পুরুষবাদ সম্পর্কে শিক্ষা এখন সময়ের দাবি

সাদিয়া রহমান: ‘নারীবাদ’ নিয়ে কতো কথাই না বলছে সবাই। কিন্তু যে সময়টা চলছে তাতে মনে হচ্ছে সময় চলে এসেছে নারীবাদ ভুলে “পুরুষবাদ” নিয়ে কথা বলার। মাটি থেকে, মন থেকে, সংসার থেকে পুরুষকূলকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে বহুদিন। সমাজ বরাবরই এর পুরুষগুলোর সাথে ভীষণ একতরফা আচরণ করে আসছে! এই সমাজ না দেয় তাদের প্রেমে পড়ার অধিকার, না দেয় ভালোবাসার অধিকার, না দেয় সংসার করার অধিকার; এমনকি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আবেগ; সেগুলো প্রকাশের অধিকারও তাদের নাই! কিন্তু এভাবে কি আজন্ম চলতে পারে?
সাদিয়া রহমান

ছোট থেকেই বাচ্চা ছেলেগুলো জেনে বড় হয়, ছেলেদের কাঁদতে নেই। ছেলেদের শক্ত হতে হয়। ছেলেদের আবেগী হতে হয় না। কী অন্যায়, কী অন্যায়! একটু কষ্ট পেলেও তাদের ভেতরটা হালকা করার কোনো সুযোগ নাই। কেননা আবেগের ওপর সমাজটা শুধু মেয়েদের অধিকার রেখেছে। পুরুষগুলোকে করেছে বঞ্চিত!

