শেষের কবিতা: বাঙালী নারীর পাপমুক্তি

ভানুলাল দাস: প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। ফাঁকা পেলে কেউ না কেউ উড়ে এসে জুড়ে বসেই। এমন আশংকা মনে আসতেই পারে, পুরুষের খবরদারির অবসান ঘটলে নারীর খবরদারি সেখানে জেঁকে বসবে। পুরুষের আধিপত্য শেষ হলে নারী আধিপত্য সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো পুরুষের ঘাড়ে চেপে বসবে না তো!

উপরোক্ত আশংকা অমূলক। কারণ নারীবাদীরা পুরুষের মত সম-অধিকার চায় বটে, তবে নিজেদের আধিপত্য চায় না। তারা ইতিহাসের গতির বিরুদ্ধেও নয়। যদিও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, মাতৃতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে পিতৃতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে; তথাপি সমাজ প্রগতির দিক থেকে পিতৃতন্ত্র মাতৃতন্ত্রের চেয়ে উন্নত ব্যবস্থা। তাই নারীবাদীরা পিতৃতন্ত্রের উচ্ছেদ চায় না। চায় না মাতৃতন্ত্র ফের ফিরে আসুক। তারা চায় পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের মাঝে যে অন্যায্য বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে তা দূর হোক। সমতা, ন্যায়, সুবিবেচনার নীতিতে নারীর সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হোক। এ মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নারীরা পুরষেরও সহযোগিতা চায় এবং আমরা বহু জ্ঞানী-গুনী পুরুষকে নারী অধিকার বিষয়ে সোচ্চার হতে দেখি।

ভানুলাল দাস

তার মূল কারণ, ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান এবং অন্যায়ের জায়গায় ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। আর প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজকে ন্যায্যতার উপর দাঁড় করানো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেউ কেউ নারীবিরোধী হিসেবে দেখাতে চান। বিশাল রবীন্দ্র সাহিত্য ভাণ্ডার থেকে নারী স্বার্থবিরোধী কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন বক্তব্য তুলে ধরেন তারা। এমন কতিপয় বক্তব্য হচ্ছে-

১. দুর্বলের শাসন ভয়ংকর। অবলার শাসন থেকে ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন।

২. যদি মেয়েদের স্বাধীনতা হরণ করিয়া পুরুষ জোর করিয়া তাহাদের গৃহকর্মে বন্দি করিয়া থাকে, তবে এতকাল মেয়েরা স্বাধীনতা ফিরিয়া পাওয়ার জন্য বিদ্রোহ না করিয়া ঘরকন্নার কাজ মানিয়া নিল কেন?

৩. যে পক্ষের দখলে শিকল, তা দিয়েই পাখিকে বাঁধে, অর্থাৎ জোর দিয়ে। শিকল নেই যার সে বাঁধে আফিম খাইয়ে, অর্থাৎ মায়া দিয়ে। শিকলওয়ালা বাঁধে বটে, কিন্তু ভোলায় না, আফিমওয়ালী বাঁধেও বটে ভোলায়ও। মেয়েদের কৌটো আফিমে ভরা, প্রকৃতি-শয়তানী তার জোগান দেয়।

রবী ঠাকুরের সাহিত্য উপাদেয় বলে, তার সব বাণী গ্রহণযোগ্য হবে, এমন কোন কথা নেই। যেমন আইনস্টাইনের প্রমাণবিহীন কোন কথা বা থিওরি বিজ্ঞান নয়। তেমনি ডারউইন ঈশ্বর বিশ্বাসী হলেও বিবর্তনতত্ত্ব ধর্মানুসারি হবে এমন কথা নেই।

বলা হয়ে থাকে রবীন্দ্রনাথ নারী বান্ধব ছিলেন না। তাঁর বহু কথা নারীবিরোধী এবং শেষ জীবনে কিছু বক্তব্য সংশোধনও করেছেন। এতে অবাক হবারও কিছু নেই, কারণ তিনিও তো পিতৃতন্ত্রের বাইরের মানুষ ছিলেন না। নারীবাদী দর্শনও আজকের মতো তখনকার দিনে এতো বিকাশ লাভ করেনি।

রবীন্দ্র পূর্ববর্তী রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জন স্টুয়ার্ড মিল ছিলেন নারীবান্ধব পুরুষ। হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ও ইংল্যান্ডের দার্শনিক রাসকিনকে নারীর শত্রু বলা হয়েছে।

