রঙকে আপন বৈচিত্র্যের প্রকরণ বলে প্রকাশ করে, নিজের অংশ করে নেয় সহজাত বলে। কারো প্রতি সে বৈষম্য করে না। কাউকে সে বিযুক্ত বা অ্যাপার্ট করে না। প্রকৃতির সাদা, কালো, বাদামি, খয়েরি, সবুজ, লাল, নীল সব প্রাণীর মধ্যে আছে এক অবাধ, সক্রিয় ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার দেয়া-নেয়ার আবশ্যিক সম্পর্ক। যাকে আমরা বিদ্যাজাগতিকভাবে বলি প্রতিবেশ বা ইকো সিস্টেম। এ ব্যবস্থা আছে বলেই প্রাণীকূল টিকে আছে। এখানে কোনো প্রভেদ নেই। এখানে কোনো বৈষম্য নেই। এখানে অনুজীবও গুরুত্বপূর্ণ আপন ভূমিকায়।

৩. চৈত্রে কালো মেঘ দেখে কৃষকের মন আনন্দে ভরে ওঠে। সেই কালো মেঘ দেখে কৃষক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। কখন কালো মেঘ থেকে বৃষ্টি নেমে তার ফসলের ক্ষেত ভরিয়ে দেবে জলে। সৌর আলোর সবটাই যদি থেকে যেতো পৃথিবীতে, চব্বিশ ঘণ্টার পুরোটাই যদি পৃথিবীব্যাপী থাকতো সৌর আলো, তবে পৃথিবী হয়ে থাকতো একটি উত্তপ্ত বস্তু। এই পৃথিবীতে স্পন্দিত হতো না কোনো প্রাণ, বিকশিত হতো না বহুকোষী প্রাণী। বিকশিত হতো না মানবজাতি। রাতের নিকষ কালো তাই আবশ্যিক দিনের অালোর মতোই। দিনের আলো আর রাতের কালো মিলেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর জীবন সহায়ক ব্যবস্থা, বা লাইফ সার্পোট সিস্টেম। আলোর মতো তাই কালোর উপস্থিতি প্রকৃতি কূলে আনন্দের, উজ্জীবনের ও বিকাশের।

তবে কালো কেন শোকের রঙ, দুঃখের রঙ? কালো কেন অপূর্ণতা? আলো কেন পূর্ণতা? সাদা কেন শান্তির রঙ? পৃথিবীর সব প্রাণী রাতেই শান্তিনিদ্রায় যায়।

৪. প্রকৃতিতে কালো যদি না হয় অপাঙতেয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত, কালো যদি হয় সাদার মতোই সহজাত, আবশ্যিক ও বৈচিত্র্যের একটি প্রকরণ বা রকমফের, তবে, সমাজে কালো কেন হবে অপাঙতেয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আর সাদা হবে কাঙ্ক্ষিত। কেন কালো ও সাদার মধ্যে এই পার্থক্যরেখা, বৈষম্য যার পরিণতি। কেন কালোর ওপর সাদার আধিপত্য বা হেজিমনি।

৫. সাদাকে আবশ্যিক, কাঙ্ক্ষিত ও সুপিরিয়র বানিয়েছে উপনিবেশবাদ। সাদাকে ফেয়ার বলেছে উপনিবেশবাদ। একে একে তার সাম্রাজ্য বিস্তৃতির জন্য। তার শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখার জন্য, তাকে ন্যায্যতা দেয়ার জন্য। উপনিবেশবাদ আফ্রিকাকে বলেছে ‘কালো দেশ’, ‘অন্ধকারের দেশ’। আলোকে তারা উপমায়িত করেছে তাদের দখলদারিত্ব ও শাসনকে। তারা বলেছে তাদের শাসনে ‘কালো আফ্রিকা’ আলোকিত হবে, বর্বর থেকে সভ্য হবে। কিন্তু উপনিবেশবাদ আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদকে ভয়াবহভাবে লুণ্ঠন করেছে। নিঃস্ব করেছে আফ্রিকাকে। বিনষ্ট করেছে একটি মহাদেশের আপন মহিমায় জেগে ওঠার সকল সম্ভাবনাকে। টুকরো টুকরো করেছে অফ্রিকাকে সভ্য করা নামে। উপনিবেশবাদ এভাবেই অাফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা থেকে পুঁজির আদিম সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছে আজকের পুঁজিতন্ত্র এবং কেন্দ্রীভূত সম্পদের বিপুল সমাহার। যার কেন্দ্র ইউরোপে ও মার্কিন মুল্লুকে। প্রান্তে অনুন্নত বিশ্ব। কোটি কোটি মানুষ যেখানে দরিদ্র, বঞ্চিত।

