পরিবার নারীর জন্য জেলখানা!

ভানুলাল দাস: পরিবার নারীর জন্য জেলখানা! বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকের ছোট আঙ্গিকে পূর্ণাঙ্গ গভীর আলোচনা সম্ভব নয়। আমি শুধু ভাসা ভাসা ধারণা দেবো। কেউ আগ্রহী হলে সমাজ বিজ্ঞানের ‘পরিবার’ সংক্রান্ত অধ্যায়গুলো পড়ে দেখতে পারেন।

এইচ মর্গানের বিখ্যাত বই ‘আদিম সমাজ’ সমাজ বিজ্ঞানের আকর গ্রন্থ। ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের ‘ ব্যক্তিগত সম্পত্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রের উদ্ভব’ অসাধারণ বই। রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘আদিম মানব সমাজ’ও ভাল বই। সমাজ বিজ্ঞান এদের মত স্কলারদের তত্ত্ব নিয়ে তৈরি। মর্গান উত্তর আমেরিকার একটি আদিম ট্রাইবে, যারা তখনও বর্বর যুগে বাস করতো, বিশ বছর বসবাস করেন এবং পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি, ধর্মের উদ্ভব নিয়ে গবেষণা চালান। ফলশ্রুতিতে তিনি ‘আদিম সমাজ’ বইটি লিখেন।

ভানুলাল দাস

মনে রাখতে হবে, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় যে সমস্ত সামাজিক প্রতিষ্ঠান দেখছি, এগুলো চিরকাল এ রকম ছিল না। এদের বিবর্তন, পরিবর্তন হয়েছে। কতক বিলুপ্ত হয়েছে। ইতিহাসের কোন এক পর্যায়ে সবগুলোর উদ্ভব হয়েছে। বিবাহ, পরিবার, ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র, চিরকালীন কোনটাই নয়।
সমাজ নিজে একটি পরিবর্তনশীল সত্ত্বা, নানা ঘাত-প্রতিঘাতে এটি পরিবর্তিত হয়। পাকিস্তান আমলের গ্রামীণ সমাজ আর এখনকারটি একরকম নয়। অবকাঠামো ও মনন, উভয় দিকেই দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়েছে।

কোন প্রতিষ্ঠান বরাবর একইরকম থাকবে, এমনটিও নয়। চিরন্তন তো নয়ই। পরিবার চিরন্তন কোন সামাজিক প্রতিষ্ঠান নয়। এর উদ্ভব, বিবর্তন, পরিবর্তন ও বিকাশ হয়েছে। আজকে পরিবারকে যে রকম দেখতে পাচ্ছি, তা বহু পরিবর্তনের ফলাফল এবং এটি একটি পর্যায়।

সামন্ততান্ত্রিক একান্নবর্তী যৌথ পরিবারে দাদা-দাদি, বাপ-মা, চাচা-চাচি, চাচাতো ভাইবোন একত্রে থাকতো। পুঁজিবাদি যুগে উদ্ভূত একক পরিবারে বাবা-মা, পুত্র-পু্ত্রবধু ও আপন ভাইবোন থাকে। দাদা-দাদি বহিষ্কৃত। মুক্ত বাজার অর্থনীতির যুগের নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে শুধু স্বামী-স্ত্রী ও নাবালক সন্তান থাকতে পারে।

নিউ-লিবারিজমের যুগে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিও ভেঙে যাচ্ছে; স্বামী-স্ত্রীও একসাথে থাকতে পারছে না। স্বামী ঠাকুরগাঁও, তো স্ত্রী চট্টগ্রাম। অথবা স্ত্রী কানাডায়, স্বামী বাংলাদেশে। সন্তান কার কাছে থাকবে বিরাট সমস্যা। এ অবস্থায় কোনো কোনো দম্পতি সন্তানই নিতে চাচ্ছে না। সন্তানকে স্বামী-স্ত্রী মিলে দেখাশোনা করবে, তারও উপায় নেই; কারণ তারা একসাথে থাকতে পারছে না।

