নারীদের ‘বাগে’ আনার প্রক্রিয়া বন্ধ হোক

শিল্পী জলি: মাঝে মাঝেই পড়ি ‘কালো মেয়ের কান্না’ সংক্রান্ত লেখা। প্রেম বা বিয়ে বা যৌতুক সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে ঘিরে থাকে সব কষ্টের কথা। বাবা-মাও তাদের নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন–কী হবে তাদের? এ জীবনে মেয়ে কি বিয়ের মুখ দেখবে না? যদিও কালো রঙ মানেই অসুন্দরী নয়! কালো মেয়েদেরও ভালো প্রেম হয়, ভালো বিয়ে হয়, কখনও বিয়ে টেকে, কখনও বা ভাঙে, তবু দেশীয় সমাজে কালো বলে কিছু কথা থেকেই যায়। আর তারাও ভাবে হয়তো কালো বলেই কাল হলো…. !

আফ্রিকান কালোদের কাছে বাংলাদেশী কালোদের কালো মানে দুধে আলতা রঙা। তাদের অনেক মেয়েই এতো সুন্দরী যে মাঝে মাঝেই দাঁড়িয়ে যেতে হয় আরেক পলক দেখতে।

কালো রঙ শুধু বাংলাদেশী মেয়েদেরই হয় না, ছেলেদেরও হয়, কিন্তু সমাজে মেয়েদের কালোকেই শুধু হাইলাইট করা হয়–আঙ্গুল দিয়ে চিনিয়ে দেয়া হয়। তাও একেবারে ছোটবেলা থেকেই যেনো সে আজীবন এই বিষয়টি মনে রাখে এবং সেইভাবে চলে। যদি সে কালো না হতো, তাহলে খোঁজা হতো সে খাটো কিনা, চিকনা কিনা, গরীব কিনা, মোটা কিনা, ত্যাড়া কিনা, ধার্মিক কিনা, চরিত্র ঢিলা কিনা, হিজাব করে কিনা, ভার্জিন কিনা, বয়স কতো, চেহারা কেমন, চুল কেমন, নাক কেমন, দাঁত কেমন, কাজ জানে কেমন, বাবা কেমন, মা কেমন… যতক্ষণ না একটি উপায় বের হয় অনুসন্ধান চলবে।

আমি কালো নই বলে শুনেছি, বোনদের চেয়ে চেহারা খারাপ, রান্না খারাপ, ফিগার খারাপ, অকর্মা, লজ্জা কম…হু কেয়ারস? বোন তো আমারই ! ঘটনাও সত্যি। তবে মনে মনে হেসেছি আর ভেবেছি, আমি তোমাদের মূল্যায়ন করতে এসেই ভুল করেছি। আমার বোনরা যে তোমাদের ঘর মোছার ন্যাকড়া দিয়েও মুছবে না সেই তোমাদের ন্যায্য পাওনা। মেয়েরা জীবনে হাঁটে, ঘাটে, পথে, ঘরে কতো কথা শোনে। তাই এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে ফার্টের মত বের করে দিতেও শিখতে হয়। অতঃপর নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলা যেনো গন্ধ নাকে আর না যেতে পারে। কথায় আছে, বানরকে বেশী লাই দিলে মাথায় উঠে নাচে–জীবনে এই কথাটিও মনে রাখা জরুরি।

ছোটবেলায় মাকে দেখতাম শিং মাছ কাটতে। কাটার আগে লবণ দিয়ে মেরে অথবা পুতা বা লাঠি দিয়ে ঘাড় ভেঙে তাকে বাগে আনতেন। আমাদের সমাজে মেয়েদের অবস্থাও অনেকটা ঐ শিং মাছের মতই যেনো ঘাড় সোজা করারই সুযোগ না পায়। পদে পদে নিয়ম এবং ফর্মূলা বেঁধে দেয়া হয় তাদের জন্যে– তারপরও কি শেষ রক্ষা হয়?

মানুষ কি বোঝে কোথায় থামতে হয়?

তাদের সন্তুষ্টিরও কি কোন সীমারেখা থাকে?

সম্প্রতি পড়লাম, পাঠ্যবইয়ে বাংলা সাহিত্যকে ধর্মভিত্তিক করা হয়েছে ইসলামি বিষয়াদি জুড়ে দিয়ে এবং অধিকাংশ হিন্দু লেখকদের লেখা সরিয়ে। যদিও শ্রেণীর পাঠ্য ধর্মের উপর একটি আলাদা বিষয়ই রয়েছে। তবে সাহিত্যকে ইসলাম ধর্মভিত্তিক করা হলে অন্য ধর্মের ছেলেমেয়েরা নম্বর পেতে হলেও ওটা বাধ্য হয়ে পড়বে। তারপরও যদি না পড়ে ফেল করবে। এক কথায় এই চাপে দেশে টিকতে পারলে টিকুক, না টিকতে পারলে যাক যেখানে খুশী! তারা যখন সবাই চলে যাবে তখন ধরা হবে মেয়ে জাতিকে। অতঃপর আরেক দেশ, তারপর আরেক….তবুও আশা পূরণ হবে না।

ফেসবুকে দেখলাম একটি পোস্ট – কারিনা কাপুরের মাথায় ঘোমটা দেয়া একটি ছবির পাশে ক্যাপশন–‘কারিনা কাপুর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। আপনার ওয়ালে পোস্ট করে সবাইকে জানিয়ে দিন!’

