আমি তো নারীবাদী নই, মানবতাবাদী!!!

কাকলী রানী দাস: গত বারো বছর দেশের কয়েকটি নামী অনামী জাতীয় আর্ন্তজাতিক উন্নয়ন সংস্থায় আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সেই কাজের অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে নারীবাদকে দেখার সৌভাগ্য/দুর্ভাগ্য হয়েছে যা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

প্রথমেই বলে রাখি, এইসব আর্ন্তজাতিক সংস্থার ঝাঁ চকেচকে অফিস এবং এর ততোধিক র্স্মাট কর্মীদের বেশিরভাগের উন্নত চিন্তা-চেতনা এবং জীবনবোধের সাথে নারীবাদ শব্দটি ঠিক যায় না। ঠিক তাদের ষ্ট্যাটাসের সাথে মানানসই নয়, কেমন যেন ক্ষ্যাত টাইপের। এই করনেই অসংখ্যবার আমি এই বাক্যটি তাদের অনেকের মুখ থেকে শুনেছি – “আমি তো নারীবাদী নই, মানবতাবাদী, আমি শুধুমাত্র মানবতায় বিশ্বাস করি।”

কাকলী রানী দাস

এবার আসি নারীবাদের কাছে। নারীবাদ কি জিনিস?? আমি কোন তত্ত্ব বা ভারী কথায় যাব না, আমার নিজের জীবন থেকে যা শিখেছি তাই বলব, ভুল হলে ধরিয়ে দিতে পারেন। আমার কাছে নারীবাদ হলো এমন একটি বিশ্বাস বা মতবাদ, যা আমাকে একজন মানুষ হিসেবে এবং নারী হিসেবে কখনও কোন বৈষম্যের মুখোমুখি করবে না, আমার কাজে বাধা দেবে না, আমার জীবন অন্য কেউ নিয়ন্ত্রন করবে না, আমি আমার যোগ্যতায় আর ক্ষমতায় যতটুকু পারি আমার জীবনকে বিকশিত করব – ডানা ছড়িয়ে আকাশে উড়ব, আমার ডানাকে ছেটেঁ দিতে কেউ দৌঁড়ে আসবে না – না পরিবার, না সমাজ, না রাষ্ট্র, না ধর্ম। আমি শিশু হিসেবে, কিশোরী হিসেবে, তরুনী হিসেবে, জীবনসঙ্গী হিসেবে, মা হিসেবে, শাশুড়ি হিসেবে – জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে, প্রতিটি ভূমিকায় নিজেকে সম্মানের জায়গায় দেখতে চাই। একজন মানুষ হিসেবে আমার যা প্রয়োজন এবং একজন নারী হিসেবে আমার বিশেষ যা প্রয়োজন সবকিছু আমার হাতের নাগালে চাই।

তো ফিরে আসি “শুধুমাত্র মানবতাবাদী মানুষগুলো”র প্রসঙ্গে। মজার বিষয় হলো, এই মানুষগুলো প্রায় সবাই এইসব সংস্থার উঁচু পদে কাজ করেন, এবং এদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। এই বক্তাদের কেউ কেউ প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করেন, কেউ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য, কেউ প্রান্তিক কৃষকদের জন্য, কেউ শিশুদের জন্য, কেউ চরবাসীদের নিয়ে।

মোট কথা, এদের সবাই-ই কোন কোনভাবে অধিকার বঞ্চিত মানুষদের নিয়ে কাজ করেন। তারা বিশ্বাস করেন, এইসব মানুষদের নিয়ে কাজ করতে হলে মানবতাবাদী হবার পাশাপাশি এদের বিশেষ অধিকার নিয়েও কথা বলার বা কাজ করার খুবই দরকার আছে। কারণ মানবতাবাদ সব মানুষের সমান অধিকারের কথাই শুধু বলে। কিন্তু সব মানুষ সমান নন। কারো সক্ষমতা বেশি কারও তুলনামূলক কম, কেউ এক বিষয়ে পারদর্শী তো অন্যরা আরেক বিষয়ে। কারও এক বিষয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কিন্তু অন্য বিষয়ে সে অনেকটা এগিয়ে। তাই সমতা এখানে সমস্যা সমাধানের উপায় নয়, বরং এইসব মানুষের জন্য প্রয়োজন বিশেষ অধিকার।

