উন্নয়নের রাজনীতি এবং একটি সুন্দরবন

দিলশানা পারুল: বাজেট দুই ধরনের উন্নয়ন বাজেট এবং রাজস্ব বাজেট। রাজস্ব বাজেট নিয়ে দুর্নীতির সুযোগ নাই, এইটা ছকে বাঁধা। যা দুর্নীতি হয় সব উন্নয়ন বাজেট নিয়ে। সে যে কী টাকার খেলা আপনি- আমি হয়তো ভাবতেও পারবো না। হিসাব হয় হাজার কোটি টাকায়। বিডিং হয় কান্ট্রি টু কান্ট্রি। এবং এইসব বিডিং কান্ট্রির এই দেশে আবার এজেন্ট আছে। এজেন্ট কারা জানেন? নামিদামি শিল্পপতিরা, এমন সমস্ত নামিদামি লোক আমাদের ভাবনারও বাইরে। লবিস্ট কারা জানেন? ওই্ দেশে বাংলাদেশের যে রাষ্ট্রদূত আছে তারা যার যার দেশের পক্ষে নাকি লবিং করে। তাতে তাদের লাভ কী? প্রত্যেকেরই এইখানে পার্সেন্টেজ আছে।

ওইজন্য একেকটা প্রকল্পের দাম বাড়তে বাড়তে কোথায় গিয়ে যে ঠেকে, চিন্তাও করতে পারবেন না। এতোকিছুর পরও উন্নয়ন তো ঠিকই হচ্ছে, তাই না? হিসাব কিন্তু সহজ, কঠিন না। একটা স্তর পর্যন্ত উন্নয়ন যদি আপনি দেখাতে না পারেন, তাহলে এই লুটপাট আপনি জায়েজ করতে পারবেন না। এই লুটপাট জায়েজ করতে হলেও একটা মাত্রায় উন্নয়ন আপনাকে দেখাতে হবে।

জায়েজ করার দরকার কী? তারাই তো সর্বেসর্বা, স্রেফ লোপাট করে ফেললেই তো হয়! না, এতো সহজ না। বরাদ্দকৃত বাজেটের কাগজে কলমে হলেও খরচ দেখাতে হয়। মানে নিয়ম অনুযায়ী বাজেট বার্ন না হলে ওইখাতে পরবর্তীতে আপনি বাজেট বরাদ্দ পাবেন না। কাজেই কিছুমাত্রায় উন্নয়ন করতেই হয় পরবর্তী বাজেট নিশ্চিত করার জন্য। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্রপত্রিকার রিপোর্টে এই চিত্রই কিন্তু আমরা দেখে এসেছি।  

এবার আসেন উন্নয়ন করবো বলে সমস্ত সরকারই শুধু রাস্তাঘাটই বানায় কেন? এলাকায় উন্নয়ন বলতে বিদ্যুত সংযোগ এবং রাস্তা বানানোই বা কেন? আমাদের শিক্ষাখাতের কি উন্নয়নের প্রয়োজন নাই? আমাদের স্বাস্থ্য খাত কি বিশ্ব মানের? একবারও কি প্রশ্ন করে দেখেছেন নিজেকে? যদি তা না হয় তাহলে উন্নয়নের সংজ্ঞা আমাদের দেশে রাস্তা আর ইমারত বানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে কেন? যেখানে যতো হার্ডওয়ার সাপ্লাই যুক্ত, সেইখানে ততো পয়সা লোপাটের সূবর্ণ সুযোগ।

এছাড়া আরো একটা হিসেব এখানে আছে। ভোটের হিসাব। রাস্তা-ঘাট-ইমারত এইগুলো হলো ভিজুয়াল জিনিস। আপনি উন্নয়নের নামে যতো শোকেস করতে পারবেন, আমাদের মতো আম-জনতাকে ততো ধোঁকায় ফেলতে পারবেন। আপনার ভোটের বাক্স ততো সমৃদ্ধ হবে। এ্ হলো আমাদের উন্নয়নের রাজনৈতিক মডেল।    

