চলো বিদেশ থেকে ‘ফূর্তি’ করে আসি

শান্তা মারিয়া: সুলতানা ও সুপ্রিয়া দুই বান্ধবী। সুলতানা একজন ব্যবসায়ী আর সুপ্রিয়া উচ্চস্তরের চাকরিজীবী। সুলতানা একদিন সুপ্রিয়াকে বলে, খাটতে খাটতে তো ক্লান্ত হয়ে গেলাম। চল, অমুক দেশে বেড়াতে যাই। ওখানে ভিসা পাওয়া সহজ। মদ খুব সস্তা। প্রচুর হ্যান্ডসাম ইয়াং ছেলেছোকরা পাওয়া যায়। ম্যাসেজ পার্লারগুলো দারুণ। চল একটু ফূর্তি করে আসি।

যে কথা সেই কাজ। তারা দুজনে সে দেশে গেল। কয়েকটা দিন দুর্দান্তভাবে ‘এনজয়’ করলো। ফেরার পথে স্বামী ও সন্তানদের জন্য গিফট আনলো। সেই গিফট পেয়ে হাজবেন্ড ও বাচ্চারা দারুণ খুশি। হাজবেন্ড তার বন্ধুদের কাছে গিয়ে বললো, ‘জানো দুলাভাই, আমার ওয়াইফ যে কী সুন্দর সুন্দর কাপড়চোপড় আর কসমেটিকস এনেছে।’ সেসব কথা শুনে পাড়াতো দুলাভাইরা ভিতরে ভিতরে হিংসা পেলেও মুখে অনেক প্রশংসা করলো। তারাও নিজের নিজের স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললো, ‘অমুকের স্ত্রী কতো দেশবিদেশ বেড়াতে যায়, তুমি যেতে পারো না?’

শান্তা মারিয়া

ঘটনাটা কি অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে? অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে কারণ চরিত্র দুটির নাম সুলতানা ও সুপ্রিয়া। যদি নাম হয় সুলতান ও সুপ্রিয়। এবং ‘স্ত্রী’র জায়গায় ‘স্বামী’ , ‘দুলাভাইয়ে’র জায়গায় ‘ভাবী’ হয় তাহলে আর মোটেও অবাস্তব বলে মনে হবে না।

আমি অনেকবার অনেক গ্রুপের সঙ্গে বিদেশে গিয়েছি। সেখানে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখেছি গ্রুপের অনেক পুরুষ মদ ও যৌনকর্মী নিয়ে দারুণভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

যখন চীনদেশে থাকতাম, তখন বাংলাদেশ থেকে অনেক বাঙালি অনেক প্রতিষ্ঠানের হয়ে সফরে আসতেন বেইজিংয়ে। দেখতাম বাঙালি পুরুষরা রীতিমতো আদেখলার মতো আকণ্ঠ মদ গিলতেন। যেন কাঙালকে শাকের ক্ষেত দেখানো হয়েছে। আর তারা ব্যস্ত হতেন স্থানীয় কোনো নারীর সঙ্গে ফস্টিনস্টি করার জন্য, কিংবা ম্যাসেজ পার্লারে গিয়ে নারীদের স্পর্শ পাবার জন্য।

সম্প্রতি দেশের বাইরে গিয়েছিলাম একটি অনুষ্ঠানে। সেখানেও দেখলাম, সফরসঙ্গী কয়েকজন প্রৌঢ় পুরুষ যেভাবে নারী ও মদিরার পিছনে দৌড়ালেন, তা সত্যিই লজ্জাজনক। এমনকি দেশটির স্থানীয় লোকজনও তাদের নিয়ে হাসাহাসি করছিল এই বলে যে, ‘ঢাকায় কি ওরা মদ-টদ কিছু চোখে দেখতে পায় না?’ আমি তখন ওই পুরুষসঙ্গীদের বিষয়টি বলাতে তারা জবাব দিলেন ‘ফূর্তি করার জন্যই তো বিদেশে এসেছি”।

আমি বললাম, ‘যদি আপনাদের স্ত্রীরা বিদেশে গিয়ে যুবক ও মদ নিয়ে এমনধারা ফূর্তি করেন, তাহলে কি আপনারা সেটা মেনে নেবেন?’

তারা জবাব দেননি, উল্টো আমার উপর বিরূপ হয়েছেন। প্রশ্নটা তাই আমি উইমেন চ্যাপ্টারের পাঠকদের দরবারে পেশ করলাম।

বাংলাদেশের অনেক পুরুষই এখনও ঊনবিংশ শতকের ‘বাবু কালচার’ থেকে বের হতে পারেননি। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে জমিদারবাবুরা ফূর্তি বলতে বুঝাতেন বাঈজী বা যৌনকর্মী ও অজস্র মদ নিয়ে অমিতাচার। কিন্তু তারা নিজেদের স্ত্রীদের রাখতেন অসূর্যস্পশ্যা করে। স্ত্রীদের অবশ্য তারা দামী শাড়ি গয়না উপহার দিতেন এবং স্ত্রীরা তাতেই খুশি থাকতেন।

এখনও বিদেশ থেকে ‘ফূর্তি’ করে ফেরা অনেক স্বামীর স্ত্রীরা বিদেশি কাপড়চোপড়, কসমেটিকস, জুয়েলারি পেয়ে বেশ খুশিতে বাকবাকুম করে। দাঁত না পড়া পর্যন্ত বাঘ যেমন মাংস খাওয়া ছাড়ে না, তেমনি এই সব পুরুষও অক্ষম না হওয়া পর্যন্ত ‘ফূর্তি’ ছাড়তে পারে না।  বিদেশি নারীর সঙ্গে যৌনাচারকে এরা কোনো অপরাধ বলেই মনে করে না। এমনকি ওইসব নারীদের সঙ্গে স্বল্প প্রেমের অভিনয় করাকেও তারা জায়েজ বলে মনে করে। সেইসব পুরুষই আবার স্ত্রীর ফেইসবুকে ফ্রেন্ডলিস্টে কোনো অচেনা পুরুষকে দেখলে সতের রকম জেরা করতে দ্বিধা করে না।

এইসব ফূর্তিবাজদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, সেই জবাবটিও আমি আজ পাঠকের কাছ থেকেই জানতে চাই।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.