নারীর ক্যারিয়ার এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা

শামীম রুনা:

নারীর সংসার নারীর ক্যারিয়ারের জন্য বাধা কিনা এ প্রশ্ন বিশ্বের অনেক দেশের জন্য কোনো প্রশ্ন না হলেও আমাদের দেশের জন্য এটি বিশাল এক প্রশ্ন। কেননা আমাদের দেশে ঘর সংসার সন্তান প্রতিপালনের মতো কঠিন, কিন্তু অবৈতনিক কাজগুলো নারীকে একা হাতে সামলাতে হয়। এরপর সংসার সামলিয়ে কোনো নারী যদি ঘরের বাইরে ক্যারিয়ার নামক অদৃশ্য কিন্তু ব্যক্তিত্বময় বস্তুটি নিজের করে পেতে চায়, তবে নারীকে যেমন অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, তেমনি অনেক সময় এর জন্য চড়া মূল্যও দিতে হয়।

ক্যারিয়ারিস্ট কোনো নারীর সাংসারিক যেকোনো দুর্ঘটনা বা বিপদের জন্য প্রথমে নারীর ক্যারিয়ারকে দায়ী করা হয়। আর নারীর সত্ত্বাটি যেহেতু জন্মের পর থেকে নিজের গণ্ডি সম্পর্কে জেনে এসেছে, তাই খুব সহজে এই ধরনের অভিযোগ নারী মেনেও নেয়।

আমাদের দেশে আধুনিক যুগের একজন নারীর ক্যারিয়ার তৈরির পথে সবচেয়ে বড় বাধা তার সন্তান। আমাদের নারীদের নিজ কর্মস্থলে যাওয়ার সময় সন্তানের নিরাপত্তা বিষয়ক এক গাদা চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘর থেকে বেরুতে হয়। তাই দেখা যায়, অফিসে নারী কর্মীটি থাকে অন্যমনস্ক বা নিজের কাজের প্রতি উদাসীন। অফিস আওয়ারের পরে কোনো মিটিং বা পার্টি থাকলে নারী কর্মীটির ভেতরে শঙ্কার ডঙ্কা বেজে ওঠে অটোমেটিক, তার পালাই পালাই মনোভাব না অফিস পছন্দ করে, না রাত করে বাড়ি ফেরা সংসার থেকে শুরু করে পাড়া মহল্লা বা সমাজের মানুষরা পছন্দ করে। নারীর রাত করে বাড়ি ফেরা মানে চরিত্রে সমস্যা আছে। তাই সে নারীর চেয়ে কম যোগ্যতা সম্পন্ন পুরুষ যত দ্রুত ক্যারিয়ার গড়ে নিতে পারে, নারী তত সহজে পারে না।

আমার ইউরোপ বাস খুব বেশিদিনের নয়, এদের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে খুব বেশি জানা নেই। নিজের উৎসুক মনোভাব আর আমাদের দেশের নারীদের পিছিয়ে থাকা আর ইউরোপের নারীদের পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমান তালে কাজ করে যাওয়ার মানসিকতা আমাকে খুব আলোড়িত করে। কারণ জানতে গিয়ে একটু মনই খারাপ হলো, নরওয়েজিয়ান নারীদের কর্ম জীবনের সূচনা আমাদের দেশের চেয়ে খুব বেশি দিনের পুরনো নয়, ওরা কত দ্রুত এগিয়ে চলেছে আর আমাদের দেশের নারীরা এখনও সুযোগের অভাবে পিছিয়ে রয়েছে।  

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৭০ এর আগ পর্যন্ত  এদেশের নারীরা মোটামুটি গৃহিনী হয়ে ঘরের কাজ সামলাতো। বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে চাঙা করতে তখনকার সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সরকার দেশ গড়ার প্রকল্পের আওতায় নারীদের কর্মজীবী করে তোলার পদক্ষেপ নেয়। সে লক্ষ্যে কর্মজীবী নারীদের সন্তানরা থাকবে বার্ণাহাগে বা ডে-কেয়ার সেন্টারে। এই ডে-কেয়ার ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এইসব ডে-কেয়ার সেন্টার চলে নারীদের প্রদত্ত ট্যাক্স থেকে।

ডে-কেয়ারে যেনো-তেনো দু’একজন অপ্রশিক্ষিত মানুষদের দিয়ে চালানো হয় না, এখানে যারা কাজ করে তারা সবাই হাই স্কুল পাশ করার পর এই বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্স নিয়ে ইন্টার্নি করে তবে চাকুরীতে ঢুকেছে। এখানে এক থেকে পাঁচ বছরের বাচ্চাদের রাখা হয় এবং একটি শিশু পরিবারের কাছে যতো রকম এটিটিউড শিখতো, তা তো শেখায়ই, উপরন্তু একজন শিশুকে দায়িত্ব, কর্তব্য, স্বাধীনতা, পরোপকারী  এবং মানবিক হয়ে গড়ে উঠার সবরকম চর্চা করানো হয়। পাঁচ বছর বয়সে এইসব গুণ নিয়ে একজন শিশু স্কুলে পড়াশোনা করতে যায়। ফলে দেখা যায় স্কুলে সব শিশুর মনোভাব অনেকটা একই রকমের, যেন তারা একটি পরিবার থেকে এসেছে।

শামীম রুনা

যাই হোক, এইসব ডে-কেয়ার সেন্টারে শিশুকে রেখে মায়েরা নিশ্চিন্ত মনে কর্মস্থলে নিজের কাজ করতে পারে। ১৯৭০ সালে মাত্র ১৩০০০ নরওয়েজিয়ান শিশু ডে-কেয়ার সেন্টারে থাকতো, আর বর্তমানে  ২,৮০,০০০ শিশু থাকে, যা মোট শিশু সংখ্যার  ৯০%। বর্তমানের নরওয়েজিয়ান নারীর ডে রুটিনের মধ্যে সকাল এবং বিকালে দুই বেলা ডে-কেয়ার সেন্টারে যাওয়া পড়ে। নরওয়ে যদিও তেলের দেশ, কিন্তু এদেশের সরকার তেলকে তাদের প্রধান সম্পদ মনে করে না, এদেশের  কর্মজীবী নারীদের বেতন থেকে যা ট্যাক্স আসে, তাকেই প্রধান সম্পদ ধরা হয়।  

দেখা যাচ্ছে একজন নারীর স্বাবলম্বী বা ক্যারিয়ারিস্ট হওয়ার জন্য শুধু পরিবারের সহযোগিতা বা উৎসাহই যথেষ্ট নয়, পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও নারীর চলার পথ প্রশস্ত করার দায়িত্ব নিতে হবে। আর রাষ্ট্রের সহায়তায় নারী যেমন ক্যারিয়ারিস্ট হতে পারে, তেমনি একজন দায়িত্বশীল মা এবং রাষ্ট্রের সম্পদও হয়ে উঠতে পারে।  

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.