শারীরিক প্রতিবন্ধীর চেয়েও বড় যে প্রতিবন্ধী

তামান্না ইসলাম: কিছুদিন আগে এক জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গেছি। বাচ্চাটার প্রথম জন্মদিন। তাই আয়োজন বেশ বড়। বেলুন, কেক, জন্মদিনের বিশেষ ডেকোরেশনের সাথে আছে একজন প্রফেশনাল ক্যামেরা ওম্যান। এই দেশে এই এই বিষয়টি আমার খুব ভালো লাগে।

এই মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারছি না যে  কোন কাজ শুধু ছেলেদের বলে আলাদা করা আছে কিনা। অলিখিত কিছু ব্যাপার হয়তো আছে, কিন্তু লিখিত, প্রকাশিত কিছু কখনো দেখি নাই। হয়তো মেয়েদের অনেক নিরাপত্তা বেশি, সেটাও একটা কারণ। তাই অনায়াসে মেয়েরা সকুলের বাস চালায়, ট্যাক্সি চালায়, উবার চালায়। ক্যামেরা ওম্যানের কাজ করে। আবার মানুষের  বাড়ি পরিষ্কারের কাজ করতে ছেলেরাও আসে অনেক সময় মেয়েদের সাথে।

তামান্না ইসলাম

ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, বাড়ি-ঘর নির্মাণের কাজ, রাস্তা মেরামতের কাজ, ভারী আসবাবপত্র ডেলিভারির কাজ, মানুষের বাগান পরিষ্কারের কাজ মেয়েদেরকে তেমন একটা করতে দেখি নাই। তবে ছেলেদেরকে মেয়েদের দোকানে নখে নেইল পলিশ লাগাতে দেখেছি, মেকআপ করতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না যদিও। মোদ্দা কথা, যোগ্যতা আর আগ্রহ থাকলে  তুমি সব কাজই করতে পারো, কোন বাঁধা নেই। ব্যায়াম করে সিক্স প্যাক বানিয়ে যদি তুমি ছেলেদের মতো শারীরিক শক্তি প্রমাণ করতে পারো, যদি তুমি আগ্রহী হও, তাহলে বাড়িঘর বানাতে পারো বৈকি, কেউ আটকাবে না।  

সেকথা যাক, বলছিলাম যে মেয়েটির কথা, তার গল্পে ফিরে যাই। প্রথম দেখায় বিশেষ কিছু চোখে পড়ে না, অন্যান্য ক্যামেরা ম্যান বা ওম্যানের মতই বিশাল ক্যামেরা, লেন্স, ঝোলা  ঝুলি সঙ্গে। আমারা সবাই মহা আগ্রহে তার পিছনে লাইন দিচ্ছি। হটাত খেয়াল করে দেখলাম মেয়েটির একটা হাতের প্রায় সব আঙ্গুলই অসম্পূর্ণ, একটা আঙ্গুল আছে কোন রকমে। আমার কৌতূহল বেড়ে গেল। এক হাতে কীভাবে কাজ করছে। আরও ভালো করে খেয়াল করে একেবারেই অবাক হয়ে গেলাম। ওর দুহাতেরই একই অবস্থা। দুটো হাতের পাঞ্জা আর দুটো মাত্র পূর্ণ আঙ্গুল দিয়ে সে অবলীলাক্রমে ছবি তোলার কাজ করে যাচ্ছে নিখুঁত ভাবে। আসলে নিখুঁতের চেয়েও ভালো করছে। শুধু নিজের ক্যামেরায় ছবি তুলেই শেষ নয়, সে জানে বর্তমান যুগের অনেক মহিলাই তাদের সেল ফোনেও ছবি তুলতে চায়। তাই সে নিজের আগ্রহে ক্যামেরায় ছবি তোলার পরও পাঁচ-ছয়টা মোবাইলে ছবি তুলে দিচ্ছে। অন্য দশটা প্রফেশনাল ক্যামেরা ম্যান বা ওম্যান কিন্তু এই অনুরোধ এড়িয়ে যায়।

তার রসবোধও প্রবল। আমি আমার বরকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছি ছবি তুলতে, যথারীতি সে ঘো ঘো করছে, তবে পুরোটাই বাংলায়। মেয়েটি সাথে সাথে বুঝতে পেরে তাকে বেশ কর্তৃত্বের সুরেই বললো, ‘কিছু করার নেই, তুমি যেহেতু একজনের স্বামী, এটা তোমার একটা দায়িত্ব (তাকে খুশি করা)।’  তারপর আমাদের দুজনকে সুন্দর স্পটে দাঁড় করিয়ে তার কাজটি সে যত্নের সাথেই করলো।

খাবার সময় কাঁটা চামচ দিয়ে খুব মজা করে অতিরিক্ত মশলাদার ঝাল বাঙ্গালি খাবার খেলো একটুও অনুযোগ না করে। আমি সর্বক্ষণই মেয়েটিকে খেয়াল করছিলাম। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে, প্রতিটি রূপ, রস, গন্ধকে যেন কানায় কানায় উপভোগ করছে। অল্প বয়সী হাসি খুশি, ছোটখাটো একটা মেয়ে। কিন্তু কী বিশাল তার মনের জোর।

এই মেয়েটি তার কাজের জন্য ঘণ্টা দুই বা তিনে উপার্জন করেছে তিন শ ডলার, অর্থাৎ ঘণ্টায় একশ থেকে দেড়শ ডলার। তার কোন খরচ নেই এই কাজে, শুধু ক্যামেরা আর আনুষঙ্গিক জিনিস কেনা আর তার নিজের যাতায়াত ছাড়া। বাড়তি লাভ, একটি আনন্দঘন পরিবেশে, নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতির মানুষের সাথে পরিচয় হলো, নতুন ধরনের খাওয়া। হয়তো সে প্রতিদিন এভাবে আয় করে না। হয়তো শুধু ছুটির দিনগুলোতেই সে মাঝে মাঝে কাজ পায়। তার পরেও কিন্তু এই আয়টা খারাপ না।

সবচেয়ে বড় কথা কোন মানসিক বা সামাজিক বাঁধা তার জীবনকে একটুও থামিয়ে দিতে পারেনি। আর তাই, অনেকখানি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটা জীবন কাটাচ্ছে, জীবন নিয়ে আর দশটা সাধারণ মানুষের মতই স্বপ্ন দেখছে। আসলে শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ একজন অসম্পূর্ণ মানুষ, সে স্বাভাবিক সব কাজ করতে পারবে না, এই মানসিক প্রতিবন্ধকতাই তাদের জীবনকে শুরু থেকেই অনেকখানি পিছিয়ে দেয়। এই মানসিক বাঁধাটাকে অতিক্রম করতে পারলে, এদের জীবন পাল্টে  দেওয়া সম্ভব।

শেয়ার করুন:
  • 80
  •  
  •  
  •  
  •  
    80
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.