না! তাদের কাঁদতে নেই। দুর্বল হয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে নেই। শুধু রূঢ়তাতেই পৌরুষের পূর্ণতা। আর যদি বা কখনো প্রকাশ করে ফেলে তবে সে হয়ে যাবে “মায়াড়ী” বা “হাফ লেডিস”। মেয়েরা টমবয় হতেই পারে, কিন্তু ছেলেরা হাফলেডিস? অসম্ভব। বিলকুল নেহি! হায় হায়! ছেলে হয়ে তুই “লেডিস”? হাফ লেডিস? লেডি হওয়া কতোই না লজ্জার! মেয়েরা টমবয় হতেই পারে। “বয়” হয়েছে, তার ব্যক্তি স্বাধীনতার ব্যাপার, কিন্তু ছেলে হয়ে “লেডি”দের মতন আচরণ আবার কী ধরনের স্বাধীনতার কথা? আর “লেডি”র মত আচরণ-ই বা আবার কীরকম রুচির কথা?
যেমন আমাদের তল্লাটে ছেলেগুলো সেভাবে প্রেমে পড়ে না। তাদের প্রেমে ফেলানো হয়। প্রেমে পড়া কত্ত সুন্দর একটা ব্যাপার, অথচ ছেলেরা নিজ থেকে প্রেমে পড়তে পারে না! কিছু একটা হয়, মেয়েটা কিছু একটা করে দেয় তবেই ছেলেরা প্রেমে পড়ে, তার আগে না। এলাকার সুন্দরীটা রূপে পাগল করে দেয়, প্রেমে পড়তে বাধ্য। এতো গুণবতী মেয়েটা গুণ দিয়েই ছেলেটার মনে সিংহাসন গড়ে নেয় তবেই প্রেম হয়।
প্রিয় বান্ধবীটা? সে তো এতো কেয়ার করে বলেই ছেলেটা না চাইতেও প্রেমের জালে আটকে যায়! ছেলেরা নিজেরা প্রেমে পড়ুক। সেই প্রেম বাঁচাতে নির্ভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ুক। বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সমাজের ধারালো কথা থেকে প্রেমিকাকে রক্ষা করুক। 
তারপর দেখুন, “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে”– দিলে তো? কৌশল করে প্রবাদ বানিয়ে যুগে যুগে সংসারের মতন বিশাল দায়িত্বের জায়গায় ছেলের অবদান অস্বীকার করে, উপেক্ষা করে আবার শুধু রমণীকে কেন্দ্র বানিয়ে দিলে? যে সংসার গড়েই ওঠে নারী-পুরুষ মিলে, তার সুখ আবার শুধু রমণীর ওপর নির্ভরশীল কিভাবে হয়? এ কেমন অন্যায় কথা?
বর্তমানে অবশ্য সমাজ বেশ কিছুটা বদলেছে। যতই নারীদের নায়িকা করা হোক, কিছু সংগ্রামী পুরুষ সমাজকে কাচকলা দেখিয়ে ঠিকই বউ দের পাশাপাশি অফিস করে বাচ্চা আর সংসার সামলাচ্ছে। আর তা করবে না-ই বা কেন? শিক্ষিত হয়ে তারা যে বুঝতে শিখে গেছে চার দেয়াল আর চার দেয়ালের বাইরেটা মিলিয়ে তবেই জীবনে আসে পূর্ণতা।
বহুদিন হয়েছে, “তোমাদের কাজ বাইরে” বলে পুরুষদের আর খুব বেশিদিন পর করে রাখা যাবে বলে মনে হয় না। নাড়ির টানে তারা ঠিকই কদিন পর সংসারের সুখের কৃতিত্বে ভাগ বসাবে। ব্যাপারটা যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নেয়ার আগেই ক্ষমতাধারীদের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এখনো তো ওই পুরোনো প্রবাদই চলছে তাই এটা স্পষ্ট যে ক্ষমতা এখনো নারীদের হাতেই। তাই প্রতিটা কোন থেকে এই যুদ্ধ থামাতে উদ্বুদ্ধ হওয়া দরকার।
মায়েরা ছেলেমেয়েদের নিজেদের মত বড় হতে দিক, “নারী” বা “পুরুষ” এর আগে মানুষ হতে শিক্ষা দিক। বোন হয়ে ভাইকে “মেয়ে মানুষ” শ্রদ্ধা করতে না শিখিয়ে প্রতিটা মানুষ মাত্রেই শ্রদ্ধা করতে শেখাতে হবে। বাড়ির বউ ছেলের অতি আদরের সহধর্মিণী থাকুক। আদর দেবার, আহ্লাদ দেবার অধিকার, বুকের পাটা ঘরের ছেলের থাকুক। শত বছর বাইরে কাটানো পুরুষেরা এবার নিজের শিকড় খুঁজে নিক। নির্ভয়ে, আবেগ দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে জয় করুক নারীর মনটা। সংসারটা হোক তারও।
এই সমাজ নারী-পুরুষ উভয়কেই ছকে ফেলেছে। সেই ছক কোন সময় আর কিসের ভিত্তিতে হয়েছে জানা আছে অথবা জানা নাই। শুধু এটা জানা আছে একবিংশ শতাব্দীতে আজও এই ছক কেউ সেভাবে ভাঙতে পারেনি। এই ছকের চাপে পড়ে নারী-পুরুষের সম্পর্ক বিষাক্ত হয়। আজও সেই ছক নিয়ে মাথা ঠুকতে হয়, কথা বলতে হয়। পরিবর্তন খুব ধীর একটা প্রক্রিয়া। সেটা শুরু হয়ত হয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠা হতে লাগবে হয়তো আরো বহু বছর। সেই একশ বছর আগে বাংলায় “ভগিনী”দের জাগবার ডাক আসলেও আজকেও অনেকেই ঘুমন্ত।
একই কথা বার বার এসেছে, আসবে, পরিবর্তন আনতে হলে এই ভগিনীদেরকেই জাগতে হবে। একে অন্যের পাশে থাকতে হবে। অনেকভাবে ভাবতে হবে, দেখতে হবে, দেখাতে হবে। আর কত বছর বোকার মতন নিজেদের বঞ্চিত ভাবা? যাদের কাজ বাইরে বলে সাধারণভাবে জানা আছে,  তারা কি বঞ্চিত না? তারাও কি শত বছরের পুরোনো ছকে বন্দী না? তাহলে শুধু নারীবাদ নিয়ে বলা আজ আর যথেষ্ট না। আজকের দাবিতে অন্তর্ভুক্ত হোক নতুন অধ্যায় ‘পুরুষবাদ’। নির্দ্দিষ্ট গণ্ডি থেকে বেরিয়ে পুরুষও ‘মানুষ’ হয়ে উঠুক। 
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.