“সব পেয়েছি’র দেশে” নারী নির্যাতনের খণ্ডচিত্র

শাহাব আহমেদ: আমাদের প্রতি বছর কিছু বাধ্যতামূলক ট্রেনিং নিতে হয়। আজ এমনি একটা ট্রেনিং এ যেতে হয়েছিল। টপিক ছিল Domestic violence বা intimate partner violence!

যখন কোনো একজন ইনটিমেট পার্টনার ( বয় বা গার্ল ফ্রেন্ড, স্বামী বা স্ত্রী ) অন্য পার্টনারকে দৈহিকভাবে নির্যাতন করে বা হত্যা করে, সেই ধরনের অপরাধগুলো এই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের আওতায় পড়ে। ডাক্তার হিসেবে আমাদের সামাজিক এই ব্যাধিটি সম্পর্কে নিয়ত চোখ-কান খোলা রাখতে হয় এবং কোনো পরিবারে এর উপস্থিতি সন্দেহ হলে সাথে সাথে রিপোর্ট করতে হয়।

শাহাব আহমেদ

ট্রেইনার মনিকা ব্রায়ান্ট এমন কিছু তথ্য দিলেন যে তাতে গা শিউরে ওঠে। প্রতি তিনটি কিশোর-কিশোরীর (টিনএজ) ভালোবাসার সম্পর্কের একটি হচ্ছে নিপীড়নের সম্পর্ক, প্রতি চারজন নারীর একজন তার জীবৎকালে নিপীড়িত হয় (আর প্রতি সাতজনের একজন পুরুষ)। প্রতি ১৫ সেকেন্ডে একজন পুরুষ একজন নারীকে নির্যাতন করে এবং প্রতি ১৬ সেকেন্ডে একজন নারী একজন পুরুষকে নির্যাতন করে।
প্রতি মিনিটে ২০ জন মানুষ তার সবচেয়ে কাছের মানুষটির দ্বারা নির্যাতিত হয়।

আমাদের ছোট্ট শহরে যেখানে গাছ-পালা, গরু-ঘোড়া, বন আর পাখীর কুজনে খুব শান্তিপূর্ণ মনে হয়, সেখানে ২০১২ সালে ৬৫১টি ,২০১৩ সালে ৫৪০টি, ২০১৪ সালে ৫৭১টি, ২০১৫ সালে ৬৩০টি এবং ২০১৬ সালে ৬৯২ টি রিপোর্টেড কেইস ছিল।

বলা হয় ৬০-৮০ % কেইসই রিপোর্ট করা হয় না। একটি ছোট্ট শহরের এই ডেটা গা শিউরে দেয়ার মতো।

আমাদের জেলার (কাউন্টি) ডেটা- ২০১২ সালে ২১৫৮টি, ২০১৩ সালে ২০২০টি, ২০১৪ সালে ১৯৪৫টি, ২০১৫ সালে ১৯৫১টি এবং ২০১৬ সালে ১৫২৬টি কেইস।

মনিকা সবচাইতে কাছের মানুষের দ্বারা সংঘটিত কতগুলো হত্যাকাণ্ডের কথা বললো। একটির কাহিনী এরকম- 
স্বামীর দ্বারা দীর্ঘদিন নিগৃহীত হবার পর দুই সন্তানের এক জননী শেষপর্যন্ত বিবাহ বিচ্ছেদ নেয়। কোর্ট দুই সন্তানের কাস্টডি ৫০ ভাগ সময় বাবার সাথে এবং ৫০ ভাগ সময় মায়ের সাথে দেয়। অর্থাৎ সন্তানেরা মাসের অর্ধেক সময় বাবার কাছে থাকবে, বাকি অর্ধেক সময় মায়ের কাছে। এই স্বামীটি এখন তার এক বান্ধবীর বাসায় থাকে। একবার সে তার দুই সন্তানকে বাসায় নিয়ে আসে। ওরা যখন ঘুমিয়ে পড়ে সে রাতে যেয়ে তার প্রাক্তন স্ত্রী অর্থাৎ তার দুই সন্তানের মাকে গুলি করে হত্যা করে, তারপর নিজের মাথার খুলিও উড়িয়ে দেয়। (আমেরিকায় যে কেউ বন্দুক রাখতে পারে)।

পরেরদিন ঘুমের থেকে উঠে বাচ্চারা বাবাকে না পেয়ে ফোনের পরে ফোন করতে থাকে, কিন্তু কোনো উত্তর নেই। ফোন করে মাকে, একই অবস্থা। তখন বাবার বান্ধবী দুই শিশুকে নিয়ে ড্রাইভ করে যায় তাদের মায়ের বাসায়। বাসার সামনে দেখতে পায় বাবার গাড়ি, ওরা খুশি হয়ে ওঠে। এ সময়ে ঝুপ ঝুপ করে নামে বৃষ্টি, বাবার বান্ধবী বলে তোমরা ঘরে যাও আমি গাড়ির জানালা বন্ধ করে এখুনি আসছি। বাচ্চারা ঘরে গিয়ে দেখতে পায় রক্তাক্ত ও বীভৎস দৃশ্য।

যাকে “সব পেয়েছির দেশ” বলা চলে, সে আমেরিকায় domestic violence হচ্ছে একটি মহামারীর মতো বিষয়। সমাজের আপাত স্থিতি ও নিরাপত্তার আস্তিনের নীচে এ হলো এক রক্তস্রাবী ক্ষত।

২০০৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিবছর ৮.৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় এই সমস্যার কারণে। বছরে ৮০ লক্ষ কর্মদিন (যা হচ্ছে ৩২ হাজার ফুল টাইম কাজের সমান) নষ্ট হয়।

Domestic Violence রোগটি আসলে মানব জাতির রোগ। শুধু সিস্টেমের নয়। সব শ্রেণীর, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, গরীব , সবার।
তবে নারী নির্যাতন সমাজতন্ত্রেও ছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়নে আমার স্ত্রীর মা’সহ তার চারজন খালা এবং তাদের মেয়েরা সবাই ছিল তাদের পতিপ্রবরদের দ্বারা নির্যাতিত এবং শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদ নিতে বাধ্য।
এরা আমাকে বলেছেন, “দানবের সাথে থাকার চেয়ে একা থাকা ভালো”। 

সামনেই ফেব্রুয়ারি মাস, বিশ্ব Domestic Violence মাস। সেই মাসেরই একটি দিন ১৪ ই ফেব্রুয়ারি (বিশ্ব ভালোবাসা দিবস)। Domestic violence এর দরজা উন্মোচিত হয় “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বাক্যটির মধ্য দিয়ে।

নারীকে নির্যাতন করতে নেই, হত্যা করতে নেই, অবরোধবাসিনীও করতে নেই। মুক্ত পরিবেশে যেমন ফুল ফোটে বেশী ও বেশী সুন্দর, মুক্ত সমাজে নারী তাই। নারীকে “ হ্যাঁ” বা “ না“ বলার অধিকার দেয়া প্রয়োজন এবং তারা যাই বেছে নেয় “ হ্যাঁ” বা “না” , তা শ্রদ্ধাভরে মেনে নেয়া প্রয়োজন।
পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, ওবামা, ট্রাম্প, হিলারি নয়, নারী হচ্ছে সব শুরুর শুরু, আমরা যেন তা ভুলে না যাই।

শিশু চিকিৎসক, ফ্লোরিডা

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.