মজার ব্যাপার হলো, এইসব সংস্থার মানবতাবাদী মানুষগুলোকে দেখলে মনে হয়, এরা উপরের কথাগুলো বিশ্বাস করেই কাজ করতে নামেন। তবে এই “শুধুমাত্র মানবতাবাদী মানুষগুলো” একবারও ভাবেন না প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রান্তিক কৃষক, শিশু, চরবাসীসহ সহ সব ধরনের অধিকার বঞ্চিত মানুষদের দলে নারীর সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি। একজন প্রতিবন্ধী নারী যেমন প্রতিবন্ধী হিসেবে অধিকার বঞ্চিত তেমনি একজন নারী হিসেবে একজন প্রতিবন্ধী পুরুষের চেয়ে কয়েকগুন বেশি অকিার বঞ্চিত। তাই এইসব মানুষদের নিয়ে সত্যিকারের উন্নয়নমূলক কাজ করতে গেলে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতেই এদের জন্য কাজ করতে হবে।

এ তো গেল মাঠপর্যায়ের নারীদের প্রতি এদের মনোভাব, এবার বলি অফিসে নারী সহকর্মীদের প্রতি মনোভাবের কথা। বেশির ভাগ উয়ন্নন সংস্থাই দাতাদের অর্থ সাহায্যের উপর নির্ভরশীল এবং সেকারনে যখনই অর্থের টানাটানি পরে, তখন সংস্থাগুলো কর্মী ছাটাই করে তাদের খরচ কমানোর চেষ্টা করে। এবং বলার অপেক্ষা রাখে না এই কর্মীদের মধ্যে প্রথমেই যাদের ছাটাই করা হয় তারা হলেন নারী অধিকার নিয়ে কাজ নারী কর্মীরা। কারণ এই “শুধুমাত্র মানবতাবাদী মানুষগুলো” তো নারী অধিকারে বিশ্বাসই করেন না, শুধুমাত্র দাতাদের চাপের মুখে, কখনওবা অফিসের শোভা বৃদ্ধির জন্য নারী কর্মীদের রাখেন (ভুলে যান এরা যোগ্যতার পরীক্ষা দিয়েই নিয়োগ পেয়েছেন)। তাই নারী কর্মীদের উপর ছাটাইয়ের কাঁচিঁ চালাতে এনারা দ্বিতীয়বার ভাবেন না।

শুধু টাকার টানাটানি নয় যেকোন প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে নারী কর্মীদেরই মাশুল গুনতে হয়। এমন একটি আর্ন্তজাতিক উন্নয়ন সংস্থায় আমি দীর্ঘদিন কাজ করেছি, আমার মনে আছে একবার অফিসে বসার জায়গার ঠিক সংকুলান হচ্ছিল না, জায়গা বের করার চেষ্টার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অফিসের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রটাকে এই অফিসের আরেকটি দূরের শাখা অফিসে পাঠিয়ে দেয়া হলো। কিলোমিটারের দূরত্বে হয়তো সেটা এক দেড় কিলোমিটারের বেশি হবে না। তবে গুলশানের মত ভিআিইপি রোডে রিক্সা চলে না এবং তুলনামূলক অল্প দূরত্বের কারণে সিএনজিও যায় না – তাই একমাত্র হাঁটাই ভরসা।

অফিসে আসার আগে বাচ্চা এবং তার সারাদিনের খাবারসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তিন-চারটা ব্যাগ নিয়ে বাচ্চার মাকে (কোন কোন ক্ষেত্রে বাবাও) আগে সেই দিবাযত্ন কেন্দ্রে যেতে হতো, অফিস শেষে আবার নিয়ে আসতে হতো। যাদের দুধের শিশু আছে তারা দুপুরের খাবারের বিরতিতে নিজের খাবার না খেয়েই দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে যেতেন। দুপুরের খাবারের বিরতি আধা ঘন্টা যেতে আসতেই চলে যেত। তারপর বাচ্চাকে খাওয়ানো, ঘেমে নেয়ে আবার অফিসে ফিরে আসা, এরমধ্যে আবার নিজেও খাবার খাওয়া – মায়েরদের সে এক দর্শনীয় বাঁদর নাচ ছিল, তাই বাধ্য হয়েই অনেক মা দুপুরে বাচ্চার সাথে দেখা করা বন্ধ করে দেন। কাজের চাপ বেশি থাকলে দুধের শিশুর কাছেও যেতে পারতেন না। অথচ অফিসে তখন অনেক বিভাগ ছিল যাদের এই অফিসে না বসলেও তেমন ক্ষতি বৃদ্ধি হতোনা।

