একজন গর্ভধারিনীর জীবনের ছক

ফারজানা আকসা জহুরা: অনেক আগে সমরেশ মজুমদারের একটা গল্প পড়েছিলাম “গর্ভধারিনী”। ঐ গল্পের গর্ভধারিনীর মতোন এই সমাজের নারীদেরও গর্ভধারণের জন্য পাহাড় পর্বত ডিঙ্গাতে হয়। আমাদের মতোন দেশে যারা গর্ভধারণ করেন, তারা আসলে গর্ভধারণ এর সাথে সাথে আরও অনেক কিছুই ধারণ করেন।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থার কারণে একজন গর্ভধারিনীকে গর্ভধারণ থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একটা মানসিক, শারীরিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ট্রমা বা চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

ফারজানা আকসা জহুরা

সবার প্রথম গর্ভধারিনীর উপর যে চাপটা আসে সেটা হলো, সন্তানের পিতার পরিচয়।
এর পরে থাকে, সন্তানটি ছেলে হবে না মেয়ে হবে!
তার পরে সন্তানটি কোথায় হবে!
মায়ের বাড়ি না শ্বশুর বাড়ি!

ডাক্তার ও হাসপাতাল খরচ কে দিবে!
সন্তান কোথায় হবে? হাসপাতালে না বাসায়?
বড়লোক হলে আরেক সমস্যা, সিঙ্গাপুর না ইন্ডিয়া? ইউরোপ না আমেরিকা?
বড়লোকদের এইসব দেখে মিডল ক্লাস যারা আছে, তারা তাদের বাচ্চা নামিদামি হাসপাতালে জন্ম দিতে চাই, তা না হলে তাদের মানসম্মান থাকবে না ! গরীব মানুষের বাচ্চা ঘরেই হয়, সরকারী হাসপাতালেও তাদের সেবা জুটে না।

আর এইসব সামাজিক প্রশ্নের ভিড়ে গর্ভধারিনী তার গর্ভধারণের সুখ ভুলে যায়। সামাজিক বেড়াজালে তার গর্ভধারণের খুশিগুলি হারিয়ে ফেলে …. সে হয়ে উঠে নিষ্ঠুর পাষাণ , কখনও সে তার গর্ভের সন্তানটিকে ঘরের জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে , কখনও বা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়, সে চায় মুক্তি পেতে, চায় মুছে দিতে জারজ সন্তানের কলঙ্ক। নয় মাসের এই সামাজিক তাকে যে যন্ত্রণা দিয়েছে, যতো লাঞ্ছনা করেছে, যত বঞ্চনা দিয়েছে, তার যে হিসাব মেলাতে হবে!

অনেক গর্ভধারিনী আছে, যারা সন্তান জন্ম তো দেয় ঠিকই , কিন্তু সে আর এই সমাজের কথা আর সহ্য করতে পারে না ।   তাই সে মুক্তি পেতে চায়, কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার পাপ থেকে মুক্ত হতে নিজেই হত্যা করে প্রাণপ্রিয় সন্তানকে। সেই কষ্টে মা কখনতও নিজেও মরে, কখনও আইন তাকে মারে। আসলে কখনও কি সে বেঁচে ছিল?

এইতো গেল এক ধরনের ট্রমা… বাচ্চা নিয়ে মায়েদের আরেক ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয় ..  যেমন সন্তান কালো, না ফর্সা? একটু বড় হলে লম্বা না বেঁটে? সুস্থ না অসুস্থ, না প্রতিবন্ধী, নাকি অটিস্টিক? এর পরে কোন স্কুলে পড়াবে? কয়টা টিচার দিতে হবে? কোন কোচিং সেন্টারে পাঠাবে? আর পড়াশোনায় একটু এদিক-ওদিক হলেই সমাজ ও স্বামীর কথার বাণ তো প্রস্তুত। একই সাথে আরেক শ্রেণীর ভাবীরা প্রস্তুত থাকেন তাদের বড়লোকি দেখাতে, অন্যের সন্তান ও তাদের দৈন্যদশা নিয়ে হাসাহাসি করতে। যেমন তারা কী ধরনের মোবাইল ব্যবহার করে, কোথায় থাকে, গাড়ি আছে কী নাই, জন্মদিন করে কীনা! ইত্যাদি।  

