মেকআপ থেকে মেকওভার: সৌন্দর্য আসলে কোথায়?

মৃন্ময় আহসান: মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা ঘটনা বলি। আমার একজন সহকর্মী একদিন তার এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বলছিলেন। বিয়ে হচ্ছে একটা বড় কমিউনিটি সেন্টারে। আমার সহকর্মীর তিন বোনসহ সকল আত্মীয়কূল উপস্থিত সেখানে। এমন সময় কোন একটা দরকারি জিনিস দেবার জন্য আমার সহকর্মীটি তার বোনদের খুঁজছিলেন। যেকোনো একজনকে পেলেই হয়। কিন্তু তিনি বেশ কতক্ষণ ধরে খুঁজেও, বোনেদের কাউকেই কাছেপিঠে কোথাও দেখতে পাচ্ছিলেন না। বিয়েতে ভিড় থাকলেও, বরপক্ষের লোকেরা তখনও এসে না পৌঁছানোয় মাত্রাতিরিক্ত ভিড় বলতে যেটা বোঝায় তেমনটা হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া তার বোনদেরও দূরে কোথাও যাবার কথা নয়। সহকর্মিটির বারবার মনে হচ্ছিল ওরা হয়তো আশেপাশেই কোথাও আছে, কিন্তু তিনি ঠিক দেখতে পাচ্ছিলেন না কাউকে। এ অবস্থায় তিনি তার এক খালাকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি আমার সহকর্মিটির বোনদের কাউকে দেখছেন কিনা। তাঁর খালা তখন কাছেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখান, ‘ওই তো তোর বোনেরা!’

আমার সহকর্মীর ব্যাখ্যা, “আমি খুবই অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম সত্যিই আমার দুই বোন কাছেই দাঁড়িয়ে আছে! ওরা আমার কাছেপিঠেই ছিল এতোক্ষণ। আমার সামনে দিয়ে হেঁটেও যাচ্ছিল। কিন্তু আমি ওদের আলাদা করে চিনতেই পারছিলাম না। বিয়ে অনুষ্ঠানে আসার আগে আমার বোনেরাসহ অন্য তরুণীরা ‘বিউটি পার্লার’ থেকে এমনভাবে সাজগোজ করে এসেছে যে, আমার কাছে সবার চেহারা একইরকম মনে হচ্ছিল। আমি আলাদাভাবে কাউকে পৃথক’ই করতে পারছিলাম না!”

‘মেকআপ’ শব্দটার সাথে প্রথম পরিচিত হয়েছিলাম ৯০ দশকের শুরুতে, শৈশবে কোন এক আত্মীয়ের বিয়েতে। মফঃস্বল শহরগুলোতে তখনো ‘বিউটি পার্লার’ সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। মেকআপ বক্স দিয়ে আত্মীয়-প্রতিবেশীর মধ্যে থেকে অভিজ্ঞ নারীরা বিয়ের কনেকে সাজিয়ে দিতেন। তখনকার কিছু বাংলা সিনেমাতেও বিয়ের দৃশ্যে এমনটাই দেখা যেত। সেই সময়ে হালকা মেকআপের মাধ্যমে ওই ‘ঘরে সাজানো’ বিয়ের কনেদের চিনতে খুব একটা অসুবিধা হতো না। কনে সাজানো নিয়ে কোন সমালোচনাও শুনিনি তখন। এরপর যতদিন গড়াতে লাগলো, বাস্তব এবং সিনেমার পর্দা, উভয় স্থানেই বিয়ের কনেদের মেকআপের পুরুত্ব ও চাকচিক্যও ততই বাড়তে লাগল।

নব্বইয়ের শেষাশেষি মফঃস্বল শহরগুলোতে বেশ আলোড়ন তুলেই একের পর এক ‘বিউটি পার্লার’ গজিয়ে উঠতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে ভারী মেকআপ কেবল বিয়ের কনেদের মধ্যেই নয়, বরং প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য নারীকূলের মাঝেও জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। তারপর যেটা হলো সেটা বেশ আশংকার বিষয়, পার্লারের ভারী সাজ-মেকআপ হয়ে উঠলো আভিজাত্য প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে।

কে জানে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সবসময় দুধের চাঁছি শুষা কিছু ‘পুরুষ’ নামের মাছিরও হয়তো প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল ওই আরোপিত বাস্তবতা বিনির্মাণে!