নেসিসিটি ইজ দ্য মাদার অব ইনভেনশন; চিকিৎসা শাস্ত্র এ ব্যাপারে সমাধান হাজির করেছে। এখন যে কোনো মেয়ে ৬৫ বছর পর্যন্ত সন্তান জন্ম দিতে পারবে। মেডিকেল প্রযুক্তি এসে গেছে। এখন বলা হচ্ছে, ৪০ এর পরে মেয়েরা বাচ্চা নিলে সে বাচ্চা হবে জেনেটিক্যালি পরিপূর্ণ মানুষ।

মেয়েদের বিয়ের বিয়ের স্ট্যান্ডার্ড বয়স ৩৫। কোরিয়া ও জাপানে এরই মধ্যে নব দম্পতির গড় বয়স ৩৪। লেখাপড়া করে চাকরিতে থিতু না হয়ে কোনো ছেলেমেয়ে বিয়ে করছে না এ যুগে। টিভিতে অসম্ভব জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনটির মডেলকন্যা বলছে, ‘বাবা আমি বিয়েতে রাজি। তবে তিন বছর অপেক্ষা। লেখাপড়া শেষ করি, চাকরি-বাকরি করি। ভালো চাকরি, ভালো গাড়ি। সমানে সমান।’ অর্থাৎ ছেলের সমান যোগ্যতা নিয়ে বিয়ে করবে। এই হচ্ছে বিশ্বায়নের অাধুনিক নারী।

কিছুদিন আগে জনৈক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির ৫৫ বছরের রাজনীতিক স্ত্রীর কোলে দেখলাম ফুটফুটে বাচ্চা। ভারতে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাচ্চার মা হতে পেরেছেন। পাঁচ বছর আগে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে একজন পোলান্ডের লেডিকে ৬৫ বছরে মেয়েশিশুর মা হতে দেখে অবাক হয়েছিলাম। বাংলাদেশে আজ তা সত্য হয়েছে। বাইবেলে পড়েছি, আব্রাহামের স্ত্রী সারা ৭০ বছরে মা হয়েছিলেন ফেরেস্তাদের অলৌকিকত্বে। আধুনিক বিজ্ঞানও ৬৫ বছরের নারীর জন্য মাতৃত্ব এনে দিয়েছে।

এখনকার দিনের শহুরে পরিবার মানে নিউক্লিয়ার পরিবার। বৃদ্ধ বাবা-মার জায়গা নিউক্লিয়ার পরিবারে নেই। শহুরে ফ্লাট বাসায় সার্ভেন্ট রুম আছে, কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মার জন্য কোন রুম নেই; এমনকি ইঞ্জিনিয়ারের ডিজাইনেও তা রাখা হয়নি।
ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর বদৌলতে এক সন্তান বা বড়জোর দুই সন্তান নেয়ার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে বৃদ্ধকালে পিতামাতার অবধারিত স্থান বৃদ্ধাশ্রম। কারণ আপনার ক্রয় করা ফ্লাটে বৃদ্ধকালে থাকবেন এমন কোনো রুম রাখা হয় না। নতুনের জন্য স্থান ছেড়ে দিতেই হবে। এই হচ্ছে ভবিতব্য, এই হচ্ছে নিয়তি। কেঁদে বুক ভাসালেও এ অবস্থার পরিবর্তন হবে না। ব্যক্তি মানুষ ইতিহাসের নির্মম গতির কাছে যে বড় অসহায়!

পত্রিকায় দেখলাম, বাংলা সিনেমার এক সময়ের সুপারস্টার প্রবীর মিত্রকে তার ছেলেরা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছে। আমরা এই দেখে ভাবছি, ‘ছি ছি! কুলাঙ্গাররা কী করলো? না না, আমার ছেলেরা সোনার ছেলে। কখনো এমন করবে না।’ একেই বলে মনকে চোখ ঠারা।

ধন্য আশা কুহূকিনী! আপনার ও আমার ছেলেরাও একই পথে হাঁটছে- কারণ সমাজ পরিবর্তনের মহাসড়ক একটাই। এই রাস্তা দিয়ে প্রবীর মিত্র, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং আপনার আমার ছেলেমেয়েরা হাঁটছে।

পরিবার যে নারীর জন্য কারাগার স্বরূপ, এটি আমার মতামত নয়। এটি নারীবাদীদের পিলে চমকানো অন্যতম কথা। আমি শুধু তুলে ধরেছি এবং খানিকটা ওদের যুক্তির সঙ্গে সহমত পোষণ করেছি মাত্র।

