ওরাও মানুষ, তবে পুলিশ মানুষ

শারমিন জান্নাত ভুট্টো: সাংবাদিককে পুলিশ পেটাচ্ছে আর সেই খবর পত্রিকা ও টিভি নিউজে দেখার পরও এখন পর্যন্ত সাংবাদিক সংগঠনগুলো থেকে কোন ধরনের বিবৃতি পাওয়া যায়নি।

এতো বড় বড় আর বাঘা বাঘা সাংবাদিক নেতারা কোথায় তা খুব জানতে মন চায়। অনেক শ্রদ্ধার সাথে তাদের স্মরণ করছি। সাংবাদিক ফেডারেশন, সমিতি কিংবা ইউনিয়নের নির্বাচনের সময় কিন্তু এ নেতারাই জুনিয়র সাংবাদিকদের দ্বারে দ্বারে ঘোরেন ভোটের আশায়। কী সকাল, বিকেল বা রাত সবসময়ই পাওয়া যায় তাদের টেক্সট, নয়তো ফোনকল আর নেয়া হয় খোঁজ-খবর, যাতে করে দিনশেষে ভোটটা তাদের ঝুলিতে পড়ে। হয়তো এখন তাদেরকে না পাওয়া গেলেও প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন কিংবা কোনো না কোনো টকশোতে তাদের আবার দেখতে পাওয়া যাবে। এবং সেখানে তারা এই পুলিশ নির্যাতন  বিষয়ে মনে হয় না কেউ কথা বলবেন। দিনশেষে সবাই নিজের কাছাটা সামলাতেই ব্যস্ত থাকেন। মাখন খাওয়া লোকজনের আসলেই অভাব নেই।

এই তো গেলো সাংবাদিক নেতাদের কথা। এবার আসি আমাদের স্বনামধন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা। যিনি কিনা বলেছেন, পুলিশ সাংবাদিকদের ওপর কোন ধরনের নির্যাতন করেনি, শুধুই একটু ধাক্কাধাক্কি লেগেছে যা কিনা স্বাভাবিক।

তাই নাকি মন্ত্রী সাহেব!!! আপনার চোখের জ্যোতি কবে থেকে কমলো আর কানে কবে থেকে খাটো হলেন বুঝলাম না। তবে আপনি কোনদিন ক্ষমতা থেকে নামলে আপনার সাথে পুলিশের একটু ধাক্কাধাক্কি দেখার খায়েশ প্রকাশ করলাম। সাগর-রুনী হত্যার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে অপরাধীকে খুঁজে বের করা হবে।৪৮ মাস পার হয়ে যাচ্ছে তারপরও কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুঁজে বের করতে পেরেছে তাদেরকে? আমরা আসলে কিছু পারি আর না পারি তবে ঠাসা ঠাসা বুলি ঠিকই আওড়ানোর লোকের অভাব নেই।

যেভাবে সাংবাদিকদের পেটানো হচ্ছে তাতে করে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে কবে আর কখন নিজের ওপরও একইভাবে বজ্রপাতটা পড়ে। স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে যোগসাজোশ করে সাওতাল পল্লীতে যেভাবে পুলিশ আগুন দিলো তারপরও তো কেউ পুলিশের এমন নিষ্ঠুর আর অমানবিক কাজের কোন নিন্দা পর্যন্ত করা হয়নি আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কিংবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। এমনকি এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা ও সময় টেলিভিশনের নিউজ প্রেজেন্টার রাব্বির ওপর নির্যাতন চালায় মোহাম্মদ থানার এসআই মাসুম। অথচ সেই রকম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরই ব্যবস্থা করা হয়নি পুলিশী নির্যাতনের ঘটনার পর। এভাবে কেনো পুলিশের তরফদারি করা হচ্ছে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তা তো আর বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই।

সাংবাদিক পেটানোর পরও কিভাবে পুলিশ এখন তাদের স্ব স্ব স্থানে বহাল আছে তা নিয়ে এখন আর অবাক হচ্ছি না। বরঞ্চ নিজেদের জাত ভাইদের পেটানোর পর সাংবাদিক সমিতি আর ইউনিয়ন থেকে কোন পদক্ষেপ না দেখতে পাওয়াই যারপরানাই হতাশ। পুলিশ সপ্তাহ কিংবা র‌্যাবের বর্ষপূর্তিতে সাংবাদিক কিংবা সেলিব্রেটির দেখা মিললে, এ ঘটনায় সবাই কেমন যেনো অদৃশ্য অবস্থান ধারণ করে আছে। অবশ্য সবারই তো ঘাড়ে একটি মাথা আর অনেক অজানা কাজেই তো পুলিশের সহায়তা দরকার হয় উপরের মহলের তাই বোধহয় সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে সবাই মুখে কলুপ এঁটেছে।

দিন যা এসেছে তাতে অবশ্য বলাই চলে ওরা মানুষ নয়, ওরা পুলিশ মানুষ। এই পুলিশ মানুষগুলোর মাঝে দয়া-মায়ার বেশ তারতম্য দেখা যায় সাধারণ মানুষের থেকে। তবে শের আলী যে কিনা মানুষ পুলিশ, যার হৃদয় কম্পিত হয় দুর্ঘটনায় কবলিত বাস থেকে উদ্ধার করা ছোট্ট একটি শিশুর মুখে আব্বা শব্দ শুনে, আমরা সেই রকম মানুষ পুলিশ চাই আমাদের মাঝে। যারা নিরপরাধ মানুষকে নির্যাতন-অত্যাচার নয় বরঞ্চ এগিয়ে আসবে উদ্ধারে, বাড়িয়ে দেবে সাহায্যের হাত।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.