২.
শূন্য দশকের শেষ ভাগে ঢাকায় এসে ‘মেকআপের’ সাথে সাথে নতুন একটা শব্দ শিখলাম, ‘মেকওভার।’ ‘মেকআপ’ কেবল নির্দিষ্ট একটা অঙ্গের সৌন্দর্য বাড়াতে ব্যবহৃত হয় (যেমন: মুখশ্রী), আর ‘মেকওভার’ আপনার শরীরসহ সমগ্র গেটআপের পরিবর্তন ঘটাবে। দুইটাই এমন, যা আপনার শরীরের ‘নিজস্বতা’ নির্মাণ করবে অন্যের দ্বারা। ঢাকা শহরে নতুন এসে কাউকে তেমন চিনিনা তখন। ধীরে ধীরে মহানগরের সংস্কৃতি বোঝার চেষ্টা করছি। অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে ভার্সিটিতে তেমন বন্ধু-বান্ধবও হয়ে ওঠেনি। ক্লাসের দু’একজন সহপাঠীর সাথেই যা একটু কথাবার্তা হয়। এমন সময়ে কোন একটা দিবস উদযাপনের লক্ষ্যে ভার্সিটিতে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। একই সাথে নবীনদেরও বরণ করে নেওয়া হবে, কাজেই অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে দেখি হলভর্তি সব অচেনা ছেলেমেয়ে, পরিচিত কাউকে খুঁজে পাওয়ায় দুষ্কর। অর্ধ-পরিচিত একজন অনুষ্ঠান সমন্বয়কারীকে দেখতে পেয়ে জানতে চাইলাম, তিনি আমার দুই পরিচিত সহপাঠিনীদের দেখেছেন কিনা। উনি বললেন ওদের আসতে একটু দেরি হবে, ওরা অনুষ্ঠানে পারফর্ম করবে বলে পার্লারে গেছে। পার্লার থেকে সাজগোজ করে তারপর অনুষ্ঠানে আসবে।

যথারীতি অনুষ্ঠান শুরু হলো, আমি এক কোণে বসে দেখতে থাকলাম। অদ্ভুতভাবে, আমার দুই পরিচিত সহপাঠিনী যখন মঞ্চে পারফর্ম করছিলো, ওদেরকে চিনতেই কষ্ট হচ্ছিল আমার। ওদের চেহারায় এত প্রগাঢ় মেকআপ, এত চাকচিক্যময় সাজগোজ যে ওদের দেখে নিজেকে কেমন যেন ছোটলোক ছোটলোক মনে হচ্ছিল। অনুষ্ঠান শেষে আমাকে দেখে হাত নাড়লো একজন। এগিয়ে গিয়ে দু’একটা কথাও হলো। কিন্তু কেন জানি অন্যদিনের মতো করে কথা বলতে পারছিলাম না সেদিন। ভীষণ জড়তা আর অস্বস্তি কাজ করছিল নিজের মধ্যে। ওদের বাচনভঙ্গিও ঠিক ক্লাসরুমের মতো নয়, বরং অনেক বেশি ফর্মাল টাইপের ভঙ্গিতে কথা বলছে ওরা। আমার মনে হলো, ওদের মেকআপ-গেটআপ আমাদের মধ্যে এক রঙিন কাঁচের দেয়াল তৈরি করেছে। যার মধ্যে দিয়ে দেখতে আমার চোখ তখনো পর্যন্ত ঠিক অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি।

৩.
সভ্যতার প্রাচীনকাল থেকেই পুরুষের চুল-দাঁড়ি কাঁটার জন্য নাপিতের প্রচলন ছিল। বিষয়টা যতটা না সৌন্দর্য চর্চা, তার চেয়েও বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনে। কিন্তু নারীরা এক্ষেত্রে প্রথম থেকেই অবহেলিত ছিল। ‘ঘন লম্বা চুল’ দেশে দেশে নারীত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলো। ঘরের সমস্ত কাজ করবার পরও নারীকে তাঁর নিজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজটাও নিজেকেই ঘরে বসেই সারতে হতো। এই বিবেচনায় নারীর জন্য আলাদা ‘পার্লার’ বা ‘সেলুনের’ ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, যেখানে নারীরা ঘরের কাজ করবার পাশাপাশি পুরুষের সাথে সমানতালে বাইরেও কাজ করবার মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। আজকাল শুধু ‘নাপিতের’ প্রয়োজনের বাইরেও পুরুষের জন্য কিছু জেন্টস পার্লারও গড়ে উঠছে যেখানে বিভিন্ন প্রকার রূপচর্চামূলক সার্ভিসের পসরাও সাজানো থাকে।

সৌন্দর্য চর্চার বিরুদ্ধে আমি নই, নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্নিগ্ধময় রূপে উপস্থাপন করতে পারাটাও নিঃসন্দেহে বড় এক সৃজনশীলতা। প্রশ্নটা হচ্ছে, সৌন্দর্য চর্চার এই কৃত্রিম ও বাণিজ্যিক ধরন এবং মাত্রা নিয়ে। যেটা আমার মধ্যে নেই, তা মিথ্যা উপকরণের মাধ্যমে নির্মাণ করে অন্যদের বিভ্রান্ত করাটা কোনমতেই সৌন্দর্যচর্চা হতে পারে না। বরং এটা সুস্পষ্টভাবেই ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। যে আবরণে আপনাকে চিনতে পরিচিতজনদেরও কষ্ট হবে, যে আবরণ আপনার আর অন্যদের মাঝে দেয়াল তৈরি করবে; তার মাত্রা কতটুকু গ্রহণযোগ্য বা আদৌ সেটা প্রয়োজনীয় কিনা, তা ভাবার সময় এসেছে।