এছাড়াও আছে ১২ মাসের ১৩ অনুষ্ঠানে নিত্যনতুন  জামা, কাপড় কেনা, যেমন বিজয় দিবসে, স্বাধীনতা দিবসে লাল- সবুজ…. পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা ….একুশে ফেব্রুয়ারিতে সাদা কালো…. ঈদে মাসাককালি …..পূজায় পাখি। এইসব আলগা ফুটানি মাদের আর শান্তিতে থাকতে দেয় না। বেচারি মা, কী আর করবেন, সাধ্যের মধ্যেই সন্তানকে লালনপালন করতে গিয়ে বার বার হোঁচট  খান। এই পুঁজিবাদ সমাজ ব্যবস্থায় গর্ভধারিনী চাইলেও নিজের সন্তানকে নিজের মতোন নিজের সাধ্য মতোন মানুষ করতে পারেন না।  না চাইলেও তাকে বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হয়, তাই তো সে হতাশাগ্রস্ত হয়ে কখনও নিজেই মেরে ফেলেন নিজ সন্তানদের।

সন্তান যখন পুরোপুরি বড় হয়, তখন তো আরও গজব পড়ে গর্ভধারিনীদের উপর। সমাজ তখন প্রশ্ন করবে, তোমার গর্ভের সন্তানটি কী হলো? ডাক্তার না ইঞ্জিনিয়ার? তার কোথায় বিয়ে দিলেন? পাত্র/পাত্রীর বাড়ি আছে কিনা? কয় ভরি গহনা দিলেন? এখন তো আবার বিয়েতে কোটি টাকা খরচ না করলে মানসম্মান থাকে না! ছেলেমেয়েদের জন্য দামি পার্লার দামি রেস্টুরেন্ট, ডিজে পার্টিসহ আরও কত কী ! এগুলি না হলে যেন সুখ আসবে না তাদের সংসারে!

একজন গর্ভধারিনীকে সারাজীবন গর্ভের সন্তানটিকে নিয়ে মানসিকভাবে আঘাত করার মানুষের অভাব নাই এই সমাজের। কিন্তু মানসিকভাবে সহযোগিতা করার মানুষের বড্ড অভাব। প্রতিটা মুহূর্তে একজন গর্ভধারিনীকে তার গর্ভের সন্তানকে নিয়ে চিন্তা করতে হয়, কৈফিয়ত দিতে হয় সমাজের কাছে, স্বামীর কাছে। একমাত্র মৃত্যুই দিতে পারে তাকে ট্রমা থেকে মুক্তি ….. তাই সে জীবনের প্রতি মোড়েমোড়ে মুক্তি  চায়, চায় মরতে, চায় মেরে ফেলতে তার আদরের সন্তানকে। গর্ভধারণ অবস্থায় এমন কেউ নেই যে একবার হলেও মরে যেতে চায়নি।
আমিও চেয়েছি… বহু বহুবার ! কিন্তু পারিনি, খুব লোভী আমি, বেঁচে থাকার লোভ, কিছু পাওয়ার লোভ। চোখের সামনে ব্যর্থতা নিয়ে আমার গর্ভধারিনীকে মরতে দেখেছি। দেখেছি তিলে তিলে নিঃশেষ হতে। তার উপর আমি প্রচণ্ড একটা মানসিক চাপেও ছিলাম। আমার গর্ভের সন্তানটি যেন কোনভাবেই বাংলাদেশে না হয়, তাকে এই বিদেশেই হতে হবে!

যাই হোক গর্ভধারণ সবার জন্য সুখের নয়।
মধ্যবিত্ত পরিবারের এটা একটা দুশ্চিন্তা , যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাদের জন্য বাড়তি আয়ের চিন্তা। সারাদিন  যারা রাস্তায় কাজ করে, যারা মাটি কাটে, ইট ভাঙ্গে, তাদের জন্য কাজ চলে যাওয়ার ভয়, দুই বেলা ভাতের অভাব। যারা বাসা-বাড়িতে কাজ করে তাদের জন্য কাজ ফাঁকি দেয়ার অপবাদ। দু:খ সেইসব নাবালিকাদের জন্য, যারা না চাইতে গর্ভধারণ করেছে! যাদের কেউ নাই তাদের জন্যও এটা একটা কঠিন সময়।

অথচ একজন গর্ভধারিনীরই সারা জীবন মানসিক যত্নের প্রয়োজন হয়… প্রয়োজন হয় ভালোবাসার।

শেয়ার করুন:
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.