গত শতকে প্রত্যেক গৃহস্থ বাড়িতে গরু ছিল। কিছুদিন আগে আমি এক গরীব আত্মীয়কে গাভী কিনে দিতে গেলে নিতে অস্বীকার করেন। তার মতে, গরু পালা মানে গোলামী করা। কারণ গরুকে সকাল-বিকাল-রাতে খাদ্য ও পানি দিতে হবে। ঘাস-খড় কাটতে হবে। গোয়াল সাফসুরত করতে হবে। কোথাও বেড়াতে গিয়েও স্বস্তি নেই, রাতে বুঝি চোরে গরু নিল। এক রাজনীতিবিদের নারী কেলেঙ্কারি যখন চায়ের কাপে ঝড় তুলছে, তখন প্রবীণ রাজনীতিবিদ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এক ঘরোয়া মজলিসে তাকে উদ্দেশ করে বলছিলেন, ‘বাজারে দুধ পাওয়া গেলে গরু পালে কোন শালা?’

গরু বর্তমানে কৃষিকাজে লাগছে না বিধায় বাড়ি বাড়ি গরু পালন অত্যাবশ্যক নয়। এখন শুধু দুধ ও মাংস উৎপাদনের জন্য গবাদি পশু পালন করা হয়। কিন্তু সমাজ বাস্তবতায় গোস্ত-দুধ বাজার থেকে কিনে খাওয়াই সকলের পছন্দ। এ কারণে মাছ, গরু, মুরগি পালন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এগুলোর সামাজিকীকরণ হয়ে ফার্মে পরিণত হয়েছে, ইনডাস্ট্রিতে পরিণত হচ্ছে দ্রুত।

রান্নাবান্নাও ইন্ডাস্ট্রি হয়ে যাবে শিঘ্রই। কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ড বিশ্বজোরে এই কাজটিই করে থাকে। বে্ইলী রোড, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির এত এত হোটেল রেস্তোঁরােতে বহু পরিবার ঘরে রান্না বাদ দিয়ে দুপুর ও রাতের ভোজন সারছে।
এ কেন হচ্ছে? স্বামী স্ত্রী ব্যস্ত, রান্না করার সময় কই? ইচ্ছাও নেই। রেস্তোরার খাবার কস্টলি হলেও ভারি মজার এবং জম্পেস আড্ডাও জমে সেখানে। এন্তার সেলফি আর ছবি তোলা তো আছেই। আয়টা ভালো হলেই হলো। স্বামী-স্ত্রী দুজনে কামাই করলে তো কথাই নাই। নো টেনশন ডু ফুর্তি। তাই বিয়ের বাজারে দেখি আজকাল রোজগারে মেয়ের চাহিদা বেশি।

পারিবারিক জীবনে একটি মেয়ের বেলায় কী ঘটে? বিয়ের মধ্য দিয়ে একটি মেয়ে প্রায় অচেনা একটি পরিবারে আসে এবং আক্ষরিক অর্থেই কারাগারে ঢুকে পড়ে। বাবার বাড়ির স্বাধীন মেয়েটির চলাফেরা সীমিত করা হয় শ্বশুর বাড়িতে। পুলিশি ভাষায় যার নাম হেফাজতে নেয়া। স্বামী, শ্বশুর, শ্বাশুড়ি, ননদ, জা সবাই সেন্ট্রি হয়ে ২৪ ঘন্টা হাজতখানা পাহারা দেয়। মেয়েটির বন্ধুবান্ধব কারো সাথে দেখাসাক্ষাৎ করা বারণ হয়ে যায়। বিয়ের পর মেয়েরা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো হারিয়ে ফেলে- ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাবা-মার সাহচর্য, বন্ধু-বান্ধবের ভালোবাসা। কিন্তু বিয়ের পর পুরুষকে সেরকম কিছুই হারাতে হয় না।

সন্তান গর্ভে নিলে সে সম্পূর্ণ পরাধীন হয়ে পড়ে। ৫/৬ মাস একা একা চলাফেরা করতে পারে না। হতে হয় পরনির্ভরশীল, অপরের দয়ায় তার জীবন বাঁচে। তার জীবন রোগ-পীড়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। প্রসবের পর সন্তানের পেছনে আক্ষরিক অর্থে মা হিসেবে নারী গোলাম হয়ে যায়। ১৪ বছর পর্যন্ত তার কোথাও যাবার নেই, থাকার নেই।
সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে স্বামীর অত্যাচার নির্যাতন মুখ বুঁজে সইতে হয়। কারণ পিতৃতন্ত্র সন্তানের অধিকার অন্যায্যভাবে পিতাকে দিয়েছে। সম্পত্তির অধিকারও দিয়েছে।

