আমার আত্মহনন

তাসলিমা আক্তার: আত্মার মৃত্যুর সাথে শরীরের যোগ থাকতেই হবে এমন কোন নিয়ম নেই। এই যে আমার প্রতিনিয়ত মরণ, কিন্তs আমি ঠিকই দৃশ্যমান। আপনি অথবা আপনারা আমায় দেখে দেখে মনে করেন, এইতো এই-মেয়েটি দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে, গুনগুন গাচ্ছে, চমৎকার সব ছবি ছাপছে, এটা সেটা লিখছে-মেয়েটি দিব্যি বেঁচে বর্তে আছে।

আহা!! অথচ আমার “আমি”কে আমি রোজদিন কতবার হত্যা করি, তার খবর আমি ছাড়া কে জানে? আমাদের বেঁচে থাকা মানুষগুলোর স্বভাব এই – গেলো দিনগুলোকে মনে না রাখা। কিংবা বড়জোড় উৎসব-পার্বনে মনে করে করে গলা ধরে মার্সিয়া অথবা রোদন করা। উৎসব এখানে মৃত্যুর নামে বলছি।

তাসলিমা আক্তার

মাস কয়েক আগে আক্তার জাহান জলির আত্মহননের কষ্টে সামিল হয়েছিলাম আমি তুমি আমরা। তাঁর ঘরের মেলামাইন খাবার বাসন, তাঁর পরনের তাঁতের শাড়ি, তাঁর ব্যাক পেইন, তাঁর চোখের মায়া এবং গায়ের কালো রং। আমরা মেয়েটির শরীর ছাড়াও তাঁকে চিঁড়েছি, রক্তাক্ত করেছি, কেটেকুটে বিখণ্ডিত করেছি। আবার আমরাই জুড়ে দিয়েছি। কিছুদিন এমন করে করে হা-পিত্যেশ। তারপর ক্যোঁৎ করে গিলে ফেলেছি তাঁর কষ্ট, তাঁর মন এবং শরীর। আমরা তাঁর শরীরী মৃত্যুর খবর জানার অনেক আগেই হয়তো তাঁর আত্মার মৃত্যুর সমাধান হয়েছে। কখনো খোঁজ নেয়া হয়নি, হয় না।

অন্ধ এবং বধীর মানুষ আমরা, সবকিছুতেই শরীর খোঁজার স্বভাব। আজকাল খুব জমকালো করে লেখা হচ্ছে, পার্টনারের সাথে সুখে থাকার নিয়মগুলো। খুব ভালো লাগে গুড পেরেন্টিংয়ের কথা জানতে। আমি পড়ে পড়ে জেনেছি, একজন ভালো মা-ই পারে সন্তানের ভালো বন্ধু হতে। আমি আহা আহা করে এসব লেখা পড়ি। হৃয়ংগম করার চেষ্টা করি। আমি সাফল্যের জোয়ারেও গা ভাসাতে চাই। কী করে জীবনে সফল হতে হয় জানতে আমি গুগল করি, গুণীজনের পদাংকে পা রাখি। আমি হন্যে হয়ে উঠি ভালো পার্টনার হতে, ভালো কর্মী হতে, ভালো মা হতে।

শুধু হন্যে হই না “আমি” হতে। তথ্য উপাত্ত বলে, একজন ভালো কর্মী অফিসের আট ঘন্টা সময়ের বাইরেও কাজ করে। অফিসেই বসে থাকতে হবে এমন কথা নেই। ঘরে বসেও কাজ করা যায়। হ্যাঁ, আসলেও যায়। কিন্তু ঐযে, পার্টনারশিপে ভালো হতে হলে স্বামীকে সময় দিতে হবে, তার কী হবে!

