শিক্ষক কৈলাশ নিগ্রহের বিচার চাই

মাসকাওয়াথ আহসান: রংপুরের ডিমলা উপজেলার খাগখড়িবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায়ী অনুষ্ঠান চলছিলো। কোন একটি ছোটো-খাটো মতবিরোধে ক্ষিপ্ত হয়ে স্কুল কমিটির সদস্য কামরুজ্জামান লিটু স্কুলের শিক্ষক কৈলাশ চন্দ্র রায়কে হল ভর্তি ছা্ত্রের সামনে প্রহার করেন।

এটি নতুন দৃশ্য নয়; এর কদিন আগে আরেকজন শিক্ষককে প্রহারের খবর এলো। তার আগে শিক্ষককে সবার সামনে কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনা সবাই জানেন। এ এমন এক সমাজ তৈরী করেছি আমরা; যেখানে নিয়মিত ছাত্ররা তাদের শিক্ষকদের প্রহৃত ও অপমানিত হতে দেখে। যে তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম সেখানে মিলের জায়গাটি হচ্ছে তিনজন শিক্ষকই সনাতন ধর্মাবলম্বী। তার মানে শিক্ষককে ইচ্ছামতো পেটানো যায়; এর ওর পা ধরে ক্ষমা চাইতে বলা হয়; কারণ এ সমাজে তাদের অবস্থান প্রান্তিক; আর শিক্ষক হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলে তো ব্যাপারটা আরো সহজ হয়ে যায়। কারণ হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান-আদিবাসী এরা বাংলাদেশ সমাজে নিত্য নির্যাতন আর উচ্ছেদের শিকার।

শিক্ষক কৈলাশ চন্দ্র রায় শিক্ষকতার কাজটি করেন ভালোবেসে। পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষাদানের পাশাপাশি ছাত্রদের সৃজনশীলতা বিকাশে সক্রিয় থাকেন। তাঁরই স্কুলে তিনি যখন তাঁর প্রিয় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় জানাচ্ছিলেন; তখন মঞ্চের ওপর আমন্ত্রিত অতিথি কামরুজ্জামান স্কুল কমিটির ম্যানেজমেন্টের সদস্য হিসেবে গ্রাম্য মাতবরি দেখাতে শিক্ষক কৈলাশকে হলভর্তি অতিথি-শিক্ষক-ছাত্রদের সামনে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। এই কুতসিত দৃশ্যটি আজকের বর্বর সমাজটির সঙ্গে খুবই মানানসই; যে সমাজ নিয়মিত বিরতিতে শিক্ষক লাঞ্ছনার নীরব দর্শক।

শিক্ষক কৈলাশের ছাত্রেরা অবশ্য প্রতিবাদ জানিয়েছিলো; কারণ তাদের কাছে শিক্ষক পিতার মতো যিনি তাদের মনের গহীনে জ্ঞানের আলো জ্বেলে তাদের দ্বিতীয় জন্ম দেন। পুলিশ অবশ্য প্রথমে সেটাকে পাত্তাই দেয়নি। সাংবাদিকের সামনে বলে দেয়, শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটেনি। একটি অনুষ্ঠানের মঞ্চে সবার সামনে যে ঘটনা ঘটলো; সেটি অস্বীকার করে “দক্ষ দেখে পক্ষ নিলো” পুলিশ। পুলিশের চোখে কালো টাকা, পেশী শক্তি, এলাকার কথিত হোমড়াচোমড়া কামরুজ্জামানই দক্ষ পক্ষ। আর শিক্ষক কৈলাশ নিঃসন্দেহে এ সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষ। তাঁর না আছে টাকা, না আছে পেশী। তাঁর আছে শিক্ষা দেবার ক্ষমতা আর প্রজ্ঞা; সেটা তো এ সমাজের প্রয়োজন নেই। এ সমাজে কামরুজ্জামানেরাই প্রয়োজনীয়।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শিক্ষক কৈলাশ উপলব্ধি করেন, শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে অপমানজনক ঘটনাটি ঘটে গেলো । আবার তিনি হিন্দু মানুষ; মুসলমান সংখ্যাগুরুর দেশে কে আর তিনি; যে জন্ম আজন্ম পাপ; যে জীবন সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে কষ্টেসৃষ্টে বেঁচে থাকার; যে কোন মুহূর্তে একজন কামরুজ্জামান সারাজীবনের অর্জিত সামান্য সম্মান কেড়ে নিতে পারে সবার সামনে; এমনকী আরো বেশী কিছু হতে পারে।