এই উন্নয়ন এর মডেলে যখন আন্তর্জাতিক মহল ঢোকে, তখন ট্রেডঅফটাও আন্তর্জাতিক মাত্রা পায়। রামপালে বিদ্যুত প্রকল্প হচ্ছে এরকমই একটা উন্নয়ন প্রকল্প। আপাত অর্থে আপনার আমার কাছে মনে হতে পারে এই বিদ্যুত প্রকল্প না হলে বুঝি বাংলাদশের দক্ষিণাঞ্চল উন্নয়নের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে। জাতীয় গণমাধ্যম, জাতীয় বুদ্ধিজীবীগণ প্রচার-প্রপাগান্ডায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে এইটা ভাবতে বাধ্য করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজীম উদ্দিন খান একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় একটি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি খুব সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন এই রামপাল এবং মংলা বন্দরের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বের বিষয়টি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী “এটি সরকারের ওপরেই সব নির্ভর করছে না। পাশের দেশের হিসাব আছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জোর দেয়ার একটি কারণ হচ্ছে ব্যবসায়িক লাভ। এখানে ভারত থেকে যে কয়লা আনা হবে, তা সুন্দরবনের নদীপথে আনা হবে এবং খরচ অনেক কম হবে। এটি ভারতের ব্যবসায়ীদের লাভ। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বাগেরহাটের মংলায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভোক্তা হবে ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা। সর্বশেষ এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে চীন, ভারত এবং আমেরিকার যে প্রতিযোগিতা, সেখানে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত।

তাতে করে ধারণা অমূলক নয় যে, ভারতীয় সামরিক-কৌশলগত ইস্যু হতে পারে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর লক্ষণও আমরা দেখেছি। সুন্দরবন এলাকায় ভারত এবং বাংলাদেশের যৌথ নিরাপত্তা মহড়া হয়েছে কিছুদিন আগে। পত্রিকায় রিপোর্ট এসেছিল এ ব্যাপারে। প্রকল্প ছোট হলেও এই বিতর্কিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থানগত কারণে নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। ভবিষ্যতেই বোঝা যাবে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে।

ভারত এবং বাংলাদেশের যৌথবাহিনী যদি এখানে নিরাপত্তা দেয়, তাহলে এর গুরুত্ব অন্যরকম। ছোট কী বড় সেটা কথা নয়, ভারতীয় বাহিনীর শারীরিক উপস্থিতি অন্যকিছু নির্দেশ করবে। মনে রাখতে হবে রামপালের অতি কাছে মংলা সমুদ্র বন্দর। রামপাল থেকে বঙ্গোপসাগরও বিশেষ নজরদারিতে রাখা সম্ভব। সুতরাং এসব কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব রাখে।”

এটি গেল রামপাল প্রকল্প যে আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য যে হুমকি হতে পারে, তার বিশ্লেষণ। রামপাল যে সুন্দরবনের জন্য অনেক বড় হুমকি, এই বিষয়ে এখন আসলে আর সন্দেহ থাকার কোন অবকাশ নেই। সরকারি বৈজ্ঞানিকগণ যতই আল্ট্রা বা সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোর কথা বলুন না কেন, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদীরা এত তত্ত্ব এবং তথ্য এর বিরুদ্ধে উপস্থাপন করেছেন যে এখন সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না এইটা বলা রীতিমতো মূর্খতার পর্যায় পড়ে। কাজেই সেই বিষয়গুলো আসলে নতুন করে আর বলার প্রয়োজন পড়ে না।

এখন আসলে বিবেচ্য বিষয় একটিই, জনগণের ট্রেড অফ। আমরা আসলে কতটুকুর প্রাপ্তির জন্য কতটুকু ছাড় দেবো? মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য আসলে সুন্দরবনকে ট্রেডঅফ করবো কীনা? প্রশ্ন একটাই ।

