ওদেরও তো প্রাণ আছে!

ফারজানা নীলা: মানুষের চেয়ে নিচের স্তরের প্রাণীদের আঘাত দিয়ে মানুষ পৈশাচিক আনন্দ পায়। এটা মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য কিনা জানি না। আবার পরক্ষণেই মনে হয় যারা প্রাণীদের আদরে রাখে তাদের জিন কি ভিন্ন? আচ্ছা কেমন আনন্দ পায় যখন কেউ একটি ঘুমন্ত কুকুরের মাথা পাথর মেরে থেঁতলে দেয়? কেমন আনন্দ পায় যখন কুকুরের ছোট ছোট বাচ্চাদের জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারে, ছোট ছোট বিড়াল ছানাদের ড্রেনে ফেলে দেয়, লেজ কেটে দেন, হাত পা বেঁধে পিটায়, আর তারা বাঁচার জন্য আর্তনাদ করে! কেমন আনন্দ লাগে যখন মা কুকুরের সামনে তার বাচ্চাদের পিটিয়ে মেরে ফেলে? কেমন আনন্দ লাগে যখন ইচ্ছে করে কুকুরের উপরের গাড়ি উঠিয়ে দেয়, আর সে থেঁতলানো হাত পা নিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে। এবং সেগুলো ভিডিও করে উল্লাসও করা হয়।
হায়! একটা প্রাণের যন্ত্রণা অন্য প্রাণের কাছে আনন্দ!
কেন এদের প্রতি এতো রাগ এতো ঘৃণা? কী অপরাধ তাদের? তাদের অপরাধ তারা রাতে একটু চিৎকার করে? খাবারের সন্ধানে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এক ডাস্টবিন থেকে আরেক ডাস্টবিনে দৌড়াতে থাকে? রাস্তা ঘাটে যখন আপনারা খাবার খান, তখন আপনাদের খাবারের দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে? নাকি তাদের অপরাধ তারা আপনাদের ঘরবাড়িতে হামলা করে, আপনাদের খাবার ছিনতাই করে, আপনাদের সোনা অলংকার কেড়ে নেয়? কী অপরাধের জন্য তাদের এমন মর্মান্তিকভাবে নির্যাতন করেন, হত্যা করেন?
ধরুন আপনাকে বা আপনার সদ্য জন্মানো শিশুকে ড্রেনে ফেলে দিলাম, কেমন লাগবে? আপনাকে বা আপনার শিশুকে বিশাল একটা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে থেঁতলে মেরে ফেললাম, কেমন লাগবে? আপনার সামনেই আপনার নবজাতককে গলায় রশি দিয়ে বেঁধে চক্কর খাওয়ালাম, কেমন লাগবে? আপনার গায়ে উত্তপ্ত ভাতের মাড় ঢেলে দিলাম, ঝলসানো চামড়ার যন্ত্রণা কেমন লাগবে?
খুব নিষ্ঠুর শোনাচ্ছে কথাগুলো তাই না? আপনাদের যেমন লাগবে, যেমন যন্ত্রণায় কাতরাবেন, ঠিক একই যন্ত্রণা এই অসহায় কুকুর-বিড়ালগুলো সহ্য করে।
কী চায় তারা মানুষের কাছে? একটাই তাদের চাওয়া, আপনারা তাদের একটু তাদের মতো বাঁচতে দিন। তাদেরকে কোনো রকম অত্যাচার করবেন না, এটাই তাদের একমাত্র মিনতি। আপনারা তাদের একটু খাবার দিবেন, আপনাদের উচ্ছিষ্ট ছুঁড়ে দিবেন, বৃষ্টিতে শীতে বাসার নিচে আশ্রয় দিবেন, এমন আশা তারা করে না। কারণ এমন করার মানুষের সংখ্যা খুবই কম।
এই কমসংখ্যক মানুষের হৃদয় নামক বস্তুটা অন্যান্য অত্যাচারীদের মতো নয় বলেই এরা পথে-ঘাটে আহত কুকুর-বিড়াল দেখলে  ছুটে যায়। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে এদের বাঁচানোর জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। বাসার আশেপাশের কুকুর-বিড়ালদের একবেলা অন্তত সামান্য খাবারের ব্যবস্থা করে। কাজটি খুব সোজা, প্রতিদিন আমরা যে খাবার খাই তার কিছু উচ্ছিষ্ট রয়ে যায়, যা আমরা ফেলে দেই। এই উচ্ছিষ্টগুলোই কুকুরদের জন্য অমৃত। সারাদিনের উচ্ছিষ্ট খাবার একবেলা আশেপাশের কুকুর বিড়ালদের দিলেই তারা একটু হলেও কিছু খেতে পারে।
কিন্তু তাদের কেন দিবো? এই ‘কেন দিবো’র জন্য সোজা কাজটি হয়ে যায় খুব কঠিন। পাড়া –প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আশেপাশের সবাই কটু কথা শোনাতে থাকে। যেন কুকুর-বিড়ালদের খাবার দেওয়া খুব খারাপ কাজ। তাদের কাছে প্রশ্ন রাখি, পিটিয়ে একটি ঘুমন্ত কুকুরকে মেরে ফেলা খুব ভালো কাজ?
আছে আরও অনেক “বিবেকবান” মানুষ, যারা একটি কমন প্রশ্ন নিয়ে তেড়ে আসে। “কুকুর বিড়ালদের জন্য না করে মানুষদের জন্য করলেও তো হয়”, তাদের প্রতি আমাদের একটি প্রশ্ন, “আপনাদেরও তো হাত-পা আছে। তো, আপনারাও সাহায্য করুন না পথশিশুদের, নাকি কুকুর-বিড়ালদের মুখের খাবারও কেড়ে নিতে চান”?
আর এটা কোন যুক্তিতে পড়ে যে পথ প্রাণীদের জন্য করলে পথ শিশুদের জন্য করা যাবে না। যে হাতে আমরা একটি আহত কুকুরকে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করি, সেই হাতে কিন্তু পথশিশুদের শীতের কাপড়ও দেই। পার্থক্য হলো এই আপনারা শুধু প্রশ্নই করে যান, সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন না।
এই অবলা প্রাণীদের লাথি মারার মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া মানুষের সংখ্যা কম। এই কম সংখ্যক মানুষরা “রাইজ ফর প” https://www.facebook.com/groups/riseforpaw/ নামে একটি সংগঠন চালায় কুকুর বিড়ালদের প্রাণে বাঁচানোর জন্য। জানি আমাদের পাগল বলবেন। তবু যদি এই পাগলদের কর্মকাণ্ড ভাল লাগে তবে সাহায্য করুন, হোক সেটা যেকোনো ভাবেই।
পৃথিবীটা তো সবার জন্য হওয়ার কথা ছিল। যে যেভাবে পারে সেভাবে বাঁচবে। কিন্তু অহেতুক নিজের পৈশাচিক মনোবৃত্তিকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য কিছু নিরীহ প্রাণী হত্যা করে নিজেদের অমানুষ প্রমাণ নাই বা করলেন। একটু দয়ার দৃষ্টিতে দেখুন তাদের।
ফারজানা নীলা

