স্বপ্নঘুড়ির নাটাই যখন অন্য হাতে ….

সাবিহা সুলতানা: ভদ্রলোক যথেষ্টই স্মার্ট। দেশের স্বনামধন্য একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করে এখন একটি মোবাইল কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। থাকেন ঢাকার একটি অভিজাত এলাকায়। দুই সন্তানের গর্বিত পিতা, পাশে তার উচ্চশিক্ষিত সুন্দরী স্ত্রী।
খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিং ছেড়ে এসেছেন বলে একটু উসখুশ করছিলেন। যাই হোক, যথাসময় তাকে ডাকা হলো। স্ত্রী, কন্যা নিয়ে প্রবেশ করলেন তিনি। কী করেন জিজ্ঞাসা করতেই ইংলিশ বাংলা মিলিয়ে গড়গড় করে আউড়ে গেলেন তার প্রোফাইল। কী প্রফেশনে আছেন, কতো বড় রেসপনসিবিলিটি তার কাঁধে ইত্যাদি ইত্যাদি।
সাবিহা সুলতানা

নিজের হাই প্রোফাইল বর্ণনায় তার চোখে-মুখে যে পরিতৃপ্তি খেলা করছিল তা বেশ দেখার মতো। অবশেষে তিনি একটু দম নিতে থামতেই তার স্ত্রীকে জিজ্ঞ্যেস করা হলো ঊনি কোথায় পড়াশুনা করেছেন, জানা গেল বেশ ভাল একটি সাব্জেক্টেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীটা তিনি অর্জন করেছেন। এখন কি করছেন জিজ্ঞেস করতেই ছোট্ট একটি উত্তর আসলো “হাউজ ওয়াইফ “( সেইসাথে কি একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস? নাকি আমার ভুল? জানি না)।

সাথে সাথে ভদ্রলোক আবার স্বরব “না না ও চাকরি করে না, ও হাউজ ওয়াইফ। ও আসলে চাকরি করতে চেয়েছিল, আমি করতে দেইনি, বলেছি চাকরি করে কী করবে? বাচ্চা কাচ্চা দেখাশোনা করো। ওটাই আসল কাজ। বুঝেনই তো, মায়েরা চাকরি বাকরি করলে বাচ্চারা মানুষ হয় না। আসলে মহিলাদের জন্য বাচ্চাকে সময় দেয়াই তো আসল কাজ, হা হা হা …।” আমি তাকালাম ভদ্রমহিলার মুখের দিকে… ঠোঁটে তার স্মিত হাসি আর চোখ … হয়তো বা সেখানে একসময় অনেক স্বপ্নরা খেলা করতো কিন্তু আজ ঠোঁটের সাথে সম্পূর্ণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে তার কোনে কি একবিন্দু জল চিকচিক করে উঠলো? নাকি আমারই মনের ভুল?
ও হো বলাই তো হলো না, ভদ্রলোক আমাদের স্কুলে এসেছিলেন তার দুই কন্যাকে ভর্তি করতে কারণ তাদেরকে যে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে, আর এই কম্পিটিশনের যুগে টিকে থাকতে হলে ইংলিশের তো কোন বিকল্প নেই, তাই তো তার অনুরোধ তার কন্যারা যেন আমাদের স্কুলে ইংলিশ ভার্সনে পড়ার সুযোগ পায়। এত ব্যস্ততার মাঝেও গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ফেলে তাই তিনি এসেছেন শুধুমাত্র তার কন্যাদের কথা চিন্তা করে। এবার আমি তাকাই তার চোখের দিকে, সেখানে কন্যাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কত রঙ্গিন স্বপ্নই না খেলা করে।
আর আমার বেয়ারা মনে শুধু একরাশ প্রশ্ন খেলা করে, এই যে তিল তিল করে তার কন্যাদের মাঝে তিনি স্বপ্নের বীজগুলো বপন করে চলেছেন, তার উচ্চশক্ষিত কন্যাদের সেই স্বপ্নগুলো আবার তার মতোই কেউ এসে ভেঙ্গে দেবে না তো? তার মতোই কেউ এসে তাদের স্বাধীনভাবে ভাবার ক্ষমতাটুকুতে রাশ পরিয়ে দিবে না তো? তখন আজ তার যে চোখে কন্যাদের জন্য স্বপ্ন চিকচিক করে, কন্যাদের স্বপ্ন ভাঙ্গার কষ্ট আবার সেই দৃষ্টিকে কখনো ঘোলাটে করে দিবে না তো?
কী জানি?
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.