নারীরাই যখন নারীদের পথের অন্তরায়

নাহিদা ইয়াসমিন: আমার কর্মক্ষেত্র একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এখানে যারা কাজ করেন তারা প্রত্যেকেই আমাদের সমাজের তথাকথিত ডিগ্রীধারী। একদিন আমারই এক নারী সহকর্মী কথা প্রসংগে বললেন, কোনো এক পার্টিতে তথাকথিত খোলামেলা পোশাক পরা মেয়েকে পার্টিতে উপস্থিত কোনো ছেলে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইলে মেয়েটি তাতে বাধা দেয়। এতে ছেলেটি ক্ষিপ্ত হয়ে মেয়েটির টপস এর স্ট্রিপ টেনে ছিঁড়ে ফেলে, আর বলতে থাকে ‘অর্ধেক শরীর দেখাই রাখছো যখন তখন পুরোটা দেখাতে সমস্যা কী’।

নাহিদা ইয়াসমিন

আমি সেই সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কী মনে করেন ছেলেটা যা করেছে তা ঠিক? তিনি অত্যন্ত রুঢ় গলায় বললেন, “অবশ্যই ঠিক করেছে। মেয়েটা এমন পোশাক পরবে কেন! এসব পরে দেখেই তো ছেলেরা ঠিক থাকতে পারে না।”

দেখলাম সেই সহকর্মীর সাথে আরো অনেকেই একমত এবং এরা প্রত্যেকেই নারী। তবে বলতেই হবে সেখানে উপস্থিত হাতে গোনা দুয়েকজন এর বিরোধিতাও করেছিলেন। কিন্তু সংখ্যায় তারা খুবই কম।

আরেক সহকর্মী (তিনিও নারী) অন্য একদিন সমাজের বিভিন্ন অবক্ষয়ের কথা বলতে গিয়ে বললেন, “সমাজে কোন সমস্যাই থাকতো না যদি মানুষ পরচর্চা না করতো, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তো এবং নারীরা পর্দা করে চলতো।”
বুঝতে পারলাম, যত সমস্যা সব নারীর পোশাকেই, বলা যায় দেহেই নিহিত। এবং এই ধারণা আমাদের সমাজের অনেক নারীরাই পোষণ করেন। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ড যারা তৈরি করেন তাদের চিন্তাধারার যখন এই হাল, তখন বোঝাই যায় কী ধরনের মেরুদণ্ড তৈরি হচ্ছে।
এধরনের কথা আমরা কাঠমোল্লাদের মুখে শুনে অভ্যস্ত। কিন্তু যখন সমাজের শিক্ষিত নারীদের মুখে শুনি, তখন মনে হয়, আসলেই পুঁথিগত শিক্ষা মানুষকে কতোটা শিক্ষিত করতে পারে, আর কতোটা অমানবিক করতে পারে!
পোষাক দিয়ে একজন নারীর চরিত্রকে বিচার করা বা তার প্রতি করা লাঞ্ছনার বিচার করা কতোটা যৌক্তিক, তার থেকেও বেশি কতটা অমানবিক! যেই নারীরা নিজে একজন নারী হয়েও এধরনের ধ্যান ধারণা পোষণ করেন, তারা নিশ্চয়ই আমাদের সমাজিক রীতি অনুযায়ী শালীন। কিন্তু উনারা নিজেরাই কী বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, তাদের গোটা নারী জীবনে পথ চলতে পথে-ঘাটে বা অন্য যেকোনো ভাবেই হোক, পুরুষের বিকৃত রুচির শিকার হননি?
আমি জানি, আমরা স্বীকার করি বা না করি, এই প্রশ্নের উত্তর বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই হবে, ‘হ্যাঁ’। তাহলে কী উনাদের পোশাক উনাদের ভাষায় খোলামেলা ছিল? নারীরা তথাকথিত শালীন পোশাক বা নিজেদের আপাদমস্তক ঢেকে রাখলেই যদি সমাজের পুরুষেরা ঠিক হয়ে যেতো, তবে যেসব দেশে নারীরা নিজেদের আপাদমস্তক ঢেকে রাখে, সেইসব দেশে সামাজিক নিরাপত্তা বাহিনীর কোন দরকারই হতো না।
তবে দু:খের বিষয় হলো, এই ধরনের ধ্যানধারণা শুধু একজন দু’জন নারীর নয়, এমন ধারণা আমাদের সমাজের অনেক নারীর (পুরুষের কথা বাদই দিলাম), যারা মনে করেন নারীর লাঞ্ছনার জন্য নারী নিজেই দায়ী, যারা মনে করেন ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাকই দায়ী। ধর্ষণকারীর এতে কোনো দায় নেই, অপরাধ নেই, সে নাবালক!
কেন আমরা তেঁতুল হুজুর বা কাঠমোল্লাদের দোষ দেই, যখন আমরা নারীরাই নিজেদের বিচারবুদ্ধি খরচ করে এটুকুই বুঝি যে, সমাজের সকল অরাজকতার মূল হচ্ছে নারীর তথাকথিত বেপর্দা, নারীর তথাকথিত অশালীন পোশাক, তনুর পরিণতির জন্য তনুই দায়ী, পহেলা বৈশাখে নারীদের লাঞ্ছিত হওয়ার জন্য তাদের পোশাক দায়ী। তেঁতুল হুজুরেরা এমনি এমনি যুগের পর যুগ টিকে থাকে না, আমরাই তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করি। 
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.