মাসকাওয়াথ আহসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

যেটা ঘটেছেও। মূলধারার মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ অপরাধী কামরুজ্জামানকে গ্রেফতার করে। অমনি কৈলাশ চন্দ্র রায়ের পুরো পরিবারটি পড়ে যায় আরো নিরাপত্তাহীনতার শংকার মাঝে। গ্রামের এক আধা মাতবর গ্রেফতার হয়ে গেলে তার পোষা ক্যাডারেরা ও সাচ্চা মুসলমান অন্য মাতবরেরা তো ক্ষিপ্ত হবেই। কারণ নিয়মিত একে-ওকে রোয়াব দেখিয়ে মারপিট করে বেড়ানোর অভ্যাস তাদের। সেইখানে একজন “সামান্য” শিক্ষককে পেটালে যে গ্রেফতার হতে হয়; এতো তাদের অভিজ্ঞতায় নেই। তার মানে তারা নিয়মিত অন্যায় করবে; তাদের বিচার চাওয়া যাবে না; এটাই যে বিচারহীনতার চলমান অপ-সংস্কৃতি।

তাহলে এমনই কী হবে বাংলাদেশ সমাজ; যেখানে শিক্ষকের মর্যাদা থাকবে না আর হিন্দু হলে সে মর্যাদাহানি ঘটবে প্রতিদিন। কোন ঘটনারই বিচার হবে না। শিশু-কিশোরেরা নিয়মিত চোখের সামনে তাদের শিক্ষককে লাঞ্ছিত হতে দেখবে মাতবর প্রকৃতির লোকদের হাতে।

এই শিশুরা তাদের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে কখনোই আর শিক্ষা বা শিক্ষকতা মানসিকভাবে গ্রহণ হতে চাইবে না। তারা বড় হয়ে শিক্ষক কৈলাস না হয়ে মাতবর কামরুজ্জামান হতে চাইবে। এইভাবে সমাজ আসলে কামরুজ্জামানদের তৈরী করে। হাতে দুটো পয়সা হলে, শরীরে একটু চর্বি জমলে তখন অধিকতর সম্ভ্রমের দাবিতে কোনো স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হয়ে গলায় পাউডার মেখে, সেজেগুজে ভুঁড়ি এলিয়ে স্কুলের অনুষ্ঠানের সামনের সারিতে বসে থাকে; আশা করে মঞ্চে উঠতে; সবাইকে দেখিয়ে দেয় সে বিরাট একটা কিছু হয়েছে; এইখানে স্কুল শিক্ষকেরা, তারা আবার কারা, তাদের কী টেকাটুকা আছে, তাদের কী পোষ্য ক্যাডার আছে! শিক্ষককে বিনা প্রতিবাদে মেনে নিতে হয় স্কুলে বহিরাগত মাস্তান কামরুজ্জামানদের সমস্ত অন্যায় আদেশ।

মাস্তানঘন এই বাংলাদেশে চারপাশের বাতিগুলো এইভাবে প্রতিদিন নিভে যায়; সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে যায়। কোন অন্যায়ই যেন আর কাউকে স্পর্শ করে না; কারো বিবেকের দরজায় টোকা দেয়না।

শিক্ষক কৈলাশ এবং তার নিরাপত্তাহীন পরিবার আজকের শ্বাপদ-সংকুল বাংলাদেশের অসহায় জনগোষ্ঠীর প্রতীক যেন। রংপুরের প্রশাসন-পুলিশ-জনসমাজে যে “মানুষেরা” এখনও অবশিষ্ট আছেন; তাদের কাছে একান্ত অনুরোধ; অপরাধী কামরুজ্জামানের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি নিশ্চিত করুন; যাতে ভবিষ্যতে আর কোন মাস্তান শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার সাহস না পায়।

বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার আলো নেভাতে সক্রিয় বর্বর লোকগুলোর উদ্ধত হাতগুলো ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হোক; যাতে অপরাধী গোষ্ঠীর তৈরী করা অন্ধকারে নিমজ্জিত না হয় প্রিয় স্বদেশ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.