স্বামী বা তার পরিবারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নারীটির কাছ থেকে তার বাচ্চা কেড়ে নেয়া হবে, ডিভোর্স দেয়া হবে। পিত্রালয়ে তার আগের মত আর ঠাঁই হয় না। বিয়ের জন্য দীর্ঘকাল অনুপস্থিতিতে নারী বাবার বাড়ির আগের জায়গাটি হারিয়ে ফেলে। পিতামাতা ওয়েলকাম করে না আগের মত। যাবে কোথায়?
লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে স্বামীর ঘরে ফেরত গেলে, তারা জেনে যায় ওর যাবার জায়গা নাই। তখন উঠতে বসতে শারীরিক মানসিক অসহনীয় নির্যাতন শুরু হয়। স্বামীর স্টিমরোলার ফাঁটা বাঁশ হয়ে দেখা দেয়। প্রাণে বেঁচে থাকাই দায়। পরিণতি নারীটির তিলে তিলে মৃত্যু, নতুবা আত্মহত্যা।

তাই ইউরোপ-আমেরিকার মেয়েরা বলছে, পরিবার হচ্ছে নারীর জন্য কারাগার। এ কারাগার ভাঙতে হবে। বিয়ে হচ্ছে সেই কারগারে ঢোকার অনুষ্ঠানমাত্র। আমি বা আপনি একমত হতে পারি, আবার নাও পারি; কিন্তু যুক্তি তো কিছু আছে- মানতেই হবে।

পাশ্চাত্যের অনেক কিছুকে আমরা আগে ঘৃণা করতাম, এখন ফলো করছি। যেমন, মাটিতে বসে খাওয়ার সুন্নত বাদ দিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসছি, বসে পেচ্ছাবের বদলে অফিস আদালতে দাঁড়িয়ে শি শি করছি, ঘরের ভেতর নাপাক টয়লেট বানিয়ে কুকর্ম করছি, বউ নিয়ে বাইরে রেঁস্তোরায়, অনুষ্ঠানে যাচ্ছি…আরও কতো কী! বিয়ের ব্যাপারেও ওদেরটা হয়তো একদিন অজান্তেই ফলো করবো। যেমন লাভ ম্যারেজের মতো গুনাহগারি কর্ম আমরা এখন হাসিমুখে মেনে নেই।

পাশ্চাত্যের মেয়েরা বলছে, বিয়ে করবো না, কারো গোলাম হবো না। মা হতে ইচ্ছে হবে বয়ফ্রেন্ডের সাথে থাকবো (ফ্রি লিভিং), বাচ্চা নেবো। বাচ্চা আমার। বয়ফ্রেন্ড স্বীকৃতি দিলো না দিলো, কিছু যায় আসে না। মেয়েরা এ জোরটা কোথায় পায়? ওরা স্বাবলম্বী, রোজগারে। স্বামীর তোলা ভাত খায় না। বাবা পরিচয় বাদ দিয়ে মায়ের পরিচয়ে বাচ্চা! শুনলে অবাক লাগে! কিন্তু ইতিহাসের পেছনে গেলে এমনই ছিলো- মায়ের পরিচয়ই ছিলো সন্তানের প্রধান পরিচয়।

এখনকার সমাজে দেখুন, একাধিক নারীর গর্ভে বীর্য ঢেলে পুরুষ সবার বাপ হতে পারে; কিন্তু উল্টোটা চিন্তা করলে মাথায় বাজ পড়ে। এর নামই পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা।
আমি পাশ্চাত্যের সিঙ্গেল মাদার( আনুষ্ঠানি বিয়ে ছাড়া) এর সন্তান, তার ভাইবোন, পিতামাতার মাঝে এ নিয়ে কোন বিকার দেখি নাই। সন্তানের ভেতরও হীনমন্যতা দেখি নাই। হাসি খুশি স্বাভাবিক মানুষ এরা। আমরা নিজেরা কষ্ট-কল্পনা করে ওদের দুঃখী বানিয়ে তৃপ্তি খুঁজি।