শিল্পী জলি

যেনো কারিনা কাপুর এতোদিন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করায় ইসলামের দিন কাটছিল না, এবার স্বস্তি মিললো! কারিনা কাপুর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেই কী আর না করলেই কী? আমাদের অতো মাথা ব্যথা কীসের? শাহিদ কাপুরের সাথে যখন সে প্রেম করেছে, তখন সে মাছ-মাংস বাদ দিয়েছিল। এবার যদি বরকে খুশী করতে ধর্ম চেঞ্জও করে, তাতে ধর্মের কীইবা যায় আসে?

যেখানে কোটি কোটি লোক স্ব স্ব ধর্মই ১০০% পালন করে না, সেখানে অন্য ধর্মের কে বা কারা কোন ধর্ম গ্রহণ করলো, বা করলো না, ওটা নিয়ে কেন হুমরি খেয়ে পড়তে হবে?

বরং কথায় কথায় ধর্ম চেঞ্জই তো অশনি সংকেত! ভরসা করা যায় না কখন কী করে বসে–অনেকটা ক্ষণে ক্ষণে পার্টি বদলের মতো বিষয়-আশয়।

শুনছি ওদের এখন ইচ্ছে হলো, পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ঐ হিন্দু প্রধানকে সরানো এবং পরবর্তীতে দেশজুড়ে পঞ্চম শ্রেণীর পর থেকে ছেলেমেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থার পৃথকীকরণ। কেননা পঞ্চম শ্রেণীর পর থেকেই নাকি বাচ্চাদের সেক্সের উত্তেজনা শুরু হয় এবং ভার্জিনিটি টিকিয়ে রাখতে হলে এর চেয়ে আর কোনো উত্তম ব্যবস্থা নেই।

যেই ভার্জিনিটি খোয়া যেতে জীবনের একটি মিনিটই যথেষ্ট, যেই ভার্জিনিটি যখন তখন হরণ হতে পারে, যেই ভার্জিনিটি ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছায় একদিন খোয়া যাবেই, এবং খোয়াও যায়, শুধু একটি বারেই তার পেছনে একটি মানুষের (মেয়ের) সারা জীবনকে কি বাজী ধরা জায়েজ?

তারপরও বলতে চাই, আমাদের দেশীয় মেয়েদের সেক্সের উত্তেজনা ত্রিশ/বত্রিশের আগে উপলব্ধিতেই আসে না। জীবনের ঐ বয়স পর্যন্ত তারা বরের আদেশক্রমে ডাইনে ঘোরো, বাঁয়ে ঘোরো, এই করে এবং পরবর্তী জীবনে এটাই তাহাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। কর্তার ইচ্ছেই কর্ম। তারপরও কি সর্বদা টিকে থাকা যায়? সুখী হওয়া যায়? বরাবর কদর থাকে? ত্যাগ করতে করতে কোমর বেঁকে গেলেও কি তার আদৌও কোন মূল্যায়ন হয়? সবাইকে কি সন্তুষ্ট করা যায়? মানুষের চাওয়ার কি কোনো শেষ আছে?

ছেলে/মেয়ে দু’পক্ষই সভ্য হয়, উভয়েই বিপত্নীক/বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত হতে পারে, উভয়েই কালো বা সাদা হতে পারে, উভয়েই ভার্জিনিটি খোয়াতে পারে…আরও কত কী? কিন্তু পস্তাতে হয় শুধু মেয়েদের, কেননা ছেলেরা নিজেদের ক্ষেত্রে ওসব বিশেষণের তোয়াক্কা করে না। বরং দলবদ্ধ থেকে ওসব বিশেষণ দিয়ে মেয়েদেরকে অবিরত ঘায়েল করে নিজেদের পথকে কন্টকমুক্ত রাখতে সর্বদা সতর্ক থাকে। নানা বাহানা এবং চাপ দিয়ে নিয়মিত মেয়েদের ব্রেন ওয়াশ করতে থাকে।

বর্তমানে চালু হয়েছে পাকিস্তানি ইসলামিক কায়দা। ঐ কায়দায় শালারা কতো মেয়েকে গভীর রাতে যেভাবে ‘তিন তালাক বলে’ ঘর থেকে একা করে দেয় জানলে আমাদের মেয়েদের মাথা ঘুরে যাবে। আমনা শরীফের কেসটিও তেমনই। তবুও ভালো যে এখনও তারা অন্য দেশ থেকে আমাদের দেশে ‘মেয়েদের খৎনা পদ্ধতিটি’ ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করেনি। তবে সেই সম্ভাবনাটিও যে আগামীতে থাকবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

ছেলেদের ধর্ষণ ঠেকাতে মেয়েদের উপর নিয়মজারী বাদ দেয়া অপরিহার্য। কোনো সভ্য ছেলে সেক্সের উত্তেজনায় ধর্ষণ করে না। ধর্ষণ করে অসভ্য ছেলেরা, যারা মেয়েদেরকে কখনও সম্মানের চোখে দেখতে শেখে না (সমাজ শেখায় না), তাদেরকে নিকৃষ্টভাবে, এবং নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায়।

পাপের কোনো লিঙ্গ নেই–পাপের দায় নিজস্ব। পাপের নিরাময় হলো কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে শুধু দেশীয় আইনের ভিত্তিতে পাপ-সম্পর্কিত তথ্য জনগণকে নিয়মিত অবহিতকরণ এবং আইনভঙ্গকারীকে যথাসময়ে যোগ্য সাজা প্রদান নিশ্চিতকরণ।

ছেলেদের পাপের দায় মেয়েদের উপর চাপানোর ধান্দা বন্ধ হোক। মেয়েরাও মানুষই–তাদেরও নিজস্ব পাপপূণ্যের হিসেব থাকে। তাদের আরেকজনের বোঝা বইবার সুযোগ কোথায়?

যার যার চরকায় তেল দেবার দায়িত্ব তার তার নিজেরই থাক–

সমাজের সবাই সুখে থাকুক!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.