সন্তানের সামনে যা বলছেন – বুঝে বলছেন তো?

মুমিতুল মিম্মা: মন্ত্রীর ‘মালাউন তত্ত্ব’, ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ এর দিলীপ কুমারের ‘যবন তত্ত্ব’ কিংবা তসলিমা নাসরিনের ‘ফেরা’র ‘কালো পিঁপড়া-লাল পিঁপড়া’ তত্ত্ব ছোটবেলা থেকে প্রায় সবারই জানা। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এর ভাষায় “শোষণের স্বর্ণ-সাম্রাজ্য যখন দায়ে পড়ে ছেড়ে গেছি তখন উপহার দিয়ে গেছি বিষ জর্জরিত ভারত-পাকিস্তান”। কয়েকশ বছর পেরোলেও বিষের এই কলুষ আমরা রক্তের ভেতরে আজও বয়ে নিয়ে চলেছি এবং কোন না কোনভাবে সেটা পৌঁছে দিচ্ছি প্রজন্ম থেকে প্রজম্নে 

“ভাবি, আমি হিন্দুদের সাথে অত বেশি মিশি না”। “নতুন বস, এসেছে অফিসে। হিন্দু তো, বোঝোই” “ও তো আবার হিন্দু তাই গান ভালো পারে” “ওরা মুসলিম, গরু খায়। ওদের সাথে মিশলে জাত যাবে” “ঠাকুরঘরে কোন মুসলিম ঢুকবে না, ওতে অশুচি হবে!”

কথাগুলো আপনি বলেছেন তাই কিছু মনে হচ্ছে না আপনার কাছে। আপনি যখন সন্তানের সামনে এই কথাগুলো বলছেন তখন অজান্তেই ওর মনের মধ্যে মিশিয়ে দিচ্ছেন ধর্মভিত্তিক কলুষ। আপনি অবচেতনে যে কালিমা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন নিজের ভেতরে, তা অবচেতনেই ছড়িয়ে দিচ্ছেন সন্তানের কাছে। ফলাফলস্বরূপ যে বয়সে ঘৃণার অর্থ পরিষ্কার থাকবার কথা নয়, সেই বয়সেই কাকে ঘৃণা করতে হবে শিখে যাচ্ছে শিশু আর আপনি নিজে বিষবৃক্ষের গোড়ায় পানি ঢালছেন। শিশুদের বলা হয়ে থাকে পরিবারের দর্পণ। যেরকম এবড়ো থেবড়ো দর্পণ আপনি তৈরি করে দিচ্ছেন সেখানে কীরকম প্রতিফলন আশা করেন? একবার ভাবুন তো আপনার শিশু যদি তার ভিন্নধর্মের অনুসারী শিক্ষককে বলে বসে, “মিস, আপনাকে ছাড়া আমি আর কোন হিন্দু/ খ্রিস্টানকে দেখতে পারি না” – তখন কেমন হবে?

হ্যাঁ, আমার বন্ধুর সাথে ঘটেছে ঘটনাটা। আর বলা বাহুল্য বাংলাদেশে এ রকম ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে।

০-৫ বছর পর্যন্ত সন্তানের ‘রেকর্ডিং পিরিয়ড’এই সময়ে ও যা শুনবে তাই-ই মনের ভেতরে গেঁথে রাখবে। যা পরবর্তীকালে ওর ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করবে। একজন মা-বাবা হিসেবে সন্তানের ভেতরকার ব্যক্তি গঠনের প্রথম কারিগর আপনি। আপনার এক একটা কথায়ই বাচ্চা বেড়ে উঠতে পারে অনন্যভাবে। প্যারেন্টিং তাই এখন আর একটা ঠুনকো বিষয় নয়। তাই মা-বাবা হবার আগে আপনার নিজের একজন সুস্থ্য-সুন্দর মানবিকতার মানুষ হওয়া জরুরি।

আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাটাও একরকম দ্বিচারি হতে বাধ্য করে আমাদের। চারপাশে বৈষম্য আর বৈষম্য নিয়ে ঘুরে বেড়াই আমরা। কিন্তু কাগজে-মঞ্চে আমরা কী উদার ধর্মতত্ত্বের বাণী শুনে যাই, শুনিয়ে বেড়াই। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আক্রান্ত ধর্ম ভিত্তিক কলুষে। শিক্ষা ব্যবস্থার যেহেতু রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব না তাই আদি শিক্ষার গোড়া হিসেবে পরিবারকেন্দ্রিক শিক্ষার দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই আমাদের।

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নেই বলে আমাদের দেশে বিরাজমান ধর্মীয় শিক্ষায় কেবল স্ব-স্ব ধর্মের ধর্মীয় বোধকে লালন করার শিক্ষা দেয়া হয়। কিন্তু ধর্ম যদি সংকীর্ণ বেড়াজালে আবদ্ধ হয় তবে তা কখনওই সামাজিক অগ্রগতির সহায়ক হতে পারে না। আপনার ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে শিশুকে অবশ্যই পরিচয় করাবেন তবে গোঁড়ামি নিয়ে নয়। ধর্মীয় শিক্ষার মূল কথা যেন মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসাকে প্রকাশ করে। তাই আপনার শিশুকে নিজ ধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্মের কথাগুলোও একটু একটু করে বলুন।

মুমিতুল মিম্মা

শিশুকে অন্য ধর্মের ধর্মীয় নেতা, ধর্মীয় উৎসবের কথাগুলো বলুন, তাঁকে নিয়ে বের হোন ঐ উৎসবের দিনগুলোতেবেড়াতে নিয়ে যান অন্যধর্মীয় মানুষদের বাসায়। আস্তে আস্তে আপনার আদরের সন্তানটিকে পরিচিত করান পরমত সহিষ্ণুতাবোধ আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাথে। স্ব-স্ব ধর্মীয় শিক্ষা আর রবীন্দ্র-নজরুল ঐতিহ্যের সাথে সাথে মানবিকতা বোধের জন্ম দিয়ে সন্তানটিকে হাত ধরে শেখান –

হে চিরকালের মানুষ,
হে সকল মানুষের মানুষ,
পরিত্রাণ করো
ভেদ চিহ্নের তিলক পরা
সংকীর্ণতার ঔদ্ধত্য থেকে।

মুমিতুল মিম্মা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.