“আমার বাচ্চাটা কি আব্বুকেই ‘বাবা’ বলে ডাকবে?”

কাশফি জামান শ্যামা: শাখা-প্রশাখা না টেনে একেবারে মূল গল্পে চলে যাই।

কেস স্টাডি -১: আইনগত জটিলতার কারণে একটা ছদ্মনাম দেই মেয়েটার, নাম দিই “নদী”। নামের সাথে মিলে গেছে ওর আচরণও। অনাগত চিন্তা ভুলে সারাক্ষণ হিহি- হাহা- চলছেই। আমি সেইফ হোমে গেলেই মহিলা আনসারদের একরাশ বিচারের ঝুড়ি,  ম্যাডাম নদী এই করছে, নদী ওই করছে। তবু এই নদী যখন চুপ হয়ে গেলো, সেই নীরবতা সহ্য করা মুশকিল ছিল সবার জন্যই। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মা হতে গিয়ে আমাদের নদী এক্কেবারে চুপ হয়ে গেলো, সেদিন সারারাত আমি একটা ফোঁটাও ঘুমাতে পারিনি, বুকের ভিতরটা খিঁচে আসে আজও।
কাশফি জামান শ্যামা

ইসসস, আর কয়েকটা দিন আগেই আমি জয়েন করতাম, সময়মত তাহলে হয়ত মেয়েটাকে ওর হত্যাকারি অনাহুত সন্তানটা থেকে রক্ষা করতে পারতাম! আইনি জটিলতা আর মারপ্যাঁচে চলে গেলো দু-দুটা জীবন….

আমার ব্যর্থতার গল্প এটা।
কেস স্টাডি -২: এবারের ঘটনার পাত্রী ১৫ বছরের ” জয়িতা” ( ছদ্মনাম)। খুব কাছের একজনের হাতে বার বার, কয়েকবার শোষিত মেয়েটি যখন মৃত্যুসজ্জায়, তখন মেয়েটির মার হুস হয়। যথাক্রমে পুলিশ এবং পরে ওয়ান স্টপ মেডিকেল হয়ে ওর স্থান হয় ” নিরাপদ হেফাজতে “। 
আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটিকে আমি একদিনও হাসতে দেখিনি। জীবন আর জীবনের কদর্য দিকগুলা ওর কাছ থেকে ওর কৈশোর আর আনন্দ কেড়ে নিয়েছে ভয়ংকরভাবে। আমি ঘন্টার পর ঘন্টা ওর সাথে কথা বলতাম, উত্তরে উল্টা আমাকে একটা প্রশ্ন করতো, ‘আপু’ আমার বাচ্চাটা কি আব্বুকেই ‘বাবা’ বলে ডাকবে?
আমি সবার ক্ষমাপ্রার্থী, এমন একটা ঘটনা শেয়ার করার জন্য।
ভুমিষ্ঠ শিশুটি ছিল অবাঞ্ছিত, তাই আমার প্রথম থেকেই সাজেশন ছিল জন্মের পর পরই ওকে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার। বলাই বাহুল্য তা মানা হয়নি। পরিণতি, একটা মৃত্যু, শীতের রাতে সবাই যখন টিভি প্রোগ্রাম দেখতে ব্যস্ত তখন কাঁথা চাপা পড়ে, কেউ খেয়ালই করেনি….।
বিশেষ আদালতে, পরবর্তিতে মেয়েটার নামে দায়ের করা  হত্যা মামলা খালাস পেয়েছে। আমার সাড়ে ষোল পাতার লেখা মেয়েটার মানসিক অবস্থা আর তার ফলাফলের রেজাল্ট একটু হলেও পেয়েছি, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জয়, সবচেয়ে বড় আনন্দের। ওর সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিকার আমরা, আমাদের সমাজ করতে পারিনি, এটা এখনো আমাদের পরম দুর্ভাগ্য…
তবু এটা আমার জয়ের গল্প।
এই দুটো ঘটনা পড়ে আঁতকে উঠার দিন মনে হয় আজ আর নেই, প্রতিনিয়ত আমরা খারাপ থেকে খারাপতরো খবর শুনছি। অনেক অন্যায়ের মধ্যেও তবু একটু ভালো যেন শান্তির পরম ছোঁয়া বুলায়। আমরা মেয়েরা আর একবার মাত্র ভাবি, কিছু মিস হয়ে যাচ্ছে না তো! আমার মেয়ে, বোন, পরিবার কিম্বা পাশের- দুরের কেউ শোষিত হচ্ছে না তো! বিশ্বাস’টাকে রেখে অবিশ্বাস আর সন্দেহ’টাকেও দাম দেই, হয়তোবা সেকেন্ড থট’ই বদলে দিতে পারে আমাদের জীবন।
কাশফি জামান শ্যামা, জুভেনাইল কাউন্সিলর, কিশোর ও কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র
শেয়ার করুন:
  • 11
  •  
  •  
  •  
  •  
    11
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.