আমার নিজের বাবা-মার বাসায় সোলার প্যানেল চলে। টিভি-ফ্রিজসহ পাঁচ কামরার একটা আধুনিক পরিবার গত এক বছর হলো চমৎকার চলছে। ৩৫ হাজার টাকায় ওয়ানটাইম ইনসটলমেন্ট। চোখ বন্ধ করে পাঁচ বছর সার্ভিস দেবে, যদিও জীবনসীমা আরো অনেক বেশি। বিদ্যুতের বিল হিসেব করলে এইটা অনেক অনেক স্স্তা। আর দক্ষিণের দাকোপসহ আমি আরো কয়েকটা ইউনিয়নের ভিতরে গেছি, এগুলো এত প্রত রিমোটে এবং জলাভূমি পার হয়ে এমনভাবে যেতে হয় যে, এইসব জায়গায় আসলে পিলার দিয়ে তার টেনে বিদ্যুত দেয়াই প্রায় অসম্ভব।

এখন তারবিহীন বিদ্যুত ব্যবস্থা দুনিয়ায় আছে কীনা আমি জানি না। কাজেই দক্ষিণে বাসাবাড়ি, বিদ্যালয়, হসপিটাল এবং স্থাপনায় সোলার প্যানেল দেয়া ওখানকার ভৌগলিক অবকাঠামোর কারণেই অনেক বেশি বাস্তব সম্মত এবং সাশ্রয়ী। টিভিতে সরকারি একটা এড চলে, দক্ষিণে বিদ্যুত না হলে কৃষক জমিতে পানি দেবে কীভাবে? আজ থেকে পাঁচ বছর আগে থেকেই সোলার ইরিগেশন সিস্টেম এই বাংলাদেশেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলছে।

দিলশানা পারুল

আমি নিজে এরকম একটা প্রকল্পে কাজ করেছি।  তরপরও ধরেন ধরে নিলাম বিদ্যুত প্রকল্প লাগবে, কারণ সোলার প্যানেলে আপনাদের পোষাবে না। রামপাল প্রকল্প কমর্সংস্থানের যোগান দিবে। বুঝলাম, কিন্তু সেইটা কতজনের? সরকার ৩০ থেকে ৪০ হাজার এর কথা বলছে, তাই তো? সেইটাও কিন্তু হাইপোথিসিস, কারণ এই কর্মসংস্থানও নির্ভর করছে কী ধরনের কারখানা সেখানে হবে, তার ওপর।

তাও ধরি যে, এই প্রকল্প হলে একসাথে ত্রিশ থেকে চল্লিশ লাখ লোকের জনজীবনের উপর তার নেগেটিভ প্রভাব পড়বে। বুড়িগঙ্গার দুষণই আমরা সামাল দিতে পারি না, সেখানে কয়লার দুষণ আমরা কেমনে সামাল দিব?

এইগুলো আসলে পুরানো কথা। অসংখ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তসহ পরিবেশবাদীরা এই কথাগুলো অসংখ্য বার বলে এসেছে। এইগুলা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নাই। এবার আপনি ট্রেডঅফ করেন সুন্দরবনের মৃত্যু হলে সিডরের মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় রাজি আছেন কিনা? আপনি এবং আপনার পরিবারের সকলে চর্ম রোগ এবং বিভিন্ন শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগবেন, রাজি আছেন কিনা? এবং এইটা একজন-দুজনের হবে বিষয়টা এমন না, গণহারে হবে।

সরকারের উন্নয়নের সংজ্ঞা এবং জনগণের উন্নয়ন এর সংজ্ঞার তফাত বোঝেন। কোন অঞ্চলের উন্নয়ন শুধু বিদ্যুত সংযোগের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হয় না, উন্নয়ন মানে ওই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত কিনা, ওই অঞ্চলে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হয়েছে কিনা, ওই অঞ্চলের আইনের শাসন নিশ্চিত হচ্ছে কিনা!

মঙ্গোলীয়ানরা পর্যন্ত আমাদের শাসন এবং শোষণ করেছে, তারা গেছে তারপর ব্রিটিশ, তারপর পাকিস্তান। জনগণ যতদিন নিজেদের লাভের জন্য ট্রেডঅফ করা না শিখবে, শুধু সুন্দরবন না, সকল অস্তিত্ব নিয়েই টানা হ্যাঁচড়া চলতে থাকবে, এই লিস্ট শুধু লম্বাই হতে থাকবে!  

শেয়ার করুন:
  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
    10
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.