নারীবারুদের স্ফুলিংগ থেকেই পুরুষতন্ত্র জ্বালাতে হবে

কাজল দাস: কোনো মেয়ে মিছিলে পড়ে মার খেলে বাঙালী সমাজ সহজে মেনে নিতে পারে, কিন্তু কোনো এক মেয়ে মিছিল করার সময়  সিগারেট খেয়েছেন, সেটা সমাজ আর মানতে পারছেন না। কী এক দুর্বোধ্য সমাজ!

আমাদের গোটা বাংলা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি টুএক্স টাইপ মুভিতে কদিন আগে পর্যন্তও সয়লাব ছিল, এটা আমরা দিব্যি মেনে নিয়েছি; কিন্তু রাস্তায় কোনো মেয়ে স্লিভলেস পরে ঘুরলেই জাত চলে যাচ্ছে আমাদের।

কাজল দাস

দেশের অনেক নারী আরবদের দেশে গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, অনেকে গর্ভবতী হয়েও ফিরেছেন, বাঙালী সমাজের এতে জাত যায়নি, জাত যাবে কেবল এই নারী দেশে তার ইচ্ছামতো যদি কাজ করে স্বামী ছাড়া একা থাকতে চাইতো।

এই সমাজের নারীদের নিয়ে ধারণার ব্যাপারে একটা ব্যাপক পরিবর্তন আসা দরকার। কিন্তু তা হচ্ছে না। যৌনতা একটি ব্যক্তিগত ধারণা এবং এটি একজন ব্যক্তির সম্পূর্ণ নিজের স্বাধীনতার বিষয়, কিন্তু এই সমাজে এই ধারণা খুবই গৌণ। অপ্রতিষ্ঠিত। বা নাই বললেই চলে।

নারীর সমস্ত কিছু নেয়ার ব্যাপারে এই সমাজের একটা ফ্রেম করা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে গত হাজার বছরে, আমরা এর থেকে বের হতে পারিনি; কিন্তু ইউরোপীয় সমাজ অনেক আগেই পেরেছে। আজ যদি এই মেয়ে ইউরোপের কোনো দেশের হতেন, সেটা সেখানকার পুরুষদের জন্য কোনদিনই সমালোচনা করার বিষয় হতো না; কিন্তু আমাদের এই প্রাচ্য সমাজে এটা নিয়ে হুলুস্থুল বেঁধে যায়।

আমি মনে করি নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও তার মর্যাদার প্রশ্নে পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ এখন পর্যন্ত খুবই এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ। আমাদের সমাজে এটা হুবহু প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

কিন্তু বলে-কয়ে আসলে কিছু প্রতিষ্ঠা করা যায় না,  মূল্যবোধ জোর করে প্রতিষ্ঠার ব্যাপারও না, এটা গড়ে উঠে উঠে ধীরে ধীরে। এটা সংস্কৃতি। কিন্তু এটাকে তৈরির জন্য ইউরোপের নারীরা যে পরিমাণ কড়া জবাবে ফাইট করেছে, সেটা করা ছাড়া আমরাও ঐ জায়গায় দাঁড়াতে পারাটা সঠিক কোনো ভাবনা না আদতে।

আমাদের নারীদেরও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে আরেকটা জেহাদ করা দরকার। প্রয়োজন হলে,  তাদেরও বলতে হবে, বাচ্চা নেবো না, এটা আমার ব্যাপার। আমার শরীর আমার। আই এ্যাম গার্ল বাট নট ওনলি ফর মেন। সন্তান আমার। এইসব ধারণা নিছক কোনো মুখরোচক কথা বা ম্যাক্সিম নয়। এগুলোকে বলে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারী বারুদের স্ফুলিংগ। আমাদের প্রাচ্য সমাজেও এটা জ্বালাতে হবে।

একাত্তরের স্বাধীনতা যদি এমনি এমনি না আসে, তাহলে নারীদের স্বাধীনতাই বা কেন এতো সহজে চলে আসবে? এর জন্যও লড়াই দরকার। লড়াই। সোজা কথা নারী স্বাধীনতার জন্য ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আরেকটা লড়াই। লড়াই করেই ছিনিয়ে আনতে হবে সেই স্বাধীনতা।

সেই স্বাধীন মূল্যবোধই তখন নির্ধারণ করে দেবে যে, মিছিলে যদি নারী যেতে পারে, তাহলে সে  মিছিলে গিয়ে সিগারেটও খেতে পারে। এতে দোষের কিছু নাই। দোষ যদি হয়ই, তবে তা সিগারেটের। সিগারেট খাওয়া নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। আলাদা করে একা নারীর বদনাম হবে কেন? এই যে নারীকে ঘিরে এতো এতো সব কলংকের সমাহার, এসব দোষ তাড়ানোর জন্য নারীবারুদের স্ফুলিংগ যে আমরা কবে জ্বালাবো!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.