বৈরী সংসারও যখন আটকাতে পারে না মেয়েটিকে – ৫

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী: গত বছর বইমেলায় প্রায় একযুগ পরে তিথির সাথে দেখা।  কানিজ খেয়াল করেনি। আচমকা পেছন থেকে এসে চোখ টিপে ধরে হাসছিলো তিথি। আগের মতোই সুন্দর, ঝকঝকে হাসি। অনেকদিন পর কথা হলো, চা খাওয়া হলো।

তিথিকে দেখে অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো কানিজের। সেই একযুগ আগের কথা।

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী

অফিসে ঢুকেই সোজা টি রুমে ঢোকে কানিজ। বেশ আগেই পৌঁছে গেছে আজ। এরকম আগেভাগে অফিসে পৌঁছাতে পারলে সেদিন খুব ফুরফুরে লাগে। দেরি হলে একদিকে যেমন কাঁচুমাচু হয়ে ঢুকতে হয়, তেমনি অলিখিত

“কারণ দর্শাও” নোটিশের মোক্ষম জবাব কী হতে পারে, এই দুশ্চিন্তাতেই দিনের শুরুটা মাটি।

আজকের মতো চনমনে দিনগুলো কাজে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। করিতকর্মা হানিফের হাতের এক কাপ চা না খেলে এই অফিসে সবার যেন সকালটাই বৃথা! কানিজের মতো অন্য যাদের ব্যবহারে হানিফ সন্তুষ্ট, তাদেরকে দেখলে অতিশয় ভক্তির সাথে চায়ের জায়গায় ফেনা তুলে কফিও দেয় অনেক সময়। টি রুমের বাইরে থেকেই কফির কাপে ফেনা তোলার জন্য চামচের টুংটাং আওয়াজ কানে এলো। এতো সকালে তার আগেও কেউ এসে পড়েছে ভেবে খানিকটা অবাকই হয় কানিজ।

তিথি স্কুলের বাচ্চাদের মতো টি রুমের এক কোণের টেবিলে হেড ডাউন করে বসে আছে। কানিজ হানিফের হাতে লাঞ্চবক্সটা দেয়।  কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে তিথির মুখোমুখি বসে।

: কী ব্যাপার? তিথি শরীর খারাপ না কি?

এবার তিথি মুখটা তোলে।  

সবসময় ওয়েল ড্রেসড, ফরমাল ভাবে অফিসে আসা তিথি তুলনামূলক সাদামাটা পোশাকে, আই  লাইনার ছাড়াই এসেছে আজকে,  কিছুটা অবিন্যস্ত দেখাচ্ছে তাকে। শুধু পোশাকই না,  কাজেও তিথি খুবই  দায়িত্বশীল, তৎপর। বাচ্চা একটা মেয়ে, চেহারায় তথাকথিত আহামরি কোনো সৌন্দর্য নেই  কিন্তু তার আত্মবিশ্বাস আর ব্যক্তিত্ব চোখে পড়ার মতো। এখনো বিয়ে করেনি তাই অফিসের সবাই মজা করে তার নামের আগে ” দ্যা মোস্ট ইলেজবল ব্যাচেলর ” কথাটি জুড়ে দিয়েছে।

: না কানিজ আপা। এমনিই..

: সকালে নাশতা করিনি, আসো নাশতা করি একসাথে। ” হানিফ, ওই ব্যাগ থেকে ব্রেকফাস্ট বক্সটা বের করো। কফিতে চিনি দিবা না.. “

এবার তিথির দিকে মনোযোগী হয় –

: কী হয়েছে মেয়ে তোমার?? রেস্ট নিতে আজকে! তোমাকে এরকম মনমরা হলে মানায় না তিথি। তোমার বলতে ইচ্ছে হলে শেয়ার করতে পারো ।

: ওইদিন আপনাকে বললাম না , ওই যে এক ইঞ্জিনিয়ার ছেলে, ক্যানাডাতে থাকে, আম্মা এখন বিয়ে দেয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছে, বলেন তো! আমার তো সহ্যই হচ্ছে না কানিজ আপা! আমি তো প্রথমেই রাজি হইনি যখন এক গুষ্টি লোক নিয়ে সেই আদ্যিকালের মতো পাত্রী দেখতে এসেছে!!..