আজকাল তো অনেক নামীদামী ‘বিউটি পার্লার’ ও ‘মেকওভার সেলুনে’ বিয়ে বা অন্য অনুষ্ঠানের জন্য মাসব্যাপী প্যাকেজ অফার করা হয়। অনেক্ষেত্রেই সেগুলোর অর্থমূল্য ছয় অঙ্কের কোটাও ছাড়িয়ে যায়! রঙ ফর্সাকারি প্রোডাক্টসমূহ, সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ত্বকে রঙ মাখা বা ‘বিউটি পার্লারের’ হরেক রকম সার্ভিস; এগুলোর সবই একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর আরোপিত পণ্য ও সেবা (আদৌ কি সেবা?) যেগুলো কেবলই মানুষকে ধোঁকা দিয়ে অর্থ হাতানোর অপকৌশল মাত্র।

মনে আছে, আমার জন্মশহরে একটা বিউটি পার্লারের ট্যাগ লাইন ছিল, “রূপ থাকলে ধরে দেব, না থাকলে গড়ে দেব!”
হলিউডের সুবর্ণ যুগের প্রতিনিধি; যাকে ধরা হয় সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্রিটিশ সুন্দরী হিসেবে, সেই অড্রে হেপবার্নের মতে, “মেকআপ কেবল তোমার বাহিরটা সুন্দর করে তুলতে পারে মাত্র, কিন্তু তোমার ভিতরটা কুৎসিত হলে মেকআপ কোন কাজে আসবে না; যদি না তুমি মেকআপকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ কর!”

মৃন্ময় আহসান

বিংশ শতকের সবচেয়ে খ্যাতিমান ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে মনে করা হয় ইউভস সেইন্ট লরেন্টকে। এই ফ্রেঞ্চ ভদ্রলোকের মতও অনেকটাই অভিন্ন, “একজন নারীর সবচেয়ে সুন্দর মেকআপ হচ্ছে তাঁর প্যাশন। কিন্তু কসমেটিকস কেনাটা তুলনামূলক সহজ!” (‘প্যাশন’ শব্দটার ভালো কোন বাংলা প্রতিশব্দ পেলাম না!)। লরেন্টের এই কথা পুরুষদের ক্ষেত্রেও সমভাবেই খাটে।

৪.
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উচিৎ মানুষের বাহিরের চাকচিক্য নয়, বরং হৃদয়ের সৌন্দর্যটা খুঁজে দেখা। এক্ষেত্রে কৃত্রিম রঙ নয়, বরং আত্মবিশ্বাস’ই হতে পারে অনেক বড় মেকআপ। আপনি যত স্থুল ‘মেকআপ’ অথবা আকর্ষণীয় ‘মেকওভার’ আর্টিস্টের মাধ্যমেই নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করুন না কেন, এর সবই মূল্যহীন যতক্ষণ না আপনার অন্তরটা শুভ্র হচ্ছে, পরিচ্ছন্ন হচ্ছে। আর যার অন্তর শুভ্র-পরিচ্ছন্ন, তার কখনোই কৃত্রিম মেকআপ-মেকওভারের আড়ালে নিজেকে লুকানোর প্রয়োজন হয় না। আমরা অধিকাংশ মানুষ যা, আমাদের সমাজও আসলে তা’ই। আমরা কৃত্রিমতার আড়ালে নিজেকে লুকাই বলেই আমাদের সমাজও সেটাকেই আকর্ষণীয় বা স্বাভাবিক রীতি বলে ধরে নেয়। আমরা সকলে যদি কৃত্রিম মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে, মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের পরিবর্তে তাঁর অন্তর্গত সৌন্দর্যের মূল্যয়ন করতে শুরু করি, তবে কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের সমাজেও সেটাই প্রধান রীতি হয়ে উঠবে।


পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, জগতে ‘বিউটি পার্লার’ বলে সত্যিই যদি কিছু থাকে তবে সেটা হচ্ছে পরিপূর্ণ একটা গ্রন্থাগার। আর মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠ ‘মেকআপ’ ও ‘মেকওভার’ হচ্ছে যথাক্রমে তাঁর ‘মনন’ এবং ‘কর্মদক্ষতা।’


লেখক: মৃন্ময় আহসান
গল্পকার
ইমেইল: [email protected]

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.