ঘরে ফিরে আর বের হওয়া কেন? সারাদিনের ক্লান্তিগুলো ঝেড়ে ফেলে সেজেগুজে স্বামীর পাশে বসা। গ্রিন টিয়ের মগে একটু চিনি নাড়তে নাড়তে মিষ্টি করে কথা বলাটা সুখী জীবনের গোপন রহস্য। এই যখন করছিলাম তখন মনে হলো, এ্যাই গেলো গেলো গেলো আমার গুড পেরেন্ট হওয়া গেলো! আমি ইতিমধ্যেই জেনেছি, ভালো মায়েরা অফিসে বসেও ঘরের ঠিক ঠিক খোঁজখবর রাখে, তাতে করে অফিসের কাজে মনোযোগের ঘাটতি হলেও। ভালো মায়েরা সন্তানের সবচে ভালো বন্ধু হয়। সেটা হতে হলে ঘরে ফিরে সন্তানকে যথেষ্ট পরিমাণ কোয়ালিটি সময় দিতে হবে। মা এবং সন্তানের মাঝে নো ল্যাপটপ, নো এন্ড্রয়েড, নো অফিস, নো ইন্টারনেট।

মামা শ্বশুর নাকি গত তিনদিন ধরে হাসপাতালে। এ সংবাদ না জেনে ড্যাবড্যাবিয়ে সংবাদদাতার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা কোনো ভাল গৃহীর কাজ নয়। বলতো দেখি, কী অবিচার! কী করে তবে আমি ভালো কর্মী হবো, ভালো স্ত্রী এবং ভালো মা হবো? সব কেমন তালেগোলে!!

আচ্ছা, ধরে নিলাম আমি দূর্গা। আমার দু’হাত নয়, দশ হাত। আমার এক একটা দিন হয় আটচল্লিশ ঘন্টায়। আমি সব করে টরে ভালো স্ত্রী, মা এবং কর্মী হলাম। কিন্তু ঐযে আমার মন চায়, অফিস থেকে ফিরে দরোজা এঁটে আলো নিভিয়ে ঝিম মেরে শুয়ে থাকতে, তার কী হলো? ঐযে আমার একটু আধটু লেখার শখ, তার সময় কই? ঐযে আমার বন্ধুদের সাথে পাড়ার মোরে কনডেন্সড দুধে চা খেতে ইচ্ছে করে, তার কী হলো! ঐযে কে কবে আঁখির পানে চেয়েছিল তা ভুলে যেতে চাই না, তাঁকে মনে করার সময় কই?

এক একদিন হাঁটতে হাঁটতে হাতের চেটোয় গুড়ো মরিচে লবন মিশিয়ে টক বড়ই খেতে ইচ্ছে করে। মাঝি ভাই আমি তোমার নায়ে একলা সওয়ারি, ঐযে কচুরি পানার গা ঘেঁষে বেগুনী ফুল, আমায় এনে দেবে মাঝি? আমার দখিনের বারান্দায় একটা কামরাংগা গাছ আছে। মৌসুমে তাতে গাঢ় গোলাপী ফুল ফোটে। আমার মগের চা ফুরোবে, কিন্তু আমার কামরাংগা ফুলের গোলাপী দেখা ফুরোবে না। আমার নিজের করে অনেক সময় চাই। অনেক কিছু “আমার” করে পেতে ইচ্ছে করে। আর প্রতিনিয়ত আমার ইচ্ছেগুলোকে আমি হনন করি। চা চুমুকের ঢোকের সাথে গিলে খাই। গলা চেপে মেরে ফেলে খুনি হই। হত্যার অধিকার জগতে কারো নেই। এমনকি নিজেকে হত্যারও। অথচ নিভৃতে আমি কত-শতবার হন্তারক হই সে খবর কেউ নেয় না।

আমার সাজানো ফ্ল্যাট, বিদেশি অফিসে চাকরি, আমার সুদর্শন স্বামী আমার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া গুড ম্যানারড্‌ সন্তানের সাথে চমৎকার জীবনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া আমি আর “আমি” থাকি না। তোমাদের ভালো উপদেশ আমায় আত্মহননে প্ররোচিত করে। আমি লোভী হই। আর লোভী আমি ধারালো ছুরির আঘাতে হত্যা করি আমারা ইচ্ছে, শখ, মন এবং আত্মাকে। আমি শক্তি রুপেণু, আমি মাতৃ রুপেণু, আমি স্ত্রী রুপেণু। হে মহাকাল, আমায় সকলে নমস্তসৈ বলেছো। আজ আনতী, আমার হন্তারক রুপের সাথেও কেউ সমব্যাথি হইও।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.