টি রুমে এই দৃশ্যটা তাদের কাছে নতুন কিছু না। প্রত্যেকদিন সকাল – বিকাল অফিসে নয়জন নারী সহকর্মীর কাউকে না কাউকে টি রুমে এভাবে দেখা যায়। কানিজও যেদিন রাগ করে বাসা থেকে বের হয়, প্রায় এরকমভাবেই এসে বসে থাকে চুপচাপ। ফোনে ফোনে বাড়িতে সন্তানের খাওয়া, ঘুম, স্কুল থেকে ফেরা ইত্যাদি সংসারের খোঁজখবর রাখা, সন্তানের বাবার সাথে মনোমালিন্য, ঝগড়াঝাঁটি – ছোট বড়,  প্রাত্যহিক  বহু ঘটনা – দুর্ঘটনার সাক্ষী এই টি রুম। এ যেন অনেকটা অভিনয় মঞ্চের পেছনে থাকা গ্রিনরুমের মতো। ব্যক্তিগত জীবনের সব দুঃখ-বেদনার ছায়া গ্রিনরুমে ফেলে তাবড় তাবড় অভিনেতারা নিখুঁত অভিনয়ে যেভাবে মঞ্চে উঠে দর্শক মাতান, ঠিক সেরকম। রোজকার সংগ্রাম আর জটিলতা এখানে জলাঞ্জলি দিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া।  নয়টা – পাঁচটা সুনিপুণ অভিনয়ে নিজেকে আড়াল করা।

তিথির সাথে সেদিন অনেক কথা হয় কানিজের। সকালবেলা অফিসের টি রুমে শুরুটা হলেও পরে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তিথির জীবনের বাকি গল্পটুকু শোনার জন্য অফিসের পর নিরিবিলি একটা ক্যাফেতে গিয়ে বসে তারা। বছর খানেক ধরে একই অফিসে কাজ করলেও প্রাণোচ্ছল তিথির সব পারফেকশনের আড়ালে যে প্রতিনিয়ত এক বৈরী সংসারে লড়াইয়ের গল্প লুকিয়ে ছিলো, কে জানতো!

তিথির মা খুব একগুঁয়ে আর সেকেলে ধ্যান-ধারণার মানুষ। তিথি আর তার বড় ভাইয়ের মধ্যে ছোটবেলা থেকে তিথি লেখাপড়ায় অসম্ভব মেধাবী। কিন্তু বরাবরই সব বিষয়ে ছেলেকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে মা। তিথির বাবা  শান্তিপ্রিয়, নির্ভেজাল একজন ভদ্রলোক। তিথির লেখাপড়া থেকে এপর্যন্ত আসা অবধি কোনো কিছুতেই মায়ের কোনো আগ্রহ ছিলো না।

তিথির ভাই তমাল খুবই অলস গোছের, না লেখাপড়ায় মনোযোগী হয়েছে, না কাজে-কর্মে। বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা, সারাদিন আড্ডবাজি আর বাবা বাড়িতে না থাকলে প্রায়শই মেয়ে বন্ধুদের বাড়িতে এনে ডেট করাই তার কাজ। আম্মা সবই জানে, তবু ছেলেকে নিয়ে আদিখ্যেতার অন্ত নেই। এখনো মধ্যবয়সী অকর্মা ছেলের জন্য ঘিয়ে ভাজা পরোটা – ভুনা মাংস আর ডিমের হালুয়া বানিয়ে সকাল শুরু হয় তার। গোপনে নিজের জমানো টাকা থেকে ছেলের পাওনাদারের টাকা পরিশোধ করতে করতে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত।

তিথির ভবিষ্যৎ সুন্দর করার জন্য বাবাই কীভাবে যেন পথের সব জঞ্জাল দু’হাতে সরিয়েছেন সারাটা জীবন। উৎসাহ দিয়েছেন মেয়ের জীবন ছেড়ে মানুষের মতো বাঁচতে।

তিথি ক্লাস নাইন – টেনে পড়ার সময় থেকে আম্মা কানের কাছে বিয়ে বিয়ে করে মাথাটা খারাপ করে দিতেন। আত্মীয়-স্বজন কেউ এলে, কোথাও বেড়াতে গেলে তিথির জন্য পাত্র দেখতে বলতেন। তার ভাষায়, “তিথির আব্বু, মেয়েরে এতো লেখাপড়া শিখায় কী হবে?  বিয়েথা করে সংসার ধর্ম করুক, বাচ্চা-কাচ্চা মানুষ করুক।” এছাড়াও তার ধারণা, গায়ের রঙ ” ময়লা” হলে আর অতিরিক্ত শিক্ষিত হলে সেই মেয়েদের কেউ বিয়ে করতে চায় না!

