লড়াইটা একাই চালিয়ে যেতে হয়

ফেরদৌস আরা রুমী:

“অনেকের মত, আমি পুরুষবিদ্বেষী, অথবা পুরুষ মানেই আমার প্রতিপক্ষ। এখানে সংশোধন প্রয়োজন। আমি ব্যক্তি পুরুষ বিদ্বেষী নই, তবে পুরুষতন্ত্রের চরম বিরোধী। এই পুরুষতন্ত্রের বাহক যিনি বা যারা- পুরুষ বা নারী, উভয়ের বিরুদ্ধেই আমার অবস্থান।

যদিও নারী পুরুষতন্ত্রের বাহক হোন পুরুষ দ্বারা প্ররোচিত হয়ে এবং তাদের দ্বারা ক্ষমতায়িত হয়ে-যা নারী নিজে বুঝতে পারেন না অনেক সময়। আমি আমার চিন্তায় চেতনায়, চলাফেরায় মুক্ত স্বাধীন থাকতে চাই…ঠিক যেমনটা পুরুষ, আপনি থাকেন। আপনি আমার পছন্দ, অপছন্দ, চিন্তা, মত চাপিয়ে দেওয়ার কেউ না। একই সাথে আমি যা হই না কেন, যেভাবেই চলাফেরা করি না কেন…আমার সম্মতি ছাড়া আপনি আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ারও কেউ না। বি:দ্র: কেউ কোনো ধরনের অশোভন বা উস্কানিমূলক মন্তব্য করবেন না। ধন্যবাদ!” ২৯ জানুয়ারি ২০১৭।

ফেরদৌস আরা রুমী

কাল ফেইসবুকে এই পোস্ট দেওয়ার পর নানামুখি কথার মধ্যে পড়ে গেলাম। পরিচিত, অর্ধপরিচিত, অপরিচিত সবার কৌতুহলী জিজ্ঞাসা (ইনবক্সে, কমেন্টে এবং আলাপচারিতায়) হঠাৎ আমি পুরুষবিদ্বেষী হয়ে উঠলাম কেন? যেখানে স্পষ্ট করে বলে দেয়া পুরুষবিদ্বেষী নই…পুরুষতন্ত্রের বিদ্বেষী। যারা এর ধ্বজাধারী, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, তার বিরোধী।

তার সাথে ব্যক্তিগত প্রশ্ন, আমি কি বিবাহিত? এই লেখার সাথে ব্যক্তিগত এই প্রশ্নের কী উদ্দেশ্য বা সম্পর্ক? প্রশ্নকারি হয়তো ভেবে নিয়েছেন এমন লেখা যিনি লেখেন, তার নিশ্চয় ঘর-সংসার-সন্তানাদি নেই, অথবা থাকলেও তা নিশ্চয় বেশিদিন টেকেনি। অথবা ভেবে নিতে পারেন, তার স্বামীটি নিশ্চয় এই মেয়ের কাছে কিছু বলতে পারেন না। চুপচাপ সব হজম করেন।

মানুষের চিন্তার সীমাবদ্ধতা এবং পরিধি দেখার পর এই জাতীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়ারও রুচি হয় না। একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ কোন ধরনের আলাপচারিতা ছাড়া এই প্রশ্ন করা কতোটা অশোভনীয় সেই জ্ঞানবোধও এদের নেই। যে বোধ থেকে এই পোস্ট লেখা, তার জন্য লড়াই তো প্রতিটি মেয়ে জন্মের পর থেকেই করে। প্রতিটা মেয়ে তার মতো করে সে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ একটি মেয়ে জন্মের পর থেকে তার প্রতি যা যা বৈষম্য করা হয়, যা যা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তার ভেতর দিয়ে প্রতিনিয়ত যায় আর ভেতরে ভেতরে গুমরে চলে। যখন আর নিজেকে চাপিয়ে রাখতে পারে না তখন বিস্ফোরিত হয়।

বিপত্তি ঘটে তখনই যখন এই বিস্ফোরণটা ঘটে। একটা কথা আমি সবসময় বলি, প্রতিটি মেয়ে জীবন দিয়ে বোঝে তার নারী হয়ে জন্মানোর ফলে সে কতভাবে বৈষ্যমের শিকার, অত্যাচারিত কিংবা নির্যাতিত। একজন জেন্ডার সংবেদনশীল পুরুষ হয়তো বিষয়টা উপলব্ধি করেন, হয়তো সেই উপলব্ধি থেকেই আমার পোস্টে অনেক পুরুষ সমর্থন দিয়েছেন। তারপরও মেয়েদের সেই ক্ষতটা একজন মেয়ের মতো করে বোঝা সম্ভব নয়।

তবু আমরা ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই আমাদের সহযোদ্ধা ভাইদের। তারা আমাদের লড়াইটা এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়ক হিসেবে আছেন। আরেকটি বিষয় মাথায় খেলছে তারপর থেকে- যারা আমাকে প্রশ্ন করেছেন ফান করে অথবা কৌতুহল থেকে। কী আসলে তারা বুঝতে চাইলেন অথবা কি ধারণা পোষণ করতেন আমাকে নিয়ে। এক ধাক্কায় আরো বেশি পুরুষ বিদ্বেষী কেন গণ্য করলেন!

দীর্ঘদিনের বয়ে চলা পুরুষদের আধিপত্যে কি আঘাত লাগলো তাদের? আমি তো খুব সহজভাবে বুঝতে চাই এবং বলতে চাই আমার প্রাপ্য আমাকে বুঝিয়ে দাও। তুমি আমার প্রাপ্য কেড়ে নেওয়ার কেউ না। তোমার কোনকিছু তো আমি অন্যায়ভাবে কেড়ে নেইনি। কিন্তু এই প্রাপ্য ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলাটাই হয়ে পড়ে বড় অপরাধ।

অন্য মেয়েরা তো কিছু বলে না…তুমি এত ফট্ ফট্ কর কেন? যা পেয়েছো তা নিয়ে খুশি থাকো। শুধু তাই নয়, আমার এই প্রাপ্য বুঝে নেওয়ার লড়াই দেখে আমাকে আমারই পরিচিত অনেক পুরুষ হাসতে হাসতে বলেন, ‘ভাই তো নিশ্চয় বাসায় কোনো কথাই বলতে পারেন না’। হাসতে হাসতে তারা এটা বললেও তারা আসলে এটাই বিশ্বাস করেন। এখানেও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাই তাদের উপলব্ধিও এমন।

সেজন্যই আবারও বলি, লড়াইটা প্রতিটা মেয়ের একান্ত একার। সে তার অবস্থান থেকেই তার লড়াইটা চালিয়ে যায়। সেখানে অনেক কথার কচকচানি থাকে। প্রতিপক্ষ থাকে অগুনতি। একবারে ঘর থেকেই শুরু হয় প্রতিপক্ষ। পুরুষতন্ত্রের ধ্বজাধারী কারা কারা তাও চলে আসে তখন চোখের সামনে। চোখ কান মুখ বন্ধ করে আর কতদিন? সময় এসেছে বলার। তাতে চিহ্নিত হয়ে গেলেও ক্ষতি নেই।

৩০ জানুয়ারি, ২০১৭।

শেয়ার করুন:
  • 438
  •  
  •  
  •  
  •  
    438
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.