মানুষ যেখানে ধর্মের আগে চলতো

আজমেরী সুলতানা ঊর্মি: ছেলেবেলায় গ্রামের বাড়িতে গেলে বাড়ির সব ঘরে ঘরে আমাদের দাওয়াত থাকতো! আর আমি তো সারাক্ষণই এবাড়ি-ওবাড়ি টই টই করে ঘুরে বেড়াতাম।
গ্রামের বৌ-ঝিরা, এমনকি শিশুরাও যে কী পরিমাণ কর্মঠ হয়, সেটা আসলে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না!
সেই কাকভোর থেকে শুরু হতো তাদের কাজ। কত শত কাজ। সবাইকে মনে হতো দৌড়ের ওপরে জোরে জোরে ডাকাডাকি করতে করতে কাজ করছে।

আজমেরী সুলতানা ঊর্মি

আমার দাদী ভোরে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে ফজরের নামাজ পড়ে, কিছুক্ষণ কোরানপাঠ করতেন। তারপর মস্ত উঠান নিজের হাতে ঝাড়ু দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকতেন। মা, চাচী, দাদী মিলে হাতে হাতে রান্না করতেন। একটা ঘরে পাটি বিছানো হতো , সারি সারি থালা গ্লাস রাখা হতো। প্রথমে ক্ষেতের চালের ধোঁয়া উঠা গরম ভাতের সৌরভে ভরে উঠতো ঘর, তারপর বড় বড় জামবাটিতে করে আসতো শিমের বিচি দিয়ে শোলমাছের (যা সকালেই পুকুর থেকে ধরা হয়েছে) ঝোল, লাউপাতার ভর্তা, মাষকলাই এর ঘন ডাল মাছের মাথা দিয়ে আর ঘরের পাশের মাচা থেকে সকালেই ছিড়ে আনা মাখনের মতো কচি লাউ দিয়ে কুঁচো চিংড়ি।

বাড়িতে আমার দাদা আসলে ঘুরে বেড়ানো আর শুয়ে বসে উচ্চস্তরের দার্শনিক চিন্তা-ভাবনা ছাড়া তেমন কিছুই করতেন না। দাদী রাগ করে বলতেন, “বাদাইম্মা” ! পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বিশাল পরিমাণ জমিজমা থেকে পাওয়া ফসল বিক্রির টাকা দিয়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ আর সংসার,পুরোটাই দাদী চালাতেন।
বর্গা চাষীরা ফসল এনে উঠোনে ফেলতেন…আমার দাদী আর তার বাহিনী মিলে সেই ফসল গোছাতেন। উঠোনের একপাশে ইট দিয়ে বড় বড় চুলা বানিয়ে তাতে বিশাল ডেকচিতে করে ধান সেদ্ধ করা হতো, চাটাই পেতে সেই ধান রোদে শুকানো হতো এসব কাজই দাদী, আর বাড়ির বৌ-ঝিরা মিলেমিশে করতেন। সবাই এক প্যাঁচ দিয়ে আটসাঁট করে কাপড় পরা, চুল হাতখোঁপা করা, খালি পা।

এই বাড়ি, ওই বাড়ির নারী-পুরুষ সবাই খলখলিয়ে কতো কথা বলতো, ফসল সংক্রান্ত অথবা অন্য সব দরকারি কিংবা হাসি ঠাট্টা ….হইচই !
সব যেনো ছবির মতো ….একদম টলটলে দীঘির মতো পরিষ্কার দেখতে পাই।

বাড়ির পাশেই মসজিদ আর মাদ্রাসা। আজান শুনতে পেলেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি বেলায় বাড়ির বউ ঝিরা অযু করে নামাজ পড়তেন। বয়স্ক পুরুষরা কেউ কেউ মসজিদে যেতেন, তবে কর্মঠ বা কাজ নিয়ে ব্যস্ত পুরুষের সংখ্যা খুব কম। হয়তো শুক্রবারে তারা মসজিদে যেতেন। এবং এটাই ছিলো খুব স্বাভাবিক। এ নিয়ে কেউ কিছু বলতো না। এমনকি ডাড়ার মুরুব্বী বা মসজিদের হুজুরেরাও না।

গ্রামের একদিকে ছিল হিন্দু পাল দাদাদের বসবাস। ওদের বাড়িতে রোজ যেতাম গাছের চাঁপাকলা আর পেয়ারা খেতে, জবা ফুল আনতে। ওদের বউ-ঝিরাও রোজ বিকেলে আমাদের বাড়িতে এসে গপ্পো, হাহা হিহি করতো। শিবু দাদা আর আমার দাদা একটা তামুক অথবা হুক্কো ভাগাভাগি করে খেতো। পাশাপাশি চুপচাপ বসে থাকতো।

এই হচ্ছে আমার গ্রামের গল্প। খুব সাধারণ মাটির কাছাকাছি থাকা মুসলমান প্রধান গ্রামের গল্প। বাংলাদেশের একটি গ্রামের গল্প। যেখানে জীবন এবং মানুষ আগে এবং ধর্ম তার পরে।

আমি আমার গ্রামের বাড়িতে ছেলেবেলায় কোন বৌ ঝি কে দেখিনি কাউকে মাথায় হিজাব অথবা বোরখা পরে ঘুরতে। বাইরে বেরুলে একটা মিষ্টি ঘোমটা হয়তো থাকতো, কিন্তু হিজাব জিনিসটা তো ছিলো না। বোরখাও না, থাকলেও খুব অল্প। আমার দাদী তার সত্তুর অথবা পঁচাত্তর বয়সী জীবনে কোনদিন হিজাব অথবা বোরখা পরেননি।
আর এটাও ঠিক, দাদী কোনদিনও এক ওয়াক্ত নামাজ বাদ দেননি।
তাহলে বলুন তো, এখনকার এই হঠাৎ হিজাবি বিপ্লবের প্রচলনের কারণটা কী?

বলুন তো , আপনি কি আপনার মায়ের কিশোরী অথবা তরুণী বয়সের কোনো ছবি দেখেছেন? তাঁর মাথায় কি কোন হিজাব ছিলো?

তাহলে এখনকার শহর, এমনকি গ্রামের ঘরে ঘরে কী এমন ঘটে গেছে যে, সবাই হিজাব পরছে? ধর্ম কি আগে কম পালন করা হতো? নাকি এখন অতিরিক্ত ধর্মাবলম্বী হয়ে উঠছে সবাই?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.