কয়েকজন মা এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিটিকে অনুরোধ করতে গেলে জবাব পান, “আমারা তো শিশু দিবাযত্ন ছাড়াই বাচ্চা বড় করেছি, আর তোমাদেরটা তো উঠিয়ে দিচ্ছিনা, শুধু একটু দূরে যাচ্ছে। বিদেশে মায়েরা কত কত মাইল দুরের ডে কেয়ারে বাচ্চা রেখে চাকরি করছে, জান?” পরে মায়েদের কাছে এই জবাব শুনে খুব জানতে ইচ্ছা হচ্ছিল, আপনারা পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে যেই কষ্ট করেছেন সেটা যদি আমাদের এখনও করতে হয় তবে আপনারা এতোদিন নারী উয়ন্ননের নামে কী ঘোড়ার ডিমটা পাড়লেন, নাকি টাকার জন্য খালি চাকরিই করেছেন? আর উন্নত দেশের একটা মেয়েকে ঘরে-বাইরে, রাস্তায়, অফিসে এতো লড়াই করতে হয় না, জীবন তামা তামা করতে হয় না, তাই তাদের সাথে আমাদের কোন তুলনাও চলে না।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, এই বিষয়ে আমি অনেক পুরুষ এবং নারী সহকর্মীদের কাছ থেকে অনেক বিরূপ মন্তব্য শুনেছি। এই “শুধুমাত্র মানবতাবাদী”, মানুষগুলো ভাবেন না, একজন নারীকে সহায়তা করলে তিনি শুধু সহকর্মীর প্রতি দায়িত্ব পালন করছেন না, তিনি আসলে বিশ পচিঁশ বছর পরে তার নিজের কন্যা এবং পরিবারের অন্যান্য কন্যাদের চলার পথ সহজ করছেন। অবশ্য কেনই বা তারা এটা ভাববেন, নারীবাদী সিল লাগালে তো সংবেদনশীল হতে হয়, ছোট খাট ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।

তার চেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে হাত তালি দেওয়া সহজ, আরও সহজ ক্ষ্যাত নারীবাদী সহকর্মীদের নিয়ে চৌকস উন্নয়নবাদীদের (!!!) চায়ের কাপে সমালোচনার ঝড় তোলা। অন্যদিকে সংস্থাগুলোর শীর্ষ নারী কর্তাব্যক্তিদের দেখে মনে হয়, তারা সারাক্ষণ প্রমাণ করার চেষ্টা করতে থাকেন, “আমি নারী হলেও নারীদের প্রতি আমার কোন পক্ষপাতিত্ব নেই। আমি তাদের উপর কঠোরতম আচরণও করতে পারি”। আর এভাবেই তারা তাদের উঁচুপদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখেন।

আমি আমার ছোট্ট বুদ্ধিতে বুঝি, একজন নারী যত বড় পদেই কাজ করুন না কেন, শুধুমাত্র নারী হবার কারণে তাকেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। তাই কনিষ্ঠ নারী সহকর্মীদের সামনে বার বার নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে না দিয়ে সহায়তার হাত বাড়ান। তাতে আপনাদের নিজের পথই মসৃণ হবে। আর উয়ন্নয় সংস্থাগুলো যে সত্যিকারের মানবতাবাদী বিশ্বের স্বপ্ন দেখে (যদি আদৌ দেখে থাকে) – সেই স্বপ্নের নকশার অর্ধেকের বেশি এই নারীদের কাছে আছে যারা বাংলাদেশের হাজারও গ্রামের আনাচে-কানাচে, আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছোট বা মাঝারি পদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদেরকে বাদ দিয়ে মানবতাবাদী পৃথিবী আপনার কি করে আশা করেন?

আর যদি এই `ক্ষ্যাত` নারীদের কথা ভাবতে আপনাদের সম্মানে বাঁধে, তবে নিজেকে দয়া করে মানবতাবাদী বলেও দাবী করবেন না। যারা, সারা বিশ্বের অধের্কের বেশি মানুষের অধিকার, লড়াই, সংগ্রামকে স্বীকার করে না, সহায়তার হাত বাড়ায় না তারা আর যাই হোক মানবতাবাদী নয়, তারা সুবিধাবাদী।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.