সবশেষে আমার ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা কথা বলি।

আমি তখন নর্থ বেঙ্গলে এক জেলায়। ইউএস একশন এইড প্রোগ্রামের আওতায় আমেরিকার অবিবাহিতা নীলনয়না এক যুবতী ঐ জেলায় কাজ করত। খ্রিস্টমাসের ছুটিতে দেশে যাবার আগে আমার বাসায় আসল মেয়েটি। এরমধ্যে সে মোটামুটি বাংলা শিখে ফেলেছে। আমার স্ত্রী বাচ্চার সামনে কথা হচ্ছিল।
: ডোরা, দেশে নেবার জন্য কি কি কিনলে?
: গার্মেন্টস, রসগোল্লা, পানসুপারি, অনেকরকম পুতুল…
: পুতুল?
: হ্যাঁ। আমার বড়বোন লোরার মেয়ের জন্য। আই মিস হার।
: ওঃ, তোমার বোনের মেয়ের বয়স কত?
: ফোর প্লাস। সি ইজ সো কিউট! আই লাভ হার টু মাচ।
: তো লোরার কত আগে বিয়ে হয়েছে?
: লোরার তো বিয়ে হয় নি!
আমার স্ত্রী ও বাচ্চারা হেসে উঠলো। বিয়ে ছাড়া বাচ্চা! ডোরাকে কিছুটা বিব্রত দেখল।
সে বললো, ‘আই নো, তোমাদের কালচার অন্যরকম।’
আমি বললাম, ‘লোরার বয়ফ্রেন্ড কী করে?’
: বাচ্চা হবার আগে আগে বয়ফ্রেন্ডের সাথে লোরার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।
দেখলাম, এ নিয়ে ডোরার কোন খেদ নেয়। বরং আমার জিজ্ঞাসায় বিস্মিত হলো। কেন সমস্যা হবে? সিনথি তো আমাদের সকলের নয়নমনি। আমার বোনের ভালো চাকরি, ভালো গাড়ি, ভালো বাড়ি। সে দুঃখে থাকবে কেন? না না না, লোরা সুখী মাদার, সুখী এক ওমেন।

এই হলো পাশ্চাত্য ও মার্কিন সংস্কৃতি! খারাপ বলতে পারেন, বলেন। কিন্তু ওদের কাছে আমরা জ্ঞান বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, আধুনিক জীবন যাপন শিখি। এমন কি বাংলাভাষার পিএইচ ডি ওদের কাছ থেকে নিলে এর দাম অনেক বেশি।
ডঃ মোহাম্মদ আব্দুল হাইয়ের ‘ বিলাতে সাড়ে সাতশ দিন’ রবি ঠাকুরের ‘প্রবাসীর পত্র’, সুনীলের ‘ ছবির দেশ কবির দেশ’ হুমায়ুন আহমেদের নানা বইয়ে তো দেখি ওদের প্রশংসা। তেমন মন্দ কুৎসিৎ কিছু দেখি না।

বাঙালিকে নিরোদ সি চৌধুরী আত্মঘাতী বলেছেন। হিপোক্রেটও বলেছেন কেউ কেউ। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও আমেরিকার দিনরাত মুন্ডুপাত করি। শতমুখে নিন্দবাদ করব, অথচ ডিভি লটারি, ইমিগ্রেন্ট হওয়া কিংবা অর্থকড়ি ওখানে পাচার করতে আমরা পাগল।

মানুষ মুখে কী বলে, এর চেয়ে বড় সত্য হচ্ছে কী আচরণ করে? আমরা আচরণে স্পষ্ট বলছি, পাশ্চাত্য ও আমেরিকার সভ্যতা অনেক অনেক ভালো। নিরাপদ দেশ। শান্তির দেশ। ছেলেমেয়ে বউ একবার ওখানে পাঠাতে পারলে একেবারে কেল্লা ফতে! মেয়ের হবুপাত্র যদি ওসব দেশের অভিবাসী হয়, তা হলে আর পায় কে! আনন্দ আর খুশিতে শুকনো মুখ তেলতলে হয়ে যায়। এ কী ভন্ডামি নয়?
কী আর বলবো! অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.