একটি কুকুর হয়তো তাঁর জীবনকালে একদিনও পেট ভরে খেতে পায় না। তীব্র শীতে কাঁপে, বৃষ্টিতে ভিজে, অসুখে মরে। মানুষের হাত-পা কেটে গেলে একটা কাপড় অন্তত বেঁধে রাখতে পারে, কিন্তু একটি কুকুর-বিড়াল তা পারে না। সেই কাঁটা ঘায়ে মাছি উড়ে, ক্ষত রূপ নেয় মাংস পচনে।

একটি ঘটনা বলি, একটি কুকুর মাথায় আঘাত নিয়ে দিনের পর দিন ফুটপাতে পড়ে ছিল। ঘা বাড়তে বাড়তে সেখানে পোকা দেখা দেয়, পোকাগুলো তাঁর মাংস খেতে খেতে মগজে চলে যাচ্ছিল। দিনের পর দিন, না কোনো খাবার পাচ্ছে সে, না কোনো চিকিৎসা। ধরুন, আপনার সাথে এমন হলো, কেমন লাগবে? অনুমান করতে পারছেন না, তাই তো? কুকুরটি কিন্তু অনুভব করতে করতে মারা গিয়েছিল।
কোনোদিন যদি সম্ভব হয় এক  টুকরা রুটি একটা পথের কুকুরকে ছুঁড়ে দিবেন, দেখবেন কী তৃপ্তির সাথে রুটিটি খাবে সে।  যদি মনুষ্যত্ব থাকে বুকটা ভরে যাবে আপনার।
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.