আমাদের বদহজম সারবে কী দিয়ে?

অনীলা পারভীন: সদ্য স্বদেশ বেড়িয়ে এলাম। এবার দেশে গিয়ে আমার মধ্যে যে উপলব্ধি হলো, বাংলাদেশের মানুষের অনেক বিষয়েই বদহজম হয়ে যাচ্ছে। খাবারে যেমন ভেজাল খাচ্ছে, তেমনি বিদেশী সংস্কৃতি থেকে শুধু খারাপটাই গোগ্রাসে গ্রহণ করছে। অবহেলিত থেকে যাচ্ছে বিদেশের ভালো দিকগুলো, সুস্থ চর্চাগুলো।

যেমন, Young Generation নাকি Gamer হয়ে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে তাদের বিভিন্ন গ্রুপ আছে. সেই গ্রুপে গ্রুপে তর্কাতর্কি হয়ে একে অন্যকে খুনও করে ফেলছে. বাহ্! কী দারুণ স্মার্ট ছেলেপেলে! গল্পের বই পড়া কী জিনিস তা এরা জানছেও না। যারা একসময় বই পড়তো, তারাও সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর হয়ে পড়ছে।

অনীলা পারভীন

আজিজ সুপার মার্কেটে গিয়ে অনুভব করলাম ওটা জামা-কাপড়ের মার্কেট হতে আর বেশি দেরি নাই। আফসোস! আগে একেকটা বয়সের একেকটা নাম ছিল, শৈশব, কৈশোর, যৌবন… এখন যেন তা কোথায় উবে গেছে! ১১/১২ বছর বয়সেই ওরা যেন যৌবনে পৌঁছে যাচ্ছে। বয়সের যে সরলতা তা মোটেও চোখে পড়ে না ছেলেমেয়েদের মধ্যে। ওরা অল্পবয়সী সরলতাকে হাস্যকর মনে করে। নিজেকে বড় প্রমাণ করতেই যেন ওরা ব্যস্ত।

অথচ ওয়েস্টার্ন দেশগুলিতে এমনটা দেখা যায় না। এরাও বয়সের তুলনায় বড় হয়ে যায়, কিন্তু এরা দুইয়ের মধ্যে ব্যালান্স করে চলতে জানে। এখানে Young ছেলেমেয়েরা যেমন টেকনোলজি ব্যবহার করছে, তেমনি বই পড়ার অভ্যাসও ধরে রেখেছে। তাই তো এখনও এদেশের লাইব্রেরিগুলোতে স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের ভিড় দেখা যায়। এখানকার ট্রেন-বাসে দেখা যায় মানুষ বই পড়ে যাত্রার সময়টুকু পার করছে।

এরপর আসি সিনিয়র গ্রুপে। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বা হোমরাচোমরা বিভিন্ন পেশার চাকরিজীবী- তাদের নাকি আজকাল এক/দুইজন গার্লফ্রেন্ড/বয়ফ্রেন্ড থাকতে হয়। না হলে নাকি সমাজে status থাকে না। বাসায় স্বামী/স্ত্রীর মাঝে কোনো ঝামেলা কিন্তু নাই। পরকীয়া করা স্বামীরা তাদের স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামীসেবা নিতেও পিছপা হন না। আবার পরকীয়া করা স্ত্রীরাও স্বামী-সন্তান নিয়ে দিব্যি আছে। তাদের Status রক্ষার্থে Part time friend প্রয়োজন হয়। Its just a fun। একঘেয়েমি কাটানো, আহা বেশ বেশ বেশ, কী চমৎকার!

এরা জানে না এসব কুঅভ্যাস কিভাবে তাদের সন্তানদের জীবনে কুপ্রভাব ফেলছে। এসব কুকর্মের কথা তাদের স্ত্রীরা বা স্বামীরা হয়তো জানেই না। আবার কেউ কেউ হয়তো জেনেও লোকলজ্জার ভয়ে মুখ বন্ধ রাখে। আমরা মনে করি ওয়েস্টার্ন দেশ মানেই সম্পর্ক ধরা আর ছাড়ার দেশ। অথচ আমরা এটা জানি না যে এই ধরা- ছাড়ার মধ্যেও সততা আছে।

সেটা কেমন? কারো যদি একটা সম্পর্ক থাকার পাশাপাশি আরেকজনকে ভালো লেগে যায়, তাহলে প্রথম সম্পর্ক ওরা Continue করবে না। বিয়ে বহির্ভুত সম্পর্ক হলেও সেটা স্ত্রী বা স্বামী স্বীকার করে সরে দাঁড়াবে। সহজে কেউ কারো সাথে ভণ্ডামি, মিথ্যাচার করে না। নিশ্চয়ই ব্যতিক্রমও আছে, তবে তা সংখ্যায় কম। আমাদের দেশের পুরুষ বা নারীর সত্যকে মোকাবেলা করার সেই সৎ সাহস নাই। কিন্তু লুকিয়ে প্রেম করার সাধ আছে ষোল আনা।

আমাদের সমাজের একটা গোষ্ঠী ওয়েস্টার্ন সোসাইটিকে ফলো করতে গিয়ে পোশাক পরিচ্ছদে অতিরিক্ত খোলামেলা হয়ে যাচ্ছে। বাংলা বলছে ইংরেজি টানে; অন্যদিকে কেউ আবার ধর্মের জন্য বাঙালি থেকে এরাবিক/লেবানিজ বা ইন্দোনেশিয়ান বোনে যাচ্ছে দিনে দিনে। তারা আবার বাংলার মধ্যে আরবি মিশিয়ে দিচ্ছে হরহামেশা। শাড়ী পরা মেয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আর কিছুদিন পর বাঙালি সাজে মেয়েদের দেখা পাওয়া দুর্লভ হবে এটা নিশ্চিত। দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালিত্ব। বিলুপ্ত হচ্ছে আমাদের নিজস্বতা, এই বদহজম অবস্থা দূর হবে কীভাবে?

একমাত্র বিশ্বজগৎ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানই পারে এটা দূর করতে, কিন্তু জ্ঞানটা অর্জন করবে কে? কে আবালবৃদ্ধবনিতাকে সঠিক জ্ঞানের সন্ধান দেবে? আমি এর উত্তর খুঁজে পাই না. আপনাদের কাছে কি উত্তর আছে? 

অনীলা পারভীন, সরকারি কর্মকর্তা, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

শেয়ার করুন:
  • 120
  •  
  •  
  •  
  •  
    120
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.