আমাদের এককালের নারীবাদী বন্ধুরা!

মারজিয়া প্রভা: আমি যখন এই লেখাটি লিখছি, তার মাত্র দুইদিন আগের এক সন্ধ্যায় আমার এক বন্ধু আমাকে শফি হুজুরের তেঁতুলের পক্ষে সাফাই গিয়ে বলেছে, “শফি হুজুর ঠিক”।

আমার শিক্ষিত বন্ধু, শহরের নামকরা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া এক বন্ধু বলেছে, তারও শফি হুজুরের মতো মেয়েরা উগ্র থাকলে তার লালা ঝরে। তার খেয়ে দিতে ইচ্ছে করে। আমি চোখে চোখ রেখে বললাম, “আমার প্রতিও কি এই ধারণা হয়? আমিও তো উগ্র থাকি তোমার ভাষায়”।

মারজিয়া প্রভা

সে হেসে বললো, “না তোমাকে দেখতে দেখতে সয়ে গেছে”। আমি আরও হেসে বললাম, “না এখানে সয়ে যাওয়ার কিছু নেই। দেখো, নারী পুরুষের প্রতি কামনা অনুভব করবে, এটা খুবই সত্য এবং স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। Desire আর vulgarism  দুইটা আলাদা জিনিস। আমরা দুটো এক করে কেউ প্রকাশ্যে ধর্ষক হই, কেউ গোপনে”।

শিক্ষা আমাদেরকে শফি হুজুর থেকে মুক্তি দেয়নি। ঠিক যেমন দেয়নি এই শহরে গলি-ঘুপচিতে ঘুরে বেড়ানো বহু বিকৃত মানুষের কাছে। যাদের একজন আমার কোমরে চিমটি কেটে পালিয়ে গিয়ে সুখ পায়। ঠিক যেমন, এখনো সৌদি থেকে ১৫০ জন গৃহকর্মী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ফেরত আসে, এখনো আন্দোলনে নারীর সিগারেট খাওয়া নিয়ে লোকে চোখ টাটায়। এখনো ফি বছরে দেড়শোরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়।

আমাদের শরীর আজও এই শিক্ষিত সমাজ, প্রগতিশীল সমাজ কিংবা মুক্তমনার আধিক্য সমাজে সেক্স অবজেক্ট। এই কথা যত বার বার বলি, ততবারই সত্য।

তাই  বারবার বলে বিরক্তির সৃষ্টি হলেও, সমাজ বদলায় না। কারণ এখনো শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ আমার ঐ বন্ধুর মতোই ভাবে। নারী মাত্রই তেঁতুল।

আমার প্রগতিশীল বন্ধুরা, যাদের অনেকেই নাস্তিকতা নিয়ে অনলাইন প্লাটফর্মে লড়াই করেছেন।  সরকারের কোপে ছিলেন। যাদের অনেকের লেখা অনেক মানুষকে ঘুম ভাঙিয়েছে, যারা এককালে নিজেরাও মনে করতো, তারা নারীবাদী। তারা অনেকেই আজ নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের ফ্রাস্ট্রেশনকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের নারীবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই লড়াইকে তারা “কিটি পার্টি” বলছে। অনলাইন প্লাটফর্ম উইমেন চ্যাপ্টারকে বিদ্রুপ করে ‘কিটি চ্যাপ্টার’ বলছে। কেউ আবার এককাঠি সরেস হয়ে ‘মেন’স চ্যাপ্টার’ নামে একটি ফান পেইজই খুলে ফেলেছে। নারীবাদ কোনো ফান বিষয় না, এটা তাদের কে বোঝাবে?

ধরুন কোনো অশিক্ষিত মানুষ যদি এসে বলে, “মাইয়ার বিয়ে হয় না, সুন্দরী না, তাই মাইয়া এইসব ফেমিনিস্টগিরি মারায়”। বিশ্বাস করুন আমার মেনে নিতে এতোটুকু কষ্ট হবে না।

কিন্তু সেটা যদি প্রগতিশীল বন্ধু লিখে, তার মধ্যে আমি শহরে ঘুরে বাড়ানো সেই বিকৃত মানুষকেই খুঁজে পাবো।

নারীবাদ কি ব্যক্তিগত জ্বালাপোড়ার হাতিয়ার?

আমরা যারা এই জীবনটা দিয়ে দিচ্ছি, যে সুপ্রীতিদি (উইমেন চ্যাপ্টারের সম্পাদক) তার জীবনের সমস্ত অভাব- না পাওয়াকে থোরাই কেয়ার করে নারীদের জন্য প্লাটফর্ম তৈরি করে যাচ্ছে, এই সবগুলোই কি ছেলেখেলা? যারা এককালে আমাদের কাঁধে কাধ মিলিয়েছে, আজ তারাই আমাদের লড়াইটাকে উপহাস করছে শুধু নিজেদের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া মিটলো না বলে? এর  দায় কি আমাদের? তাদের জন্য গোটা নারীবাদ ভুল? তাদের জন্য নারীবাদীদের আয়োজন একটা ফালতু বিষয়?

অনেকদিন দেখছি, আজ সত্যটা বুঝলাম। যতোই আমি নারীবাদী পুরুষ খুঁজে বেড়াই ( সবাই না, প্রিয় মানুষের দলটাই ভারী) তারা সবাই কোথাও না কোথাও একটা স্বাধীনচেতা নারীর স্বপ্ন দেখতো। সেটুকুও তাদের আদর্শ মেনে বুঝে!  কিন্তু যেই তাদের আদর্শকে থোড়াই কেয়ার করে, তাদের ছেড়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, তখনই তাদের আঁতে ঘা লাগা শুরু করলো। সত্যিকার মুখোশ বের হতে লাগলো।

যারা ধর্মকে পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেম ভেবে এর বিরুদ্ধে থাকে, তারাই আবার আদর্শিকভাবে পুরুষতান্ত্রিকতাকে বহন করে।

আমাদের নারীবাদী বন্ধুরা আমাদের সাথে আর নেই। আমাদের ওরা আর নিতে পারছে না। ওদের সমস্ত ফ্রাসট্রেশনের জ্বালা হচ্ছে আমাদের নারীবাদীরা অনেক নারীকে কথা বলতে শিখিয়েছে, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। যে স্বপ্নটা ওরা ওদের মতো করে বুনতে চেয়েছিল।

যাকগে, শেষ করি একটি গল্প বলে। এক প্রগতিশীল বন্ধুর উইমেন চ্যাপ্টার নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়া পোস্টে একজন নারী কমেন্ট করেছিল, “স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই সংসারের জন্য স্যাক্রিফাইস করতে হয়। নারীরা যদি একটু বেশি করে, সমস্যা কোথায়! কিন্তু নারীবাদীরা তো এইটা মেনে নিতেই চায় না”।

ঐ কমেন্টে লাইকের পসরা বসে গেল।

নারীবাদীরা নারীদের মুক্তির স্বপ্ন দেখায়! এখন কথা হচ্ছে, এই মুক্তির ব্যাপারটা কজন বোঝে? চিরকাল কেউ পায়ে পড়ে মুক্তি পায়, কেউ পায়ে দাঁড়িয়ে থেকে।    

আমাদের এককালের নারীবাদী বন্ধুগুলো ভালো থাকুক!  

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.