রবী ঠাকুরের নারী বিরোধী উদ্ধৃতি অনেক জায়গায় থাকতে পারে। তবে দেখতে হবে উদ্ধৃতিটি কোথা থেকে নেয়া হয়েছে। উপন্যাস বা গল্পের পাত্রপাত্রীর কথা রবীন্দ্রনাথের কথা নাও হতে পারে। প্রবন্ধের বক্তব্য কিংবা বক্তৃতার কথা রবী ঠাকুরের নিজের কথা বলে ধরে নেয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথের নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যেমন বিতর্ক আছে, তেমনি বৃহত্তর আঙ্গিকে নারীর প্রতি রয়েছে তার বিস্তর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, যা নারীবাদীদের প্রশংসা কুড়ায়। রবী ঠাকুরের উপন্যাস ‘চোখের বালি’র নায়িকা বিনোদিনী, ‘ঘরে বাইরে’র নায়িকা বিমলা, ‘চতুরঙ্গ’ এর নায়িকা দামিনী, শেষের কবিতার নায়িকা লাবণ্য, নষ্টনীড়ের নায়িকা চারুলতা, স্ত্রীর পত্রের নায়িকা মৃনালিনী আধুনিক নারীবাদীদের আদর্শ হওয়ার যোগ্য।

আমি শেষের কবিতার আলোচনায় দেখাবো, এ অসাধারণ উপন্যাসটি কিভাবে বাঙালি নারীকে অসতীপনা ও মানসিক ভ্রষ্টাচার নামক ট্যাবু থেকে মুক্তি দিয়েছে। বলা হয়ে থাকে, চলতি ভাষা ও এখনকার যুগের নরনারীর প্রেম শেষের কবিতা উপন্যাস থেকে সহজ সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করেছে।

অমিত-লাবণ্যের প্রেম-রসায়নে আজকালকার প্রেমের বাজার সয়লাব। প্রেমের ট্রমা কাটিয়ে নর-নারী যে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে, তার দৃষ্টান্ত শেষের কবিতার নায়ক-নায়িকা অমিত ও লাবণ্য। এর আগে সাহিত্যে দেখানো হতো, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নায়ক নায়িকা বিষ খেতো, গলায় দড়ি দিত, সন্ন্যাস নিতো, বিবাগী হতো… ইত্যাদি। বিষয়টা সামাজিক চেতনায় স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধেছিল। সমাজ বাস্তবতা ছিল মেয়েদের বেলায় আরও রুঢ়-, কেউ যদি জানতো মেয়েটি আগে প্রেম-পিরীত করেছে, তা হলে সে অসতী হিসেবে চিহ্নিত হতো। সে মেয়ের বর পাওয়া যেতো না। শেষের কবিতা এ মিথ ভেঙে দেয়।

লাবণ্য শিলং-এ দীর্ঘকাল চুটিয়ে প্রেম করেছে অমিতের সঙ্গে। যোগমায়া মাসীর আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সক্রিয় সহযাগিতায়। প্রেম পরিণতি পাবার আগেই লাবণ্য প্রেমিককে ছেড়ে গেল। স্মার্ট ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত অমিত রায়কে ছেড়ে লাবণ্য বাবার প্রিয় ছাত্র আনস্মার্ট শোভন লালকে মালা পরালো। আর অমিতও ( অমিট রয়) বসে থাকলো না। সেও অতি আধুনিকা কিটিকে বিয়ে করে সংসার পাতলো। কোনো বিরহ টিরহ নেই।

মনের দিক থেকে লাবণ্য দ্বিচারিণী হয়ে থাকলো। তার মনপ্রাণ অমিতের কাছে চিরকালের জন্য রেখে এসেছে, অপরদিকে শোভন লালের কাছে তার নিত্যদিনের শয্যাসঙ্গী হয়ে থাকলো। মনে এক, বাইরে অন্য- দ্বৈতজীবন, দ্বিচারিনী। অমিত থাকলো পলিগামী বা বহুগামী মনোবৃত্তি নিয়ে। ঘর করছে একজনকে নিয়ে, মনে আছে আরেক জন। শয্যায় কেতকী, চেতনায় লাবণ্য।

অমিত রায়কে লেখা লাবণ্যের শেষ কবিতার কিছু লাইন স্মৃতি থেকে বলি:

‘তবু সে তো স্বপ্ন নয়–

সবচেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,

সে আমার প্রেম,

তারে আমি রাখিয়া এলেম

অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশ্যে…

যে আমারে দেখিবারে পায়

অসীম ক্ষমায়

ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি

এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি…

তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান–

গ্রহণ করেছ যত ঋনী তত করেছ আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়।’

লাবণ্য উপন্যাসের শেষ কবিতায় যে কথা বলেছে তা স্পষ্টতই দ্বিচারিতা। মননে আছে অমিত রায়, বাস্তব জীবনে শোভনলাল। অমিত রায়ও উপন্যাসটির এক জায়গায় বলছে, ঘড়ায় তোলা জলে স্নান করে যখন একঘেয়েমি মনে হবে তখন দীঘিতে অবগাহন করবো। “কেতকীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই, কিন্তু সে যেন ঘড়ায়-তোলা জল–প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা সে রইল দীঘি, সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।” অর্থাৎ লাবণ্যের প্রেমের স্মৃতি তর্পণ করবে। এ হচ্ছে মানসিক বহুগামিতা।

