সন্তানকে গুরুত্ব দেয়াটা কেন জরুরি

কাশফি জামান শ্যামা: পরিসংখ্যান বলে, বহির্বিশ্বে প্রতি চারজনে একজন মেয়ে এবং প্রতি আটজনে একজন ছেলে মানসিক, শারীরিক ও মৌখিক নির্যাতনের শিকার। আমাদের দেশে এই সংখ্যা যথাক্রমে প্রতি দুজনে একজন এবং প্রতি সাতজনে একজন।
হতাশাজনক……সর্বোপরি কষ্টদায়ক। কিন্তু কেন?

আমাদের সাইকোলজির ভাষায় এই নির্যাতনের একটা নাম আছে, “CHILD ABUSE”. ABUSE কী? এটা অনেক সচেতন বাবা-মাও জানি না, এটা না জানা অপরাধ নয়, কিন্তু জানতে না চাওয়া নিঃসন্দেহে গুরুতর অন্যায়।
ছোট করে শিশু নির্যাতনের ধরনগুলো তুলে ধরছি। সামান্য হলেও হয়তো আমরা সবাই উপকৃত হবো।

প্রত্যাখ্যান: শিশুকে দূরে সরিয়ে রাখা, তার উপস্থিতি উপেক্ষা করা। ‘বাবু, যাও তো খেলো গিয়ে, দেখছো না আব্বু-আম্মু জরুরি কথা বলছি’- হয়তো সন্তানটি তার সাথে হয়ে যাওয়া কোনো সমস্যার কথা শেয়ার করতে চেয়েছিল, না বলতে পারায় কথা বা কষ্টটা চাপা পড়ে যায়। কিন্তু সত্যি কি চাপা পড়ে? উপেক্ষা শিশুকে অসহায় করে তোলে, আর অসহায়তা শুরু করে নানা সমস্যার।

অবজ্ঞা: ‘তুমি একটা স্টুপিড, বুঝছি তোমার মতো গাধার দ্বারা এই কাজ অসম্ভব, আমি আগেই জানতাম আমি ছাগল জন্ম দিয়েছি’….. বকা দেয়ার কত-শত ফর্ম আছে আমাদের! আর গালি- গালাজের অভ্যাস তো আমাদের অনেকের অজান্তেই আছে। সন্তানকে উৎসাহ দেয়া, তার কাজে সহায়তা, মাঝে-মধ্যে তার ভুলগুলোকেও ভালোর শুরু বলে সান্ত্বনা দেয়া, এসবই তাকে সেল্ফ- কনফিডেন্স দিবে, সবাই প্রথম হতে পারবে না, কিন্তু জীবনের পথে এগিয়ে চলাও অনেক বড় সাফল্যের।

আতঙ্ক: ‘আজ তোর একদিন কী আমার, মার তো খাওনি খেলে বুঝবা’…. আমরা মায়েরা অনায়াসেই কথাগুলো বলে ফেলি, কিছুটা রাগে, শাসনে, ভালবাসায়। কিন্তু এটার এক্সট্রিম রুপ অনেকই হয়তো পত্র-পত্রিকায় পড়েন, ক্রাইম সিরিয়াল গুলোতেও হরহামেশা দেখানো হয়। বাচ্চাকে ভয়ানক শারীরিক নির্যাতন, শক্তিপ্রয়োগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত করে তোলে।

একাকিত্ব: বাচ্চাকে কোন বাবা-মা না ভালবাসেন, কিন্তু অনেক সময় এই ভালবাসা অতিমাত্রায় প্রকাশ পায়, সেল্ফ অবসেশনে রুপ নেয়। সন্তানকে সমস্ত রকম সমস্যা আর কষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রাখতে অনেক সময় তাকে তার স্বাভাবিক সামাজিক নিডস থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়, এখান থেকে সোশ্য়াল করস্পন্ডেন্স ডিসএবিলিটি সৃষ্টি হয়।

শোষণ: আমার জন্য এটা ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন। শুধু এটুকু বলি, সন্তান যদি পিতা- মাতা দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তার থেকে হৃদয়বিদারক আর ঘৃণিত অ্যাক্ট আর হতেই পারে না। একই কথা প্রযোজ্য কাছের কোনো স্বজন দ্বারা যদি শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর পুরো ব্যাপারটা যদি বাবা – মা’র দৃষ্টির অলক্ষ্যে ঘটে।

উদাসিনতা: ‘ছেলেটার প্রায়ই মাথাব্যথা করে,,,,মায়ের মনে হয় পড়া থেকে ফাঁকির বাহানা, ‘আব্বু, আমি আজ স্কুলে যাবো না প্লিজ…’ বাবা রেগে ভাবেন অপদার্থটার পিছে হাজার টাকা গচ্ছা! হয়তো বাচ্চাটার চিকিৎসা প্রয়োজন, হয়তো বাচ্চাটার আদর দরকার, কিম্বা হয়তো বা বাচ্চাটাকে কোনকিছু পেরেশান করছে, সে বুঝিয়ে বলতে পারছে না। তার কথাটার গুরুত্ব দিন, তাকে মনের কথা বলার, তার অপছন্দ এক্সপ্রেস করবার স্পেস দিন।

পারিবারিক কলহ: দৈনন্দিন জীবনে খটোমটো হবে না, এটা অস্বাভাবিকতা, কিন্তু সন্তানের সামনে এই অপ্রাপ্তি, গ্লানি আর দোষারোপের সিরিয়াল যত কম টেলিকাস্ট হবে, তার মনোজগতের জন্য ততোই স্বাস্থ্যকর হবে।

কঠিন বাক্যবাণ: ‘ তুই মরতি আমার শরীর জুড়াতো, তোকে জন্ম দেয়াই আমার পাপ, আমার জীবনের দুইটা ভুলের একটা হলো তোর মাকে বিয়ে করা, আরেকটা তোকে হাসপাতালেই শেষ করে না দেয়া…” অসংখ্য অসংখ্য উদাহরণ আছে এমন বকাবাদ্যির। বাচ্চার মনে আঘাত দেয়া বেশ সহজ, কিন্তু ইন-রিটার্ন আরও বড় আঘাত অপেক্ষায় আছে আমাদের জন্য।

এই ত্রুটি অবশ্যই পরিহার্য। পর্যাপ্ত ভালবাসা, আদর আর তার সুরক্ষা প্রদান অবশ্যই সন্তানের অধিকার। এই বিশ্বাস, এই নীতি অটুট থাকুক, দুধে ভাতে না হলেও আমাদের সন্তানেরা সসম্মানে, কনফিডেন্স আর ন্যায়- অন্যায় বোধের জ্ঞান নিয়ে বেড়ে উঠুক। বাবা-মাকে শত্রু নয়, তার প্রিয়জন ভাবুক।

আপনাদের সকল বাবা মার প্রতি নিবেদন, যদি মনে হয় ভুল করেছেন তাহলে একটা ভুল হজম করে চলুন, জাহির করে দ্বিতীয় ভুলটি করবেন না। দ্বিতীয়টি তৃতীয়, তৃতীয়টি চতুর্থ…..ভুলের মাত্রা আর সংখ্যা কিন্তু কমবে না, বরং বাড়তেই থাকবে।

কাশফি জামান শ্যামা,
জুভেনাইল কাউন্সিলর, কিশোর ও কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.