এসবের মধ্যে দিয়েই তিথি সামনে এগিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে চাকরিতে জয়েন করেছে। সংসারে আর্থিক দায়িত্বগুলোও সে চেষ্টা করে পালন করতে, কিন্তু আম্মার সাথে কোথায় যেন একটা দূরত্ব রয়ে গেছে।

এর আগে অনেকগুলো বিয়ের প্রস্তাব তিথি আর তার বাবা মিলে ভেস্তে দিলেও, এবার আর পারা যাচ্ছে না। ক্যানাডা প্রবাসী এই ছেলের পরিবারের সাথে তিথির মা সব কথা পাকাপাকি করে বসে আছে। আর এই ছেলে বিয়ের আগেই নানান শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, যেগুলোর অন্যতম হলো তার যেহেতু টাকা-পয়সার কোনো অভাব নেই, তাই মেয়ের চাকরি করার কোনো দরকার নেই এবং মেয়েকে পর্দা করতে হবে।

তিথির বাবা রাগের চোটে পারলে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। মাও খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে অনশন শুরু করেছে। সবটা জেনে কানিজ কী বলবে বুঝে পায় না। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে তিথির পিঠে হাত বোলায় ঠিক বড় বোনের মতো করে। বলে,

“তিথি, আমার দেখা একজন অসম্ভব সাহসী মেয়ে তুমি। তোমার জীবন তোমার পথেই চলুক। সামনে হয়তো পথ এর চেয়েও অনেক কঠিন, তবু হাল ছেড়ো না।”

কানিজের সাথে একটা চমৎকার সম্পর্ক গড়ে ওঠে তিথির। সেখানে সহকর্মীর সম্পর্ক ছাপিয়ে পরম আস্থা আর নির্ভরতার জায়গা।

এর বেশ কয়েকমাস পর তিথি একটা আন্তর্জাতিক সংস্থায় ভালো চাকরি পেয়ে সুইচ করে। কথা হতো মাঝে-মধ্যে।

শুনেছে দেশের বাইরেও ছিলো কিছুদিন। তারপর একটা লম্বা বিরতি।

বইমেলায় সেই তিথি। বিয়ে সে করেছে ঠিকই, নিজের পছন্দের মানুষকে। গবেষণার কাজে তিনিও দেশের বাইরে আছেন আপাতত। তিথির মুখ থেকেই শোনা, কেউ কারো ক্যারিয়ারে হস্তক্ষেপ করে না ওরা। সন্তান নেই ওদের। তা নিয়ে খুব চিন্তিত নয় তিথি আর ওর জীবনসঙ্গী।

তমাল বিয়ে করে বউ-বাচ্চা নিয়ে শ্বশুরের টাকায় দুবাইতে পাড়ি জমিয়েছে। কালেভদ্রে মায়ের খোঁজখবর নেয়।

তিথির মা তিথির সাথেই থাকেন। বয়স বেড়েছে। শরীরটা ভালো যায় না। তিথিই তাকে দেখেশুনে রাখে। দায়িত্বে হেলা করার অভ্যেস আজো নেই তিথির।  কখনো কখনো গভীর রাতে তিথি তার মায়ের গায়ে কাঁথা টেনে দিতে গেলে মেয়ের হাত ধরে ফেলেন। তিথি বুঝতে পারে তার হাত ভিজে যাচ্ছে। ভেজা হাতে মায়ের কপালে হাত বুলিয়ে ফিরে আসে নিজের ঘরে। যেন সেই মা, আর আম্মা তার মেয়ে।

তিথির বাবা হঠাৎ একদিন শান্তির ঘুম ঘুমিয়ে আর ওঠেননি। তবে মেয়েকে তিনি “মানুষ” ঠিকই করে গেছেন।

তিথি সেদিন বইমেলায় জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতার বইয়ে প্রিয় কবিতার লাইন লিখে দিয়ে বিদায় জানিয়েছিলো। আজ ছুটির অবসরে বইয়ের পাতা উল্টাতে আবারো চোখে পড়লো লেখাটাতে –

” এখানে নক্ষত্রে ভরে রয়েছে আকাশ,

সারা দিন সূর্য আর প্রান্তরের ঘাস ;

ডালপালা ফাঁক ক’রে উঁচু উঁচু গাছে ;

নীলিমা সিঁড়ির মতো সোজা, আঁকাবাঁকা হয়ে আছে/

যে যাবে যে – যে যেতে পারে তার; নিচে রোদের ভিতরে /

অনেক জলের শব্দে দিন

হৃদয়ের গ্লানি ক্ষয় কালিমা মুছায়ে

শুশ্রুষার মতো অন্তহীন।”

কানিজের জানালার বাইরে তারা ভরা রাতের আকাশে উদাস চেয়ে ভাবে, আহা! সব মেয়ে যদি তিথির মতো “গ্লানি ক্ষয় কালিমা ” মুছাতে আপন হৃদয়ের শুশ্রুষা করতে পারতো ! দেখতে পেতো নক্ষত্রে ভরে থাকা তাদের আকাশ!

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.