এমন চরিত্রহীন নায়ক ও ভ্রষ্টা নায়িকাকে তখন পর্যন্ত সমাজ মানতো না। তাই সাহিত্যে কেউ রূপায়ন করতো না। করলেও তা নেগেটিভভাবে আঁকা হতো। যদিও দ্বিচারিতা বরাবরই সত্য ছিল। তিরিশের দশকে নারী শিক্ষা জোরদার হয়েছিল, ব্রাহ্মধর্মের উৎসাহে মধ্যবিত্ত নারীরা ঘরের বাইরে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেছিল। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যুবক যুবতীর আগমনে নরনারীর অনুরাগের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সে সময়ে একজনের সঙ্গে প্রেম করে (মনে মনে হলেও) অন্যজনকে বিয়ে করার ঘটনাও ঘটতো। কলেজ ইউনিভার্সিটিতে সহপাঠীর সঙ্গে লটরপটর করত, কিন্তু সময় মত বাপের সুবোধ ছেলে হয়ে স্কুল-পড়ুয়া মেয়েকে বিয়ে করতে হত। মেয়েটিকেও সহপাঠীর প্রেম জলাঞ্জলি দিয়ে আরেক জনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে হত।

খুব বেশি গিরিংকেলি হলে বড় জোর ছেলেটি শরৎ চন্দ্রের শ্রীকান্তের মত বিবাগী হয়ে যেত; কিন্তু মেয়েটিকে ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক দেবদাসের পার্বতীর মত বিয়ে করে অচেনা বরের সঙ্গে ঘর করতে হত।

এমন সামাজিক পরিবেশে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণী পাপবোধে ভুগছিল। আগের সনাতন মূল্যবোধের সঙ্গে ভয়ংকর মানসিক সংঘাত চলছিল। এই ক্রাইসিসটিকে রবি ঠাকুর স্বীকৃতি দেন শেষের কবিতা উপন্যাসে। এ ভাবে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে তখনকার সমাজ বাস্তবতায় অবশ্যম্ভাবী সৃষ্ট নারীর দ্বিচারিতাকে শিল্পসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠাও দিয়েছেন সর্বপ্রথম। আধুনিক চলতি ভাষার অনুপম ব্যবহারে। এতে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারী পাপমুক্ত হয়।

পুরুষের বহুগামীতাকে সমাজ স্বীকৃতি দিত, কিন্তু নারীর জন্য এটি ছিল মহাপাপ- বিরাট ট্যাবু। এমন কি মানসিক দ্বিচারিতাও। সোশ্যাল ট্যাবুকে অতিক্রম করা বা অস্বীকার করা অসম্ভব ছিল বাঙালি নারীর। শেষের কবিতার অমিত-লাবণ্যের অভূতপূর্ব প্রেমোপখ্যান ঐ ট্যাবুকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। বাঙালি নারীর বিবাহপূর্ব মানসিক বা প্রকৃত দ্বিচারিতাকে সমাজ মেনে নেয়। ফলে নারী এমন ট্যাবুকে অতিক্রম করতে সাহস করে এবং তার পাপমুক্তি ঘটে। সেই তখন থেকে নারী যুগ যুগান্তরের এক জগদ্দল পাথরকে বুক থেকে নামাতে সক্ষম হয়।

শেষের কবিতা উপন্যাস রচনার ফলাফল- হুলস্থুল কাণ্ড। রবীন্দ্রবিরোধী তিরিশের দশকের তরুণ সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখরা গুরুদেবের নিকট আবার ফিরে আসলেন। বললেন, তুমি সেকেলে নও। তুমিই আধুনিক। আমরা যে নতুন যুগের ভাষা খুঁজে ফিরছি, এই ভাষাই সেই ভাষা। শেষের কবিতার ভাষা। এই হচ্ছে আধুনিক ফর্ম। অতএব জয় রবী ঠাকুর!

যে প্রেম ভেঙে যায়, পরিণতি পায় না, কিন্তু সুখ বা দুঃখের মধুর স্মৃতি হয়ে চেতনায় থাকে,- এর শিল্পরূপ হচ্ছে শেষের কবিতা। আর শিক্ষিত শ্রেণির নারী পুরুষ মনে মনে ভ্রষ্টাচার করতো অনেক আগে থেকে। স্বামীর কোলে বসে প্রেমিককে স্মরণ করা অথবা বউয়ের বুকে মাথা রেখে প্রেমিকাকে মানস চোখে দেখা। এমন আচরণকে স্বীকৃতি দিলো শেষের কবিতা। আর এভাবে পাপবোধ থেকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারী ও পুরুষকে মুক্তি দিল। সবাই লুফে নিল বইটি। বিপুল জনপ্রিয়তা পেল শেষের কবিতা। উপন্যাসটির অনেক অবিস্মরণীয় বাণীর একটি দিয়ে লেখাটির ইতি টানছি-

“বরের রূপ যদি কনের রূপকে ছাড়িয়ে যায়, এর চেয়ে বিশ্রী আর হয় না।”

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.