৬. সাদা মানুষ মানেই সভ্য, শ্রেয়, উঁচু। আর কালো মানুষ মানে বর্বর। কালো মানুষ মানে অসভ্য, হেয়, নিচ। কালো মানে বুদ্ধি-বিবেকহীন মনুষ্যপ্রাণী। উপনিবেশবাদ কালো নারী-পুরুষকে পরাধীন করেছে, বন্দী করেছে, দাশ বানিয়েছে, বাজারে পণ্যের মতো নিলাম করেছে। নিজ মহাদেশ থেকে তাদের শেকড় ছিড়ে অন্য মহাদেশে প্রোথিত করেছে। তাদের জবরদস্তিশ্রমে গড়ে উঠেছে আজকের মার্কিন পুঁজিতন্ত্রের বুনিয়াদ।

৭. কালো পুরুষ যেমন হেয় ও নিচ। কালো নারীও তেমন হেয়, নিচ ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তবে সে কালো পুরুষের চেয়ে আরো প্রান্তিক, আরো নিচ, আরো অনাকাঙ্ক্ষিত, আরো নাজুক। কালো নারী মানে ফেয়ার নয়। সাদা নারী মানে ফেয়ার। পুঁজিতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্র একযোগে কালো নারীর এক সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক প্রতিকৃতি তৈরি করেছে। কালো নারীর এই প্রতিকৃতি বা ইমেজ সামাজিকায়ন প্রকিয়ায় নারীও গ্রহণ করেছে, পুরুষও গ্রহণ করেছে। সেমতে কালো নারী মানে কষ্টের, দুঃখের, ন্যুব্জতার, হীনতার, অপ্রত্যাশার প্রতিকৃতি বা ইমেজ। আর সাদা নারী মানে অানন্দের, উল্লাসের, স্পন্দনের ও সপ্রতিভ-এর প্রতিকৃতি বা ইমেজ। কালো মেয়ের বাবা-মা এবং পরিজনও বিচলিত, চিন্তিত কালো মেয়ের মতোই। কালো মেয়ের বিয়ে হবে তো? ভাল পাত্র পাওয়া যাবে তো? কালো মেয়ে চাকুরি পাবে তো?

৮. কালো নারীকে তাই সাদা হতে হবে। কালো নারীকে উজ্জ্বল হতে হবে, তাকে ফেয়ার হতে হবে। সে কেন হবে অন্ধকারের মতো কালো? বাজার এসে উপস্থিত কালো মেয়ের কাছে। বাজার এসে উপস্থিত সমাজের কাছে। গণমাধ্যমও এসে উপস্থিত কালো মেয়ের কাছে– তার ‘অনুভূত চাহিদা’ বা ফেল্ট নিড তৈরির জন্য। রঙ ফর্সাকারী ক্রিম চাই, রঙ ফর্সাকারী লোশন চাই, চাই ফেয়োরনেস ট্রিটমেন্ট। গর্ভবতী মাকে গাজর এবং আরো কিছু খাওয়ানো চাই, সন্তান যেন ফেয়ার হয়। সন্তানের রঙ যেন ফর্সা হয়। কতোশত ব্যবস্থা কালো নারীর ফেয়ারনেস তৈরির জন্য। ফেয়ার শিশু জন্ম দেয়ার জন্য। কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ কালো মেয়ের ফেয়ারনেস তৈরির জন্য। কালো মেয়েকে ফর্সা বানানোর জন্য।

৯. উপনিবেশবাদ, পুঁজিতন্ত্র এবং পুরুষতন্ত্র যে ‘সাদা’কে ফেয়ার ও সুপিরিয়র বানিয়েছে, সেই সাদাকে কি আমরা ফেয়ার ও সুপিরিয়র বলে মেনে নেব? নাকি আমাদের কথায়, আমাদের চিন্তায়, আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি আচরণে এবং নারী-পুরুষের সাথে সম্পর্কে- মিথস্ক্রিয়ায় আমরা প্রকাশ করবো- ‘সাদা’কে ঘিরে ‘ফেয়ার’ ও ‘সুপিরিয়র’ ধারণার পুরোটাই আনফেয়ার ও বৈষম্যমূলক। এটি উপনিবেশবাদ, পুঁজিতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্রের তৈরি। প্রতিটি মানব সন্তান, প্রতিটি নারী-পুরুষমাত্রই বিশেষ কেউ এবং ডিগনিটিফুল, তাতে তার শরীরের রঙ যাই হোক না কেন। শরীরের রঙ প্রকৃতির একটি বৈচিত্র্যমাত্র, যা তাকে পার্থক্য করে না, অধিকন্তু বিশেষত্ব দেয়।

শেয়ার করুন:
  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
    10
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.